‘হাউ ডিড ইউ নো হিম?’ লোকটা তো নাছোড়বান্দা! মরিয়ম সরাসরি প্রশ্নের জবাব দেয় না, ঘুরিয়ে বলে, ‘হি ওয়াজ কাইন্ড টু মি।’ দেখা যাক কোথাকার জল। কোথায় গড়ায়। চোখের কোণ দিয়ে সে তার ভাবান্তর লক্ষ্য করে। কিন্তু এ কি চোখের ভুল, নাকি লোকটা আশ্চর্য ক্ষমতা রাখে চেহারা পাল্টে ফেলার! ঝোলা মুখ ক্রমে মেজর ইশতিয়াকে রূপান্তর হতে হতে মরিয়ম শুনতে পায় বলছে, ‘হি ওয়াজ কিন্ড ডে বিফোর ইয়াসটারডে।
কী আশ্চর্য! ওরাও বিলক্ষণ খুন হয়? মরিয়মের না তার সঙ্গে পাকিস্তান চলে যাওয়ার কথা–অনুরাধা বলেছিল!
নিজের লোকজনের হতাহতের খবর শত্রুপক্ষকে জানানো বোধ হয় যুদ্ধের নিয়মবহির্ভূত। ঝোলা মুখ নিজে নিয়মভঙ্গ করে, চোখের পলকে মরিয়মের ওপর খেপে ওঠে। বিছানা ছেড়ে সামরিক কায়দায় দাঁড়িয়ে বলে, ‘ডোন্ট ট্রাই টু মুভ। স্টিল ইউ আর সাসপেক্টেড। ইউ হ্যাভ টু অ্যামার-হুঁ আর দি কিলারস অব দ্যাট হাবিলদার।’
লোকটা গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। লাল গোলাপ আর সিল্ক শাড়িটা পড়ে থাকে বিছানায়। হয়তো তুলে নিতে ভুলে গেছে। শত্রুর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নিজের আখের গোছানো কি সোজা কথা? শ্যামলী যা পেরেছে, অনুরাধা নিজে তা পারবে? কখনো তো বড় বড় কথা বলার বাইরে সাহসী কিছু করে দেখাতে পারল না। মেজর ইশতিয়াকের চেহারা, নাকি ঝোলা মুখটা নিয়ে লোকটা আবার আবির্ভূত হয়, কে জানে।
‘শি ইজ সিক নাউ।’ গলাটা পরিচিত মনে হলেও ঘুমের ভান করে মরিয়ম মরার মতো পড়ে থাকে। নতুন ফন্দি এঁটে আর কাজ নেই। চুপচাপ থাকাই ভালো। ‘তা ছাড়া আমি মনে করি, সে সুযোগ পেলেই মুক্তিবাহিনীতে চলে যাবে।’ অপরিচিত কণ্ঠ—’লেটস সি।’
এভাবে লাল গোলাপ, সিল্ক শাড়ি ও ধবধবে সাদা বিছানা মরিয়মের অধিকারে চলে আসে। যে ঘরে তাকে রাখা হয়েছে, এর যাবতীয় জিনিসপত্রও এখন তার। ছুঁয়ে দেখলে বারণ করার কেউ নেই। স্বর্গধামের মতো ফেলে যাওয়া কোনো পরিবারের সয়-সম্পত্তি হয়তো এসব। বা হালের কোনো বিনোদন কেন্দ্র। টাল টাল খালি মদের বোতল আর দেয়ালে লালচে লিপস্টিকের মতো রক্তের দাগ এমন সাক্ষ্যই দেয়। এ ছাড়া কফির কৌটা, আচারের বয়াম, চিনির ডিব্বার তলায় সবকিছু একটু-আধটু লেগে রয়েছে। মরিয়ম আঙুল দিয়ে টক টক আমের আচার মুখে পোরে। এখনো তিতকুটে বিস্বাদ হয়ে যায়নি। সরষে ফোড়নের ঝাঁঝটা নাকে সুড়সুড়ি দেয়। হেঁচে-কেশে ওপরে তাকাতেই তার চোখে পড়ে সারি সারি ফ্যামিলি ফটোগ্রাফ। পোশাকে-চেহারায় পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে লোকগুলো অবাঙালি। ভারতের আক্রমণের ভয়েই হয়তো পাকিস্তান চলে গেছে। গলায় আচারের