মরিয়ম হুঁশ হারিয়ে ফেলেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে করে ভারতীয়রা যে এগিয়ে আসছে, তারপর বড় একটা যুদ্ধ হবে-অনুরাধার কথাগুলো সে বেমালুম ভুলে যায়। সে রাত-দিন এমন এক খোয়াবে বাস করে, যা ভাঙা না-ভাঙা সমান। তবে ভালো হয়, যদি বাকি জীবন এর মধ্যে থাকা যায়। ঝোলা মুখের মেজর তাকে রূপকথার দেশ আর এক রাজপুত্রের গল্প শোনায়। পঞ্চ নদের দেশ পাঞ্জাব-সুজলা-সুফলা। মোগল সম্রাটদের গড়া লাহোরকে খালি শহর বললে ভুল বলা হবে। ফুলবাগিচা, সুরম্য অট্টালিকার এক আশ্চর্য নগরী লাহোর। এর পাশ দিয়ে স্বচ্ছ জলের যে নহর বইছে, তার দু’ধার বৃক্ষশোভিত। অজানা ফুলের ঘ্রাণ পথিকের মন মাতোয়ারা করে। মরিয়ম পাঠ্যবইয়ে শালিমার বাগের ছবি দেখেছে। এর সারি সারি ঝাউবীথির পাশে যে ফোয়ারা, তার কোল ঘেঁষে টাইট কামিজ, চুড়িদার পরা মেয়েরা পায়রার মতো ঘুরে বেড়ায়। মাথার তালু ঘিরে এক ফালি দোপাট্টা সোহাগ করে গলা জড়িয়ে রাখে। তবে নিউজপ্রিন্টের ছাপার সাদা-কালো মুখগুলো স্পষ্ট হয় না। এসব অস্পষ্ট চেহারার একজন মরিয়মের মনে হয়-মেজর ইশতিয়াকের স্ত্রী। মেজর বলে, সেই মেয়েটি এখন ফুলবাগিচা-বেষ্টিত এক সুরম্য অট্টালিকায় বাস করে, যেখানে একদা এক সুখী রাজপুত্র তার স্বামী ছিল। যুদ্ধ লাগার পর স্বামীটিকে চলে যেতে হয় বাংলামুলুকে। সেখানে সম্মোহনী চোখ আর কালো কেশরাশির বিরল প্রজাতির নারীদের বাস। তারা জাদুকরী। তাদের মোহিনী রূপ সেই কোন কালে মেজর ইশতিয়াকের পূর্বপুরুষদের বশ করেছিল, সেই লোকগুলো পশ্চিম ভারতের রুখুশুকু, লাবণ্যহীন নারীদের কাছে আর ফিরে আসেনি। সেখানেই থেকে গিয়েছিল। স্বামী হারানোর বেদনা এ মহিলারা ভুলতে পারেনি, বংশপরম্পরায় আজও তা বয়ে বেড়াচ্ছে।
মেজর ইশতিয়াকের বুকপকেট থেকে বেরিয়ে আসে গোলাপি লিপস্টিক রঞ্জিত ঠোঁট, সরু আঁকা জ্বর এক ভয়ার্ত নারী। চিঠিতে যে বারংবার স্বামীকে চরিত্র ঠিক রাখার কসম খাওয়ায় আর অনবরত ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। খান্দান রক্ষার্থে সে আত্মঘাতিনীও হতে পারে, যদি জানে যে, তার খসম জাদুটোনার খপ্পরে পড়ে কালো কালো বাঙালি নারীর শাড়ির আঁচল ধরা হয়ে গেছে এবং ঠিকমতো যুদ্ধ করছে না। মেজরের স্ত্রী জর্জেটের স্বচ্ছ ওড়নার ফাঁক দিয়ে বারো শ’ মাইল দূর থেকে ঘৃণা আর অবিশ্বাস নিয়ে মরিয়মের দিকে তাকায়। জাদুকরীর তাতে ভাবান্তর হয় না। সে তখনো এসব হিসাব-নিকাশের বাইরে। তা ছাড়া মানুষের জীবনই যেখানে মিথ্যা, সেখানে একটা ফটোর মূল্য কী। কিন্তু ছবিটাকে উপলক্ষ করে কদিন পর প্রেমিক-প্রেমিকার মনে ভাটার টান লাগে। জোয়ারের ঢেউগুলো বিষাক্ত শৈবালের মতো তাদের শুকনো বেলাভূমিতে আছড়ে ফেলে ক্রমে দূরে সরে যায়। কী আশ্চর্য! মরিয়মের হঠাৎ হুঁশ ফেরে, খুনি-ধর্ষক লোকটাকে নিয়ে গত কয়েকটা দিন সে মাতোয়ারা ছিল! যার বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানও রয়েছে! যে তাকে বিশ্বাস করে না পর্যন্ত! তালাবন্ধ ঘরে রাতদিন আটকে রেখেছে। লাল গোলাপ, সিল্ক শাড়ি, গজল–সব মেকি আর প্রেমটা হচ্ছে চাতুরী। সত্য যে, লোকটা তাকে ভালোবাসে না, সে তার জন্ম-জন্মান্তরের শত্রু।
এদিকে মেজর ইশতিয়াক মনে করে বাঙালিরা মানুষ না–প্যাট, পোষ্য, বিড়াল স্বভাবের। আশপাশে মিউমিউ ডাক ছাড়বে। কোলে বসে চোখ বুজে দোল খাবে। কিন্তু সুযোগ পেলে আঁচড়টা-খামচিটা দিতে ভুল করবে না। মেজরের দুঃখ যে, ইংরেজদের মতো তারা সঠিকভাবে দেশটা শাসন করতে পারেনি। তাই দুই শ বছরের জায়গায় চব্বিশ না পেরোতেই দুর্ভোগের একশেষ। আত্মসমালোচনাটা মেজর ইশতিয়াক এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই করে। তাই বন্ধুমহলে উদারনৈতিক হিসেবে তার খুব নামডাক। মরিয়মকে একদিন ‘আর ইউ হিন্দু অলসো?’ মেজর ইশতিয়াক দুম করে প্রশ্নটা করে বসে। এ প্রশ্নের কী জবাব দেওয়া যায়? হিন্দু বললে মেজর তাকে মেরে ফেলবে? মলিনা গুপ্তের স্বামী, শ্বশুর, ভাশুর, আর শোভা রানীর স্বামীর মতো?
মরিয়ম মুসলমান শুনেও মেজর ইশতিয়াকের রাগ পড়ে না। বাঙালি মুসলমান আবার মুসলমান নাকি! হিন্দুরা তাদের কাফের বানিয়ে ফেলেছে। মুসলমান ভ্রাতৃত্বের মাঝখানে সুকৌশলে ছুরি চালিয়ে দু’ফালি করে দিল শালার মালাউনরা। ব্লাডি ওয়ারের একটা ভালো দিক মেজর মনে করে, তারা হিন্দুদের পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিলম্বে হলেও নিশ্চিহ্ন করতে পেরেছে। বাকিগুলো এখন ভারতের শরণার্থী ক্যাম্পে কলেরায় ধুকে ধুকে মরছে। ওই নরক থেকে কাফেরগণের আর ফিরতে হবে না।
এদিকটা বাদ দিলে সত্য যা–মেজর ইশতিয়াকের যুদ্ধ করতে আর ভালো লাগে না। সে ক্লান্ত। শত্রুপক্ষের সৈন্যদলের সঙ্গে লড়াই করলে জয়-পরাজয় থাকে। কিন্তু নিরস্ত্র সিভিলিয়ানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আর ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করা, তার মনে হয় একই ব্যাপার। এর শুরু আছে, শেষ নেই।
অবশেষে আসল যুদ্ধটা ঘোষণা দিয়ে শুরু হলো। জন্মাবধি একে অপরের শত্রু–পাকিস্তান আর হিন্দুস্তান আবারও পরস্পরের মুখোমুখি। এবার কাশ্মীর বা রান অফ কাঁচ নয়-বাংলা। পশ্চিম সীমান্তে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার খেলা যখন চলছে, পূর্বে যুদ্ধটা ঝড়ের আকার ধারণ করে। ঝটিকা ঝড়, যার মেয়াদ মাত্র বারো দিন। জেনারেল ব্যাঘ ওরফে নিয়াজির তখত টলে ওঠে, গর্জন থেমে যায়, ভূগর্ভস্থ কক্ষে অস্থির পদচারণা শুরু হয়। সেখানে নিরাপদবোধ করার কোনো কারণ ছিল না। কেননা দেয়ালের মানচিত্রের তিরচিহ্নগুলো একই সঙ্গে নির্দেশ করছে পাকিস্তানিদের পশ্চাদপসরণ আর ভারতীয়দের অগ্রযাত্রা। টেলিফোন, বেতারযন্ত্র মারফত একের পর এক তার অধস্তনদের পথ হারানোর, আত্মসমপর্ণের, ডুবে মরার খবর আসছে। অথচ পশ্চিম অর্থাৎ কেন্দ্র নির্বিকার।