টুকরো মাকড়সার জাল বুনতে শুরু করলে সে হড়হড় করে বমি করে মেঝের কার্পেট নষ্ট করে দেয়। সেখানে একটা তার-ছেঁড়া তানপুরা ঘিরে শোকে মোহমান খান কতক তবলা। এর পাশের দেয়ালে লটকানো তৈলচিত্রগুলো অশেষ পীড়াদায়ক। যদিও নর্তকীদের স্থির অঙ্গ-বিভঙ্গ থেকে চোখ সরিয়ে নিলে তালাবন্ধ বিশাল ঘরটা মরিয়মের একার মনে হয়। চিড়িয়াখানার জন্তুর মতো সে চাইলে খাঁচায় পায়চারি করতে পারে। দেয়াল আয়নার নিজের প্রতিবিম্বের সঙ্গে কথা বলায়, হাই তোলায়, এমনকি ভেংচি কাটায় এখানে তার অপার স্বাধীনতা রয়েছে।
ঝোলা মুখের লোকটা নিজের নাম বলে মেজর ইশতিয়াক। তার কথামতো সে দ্বিতীয়। প্রাক্তন যুদ্ধে মারা গেছে। সে এখন ঝোলা মুখ বাইরে রেখে মৃত মেজর ইশতিয়াকের মাতাল চেহারাটা নিয়ে ঘরে ঢোকে। আর প্রাক্তনের মতোই বলে, ‘আই হ্যাভ টু টক টু ইউ। ইফ আই কান্ট, সাচ এ ব্লাডি ওয়ার, আই উইল ডাই।’
দোজখেও এক কণা বেহেশত থাকে। উল্টো করে বললে, বেহেশতের চারদিকে তখন দোজখের দাউদাউ আগুন। দ্বিতীয় মেজর ইশতিয়াক বারুদগন্ধময় পোশাক ছেড়ে, রক্তমাখা হাত মুছে বেহেশতের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়। বন্ধ ঘরের তালা খুলতেই তার নাকের পাটা ফুলে ওঠে। সে চোখ বুজে বুকে টেনে নেয় অজানা স্বর্গের সৌরভ।
চূর্ণ অলক থেকে এক পরী
মৃগনাভির এ গন্ধ ছড়ায়;
না, অরণ্যের হরিণ নয় সে
মানুষ দেখে যে বিষম ডরায়।
[কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় অনূদিত—হাফিজ]
মরিয়ম দরজা খোলার মধুময় ছন্দে দু’কদম পিছিয়ে আসে–এ প্রস্তুতি-পর্ব। তারপর বেহেশত আর দোজখের মাঝখানের দুয়ার বন্ধ হতে যতখানি সময়, তারপরই শিকারের ওপর চোখ বুজে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকারি। স্বর্গারোহণেও কালবিলম্ব হয় না। বাইরের গোলাগুলি আর বিকট আওয়াজ, যা মানুষকে সন্ত্রস্ত করে, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়, তা তাদের স্বর্গসম্ভোগে ব্যাঘাত সৃষ্টি না-করে আরোহণের মেয়াদ দীর্ঘতর করে। দুজনের মাঝখানের ফাঁকগুলো কানায় কানায় ভরে যায়।
পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর সামনে যে বৈরী পৃথিবী, সেখানে মরিয়ম আর মেজর ইশতিয়াক একে অন্যের দুশমন। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। প্রকারান্তরে একজন আরেকজনকে মারতেই চায় স্বর্গারোহণের সময়টুকু বাদ দিয়ে।
তবু লাল গোলাপ আসে, মদ সহযোগে ওমর খৈয়াম, হাফিজ পাঠ হয়। বুলবুলকণ্ঠী নূরজাহান বন্ধ ঘরে মায়াজাল বুনে চলেন। প্রেম রসসিক্ত ঘন হয়। ভালোবাসা আর মদিরায় যুদ্ধের প্রহরগুলো যুদ্ধের নিয়মের বাইরে চলে যায়।
