চলন্ত গাড়ির পেছনের সিটে চিত হয়ে পড়ে আছে মরিয়ম। মাথার আধখানা ঝুলছে সিটের বাইরে। এ অবস্থায় উরুর মাঝখানে রাইফেলের বাটের গুঁতো, দু’বগলে দুটি পুরুষাঙ্গের বিরামহীন ঘষাঘষি এবং ঠোঁটের দু’দিক টেনে ধরে একটি দুর্গন্ধময় পুরুষাঙ্গ মুখে ঢোকানোর প্রাণপণ চেষ্টা চলছে। গাড়িটা কোথাও থামছে না। চলতে চলতে একসময় এবড়োখেবড়ো রাস্তায় পড়ে। তাতে রাইফেলের বাঁটসহ পুরুষাঙ্গ দুটি পথভ্রষ্ট হয়, বগলের মাঝখানে ছন্দপতন ঘটে। তাতে লোকগুলো বিরক্ত হয়। মসৃণ রাস্তায় ওঠার পর, পুরো কাজটা ফের প্রথম থেকে শুরু করতে হয়। তার আগে বগল দুটি নিজেদের মধ্যে বদলাবদলি করে নিয়েছে দুজন। আর রাইফেলের বাঁট ফেলে পেছনের লোকটা সামনে চলে আসে, দুর্গন্ধময় পুরুষাঙ্গ মুখ বেজার করে চলে যায়। পেছনে। বিরতিতে ধুলা ওড়ে। গাড়িতে ঢুকে পড়ে শীতের দুপুরের ঝিলমিলে সোনালি রোদ্দুর।
পরের দৃশ্যে একজন মহিলা রক্ত-বীর্যের শুকনো দাগগুলো মুছিয়ে তাকে একটা আনকোরা কাপড় পরায়। মরিয়ম কাত হয়ে নেতিয়ে পড়তে ষন্ডামার্কা এক লোক তার লটপট শরীরটা উপুড় করে কাঁধে ঝুলিয়ে হনহনিয়ে হাঁটা দেয়। তার পরের দৃশ্যে খোয়া ছড়ানো পথের দু’ধারে টবে বসানো সারি সারি ওল্টানো পাতাবাহারের গাছ। কাছেই চুনকাম করা একটি দোতলা বাড়ি, যার পেছনে বিকালের সূর্য পেন্ডুলামের মতো ডানে-বাঁয়ে দোল খাচ্ছে।
যে চেয়ারটায় মরিয়ম এখন বসে আছে, এর হাতলের সঙ্গে তার হাত দুটি শক্ত করে পাটের দড়ি দিয়ে বাঁধা। সামনে একটা ঝোলা মুখ ঠোঁটে কলম চেপে ক্রমাগত তার দিকে ধোঁয়া ছাড়ছে। মরিয়ম কেশে উঠতে লোকটি পেট ফাটিয়ে হাসল। ‘নাউ টেল মি, হোয়াট ডু ইউ থিং অ্যাবাউড সভূরেন্টি। অ্যান্ড হাউ ডু ইউ এক্সপ্লেইন দ্য কনসেপ্ট অব ফ্রিডম। সঙ্গে সঙ্গে নেপথ্যকারীর কণ্ঠে বাংলা তর্জমা, সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে তোমার ধারণা কী? স্বাধীনতা শব্দটিকে তুমি কীভাবে ব্যাখ্যা করো।’ ধোঁয়ার ফাঁকে ঝোলা মুখ ফের আবির্ভূত হয়, ‘ডু ইউ বিলিভ ইন টু ন্যাশন থিওরি? টেল মি, হোয়াট দ্য ফিউচার অব পাকিস্তান?’ অদৃশ্য লোকটি—’তুমি কি দ্বিজাতিতত্ত্বে বিশ্বাস করো? পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ কী–আমাকে বলো।’
‘হ্যাভ ইউ সিন শেখ মুজিব? ডোন্ট ইউ থিং দ্যাট দ্য সিক্স-পয়েন্ট ডিমান্ড প্রেসড বাই মুজিব ইজ ভায়োলেশন অব আর্টিকেল সিক্সটিন অব দ্য মার্শাল ল প্রোক্লেমেশন? অ্যান্ড দ্যাট বাসটার্ড শুড বি হাঙ্গড ফর দ্যাট?’
‘তুমি শেখ মুজিবকে দেখেছ? তার ছয় দফা প্রচারণা, তুমি কি মনে করো না, সামরিক আইনের ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদের চূড়ান্ত লঙ্ঘন? এবং তার জন্য জারজটার ফাঁসি হওয়া উচিত?’
মরার আগে মনে হয় কলমা পড়ানো হচ্ছে। মরিয়ম ঢুকে পড়েছে সুন্দরীর জলার গোলকধাঁধায়। বেরোনোর পথ কই! সেখানে ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকির আলো, ঝোলা মুখটা তার ঠিক মধ্যিখানে, ‘উল্লু টর্চ বন্ধ করো!’ নেপথ্যের লোকটি ধমকে ওঠে, ‘বাতি নেভা উল্লুক!’ টেবিলের ওপাশ থেকে ঝোলা মুখের লোকটা এবার কচ্ছপের মতো গলা তোলে, ‘ডিড ইউ কিল হাবিলদার তাজ খান? ইফ ইউ ডিড নট, টেল মি হু আর দ্য কিলারস। তর্জমাকারী ফিসফিস করে, ‘তুমি কি হাবিলদার তাজ খানকে হত্যা করেছ?’ পরক্ষণে গলাটা তার সপ্তমে চড়ে যায়, ‘যদি না করে থাকো, বলো কে করেছে।’
ঝোলা মুখ দু’কাঁধের মাঝখানে গলাটা ঢুকিয়ে চেয়ারে হেলান দেয়, ‘নাউ উই আর ভেরি মাচ সিওর দ্যাট ইউ আর এ মিসক্রিয়েন্ট। ইফ ইউ অ্যাডমিট দ্যাট, ইউ উইল বি ফ্রি।’ স্খলিত গলায় তর্জমাকারী, ‘তুমি যে একজন দুষ্কৃতকারী, এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত? তা যদি নিজের মুখে স্বীকার করো, তোমাকে মুক্তি দেওয়া হবে।’
তারপর অন্ধকারে খানিক চেয়ার টানাটানি। এদিক-ওদিক খুটখাট আওয়াজ। ‘আচ্ছা ইন্টারভিউ থা।’ তর্জমাকারী খুশিতে বাগ বাগ, ‘সাক্ষাৎকারটা খুব ভালো হয়েছে। চেয়ারের হাতল থেকে মরিয়মের হাত দুটি খসিয়ে স্ট্রেচারে ধরাধরি করে শোয়ানো হয়েছে। মুখের ওপর ঝোলা মুখটা ধীরে ধীরে নেমে আসে, বহৎ আচ্ছি লাড়কি হো তুম।’ বিব্রত কণ্ঠে দ্রুত তর্জমা, ‘খুব ভালো মেয়ে তুমি।’
‘গুডনাইট।’
‘শুভরাত্রি।’
সাদা ধবধবে বিছানায় একটা লাল গোলাপ। পাশে জারুল ফুলের রঙের ভাঁজ করা সিল্ক শাড়ি। একটা দুই লিটার আন্দাজের স্যালাইন বোতল খাটের স্ট্যান্ড থেকে ঝুলছে। মরিয়ম পাশ ফিরতে হাতে তারের টান লাগে। তবে কম্বলের নিচে পা দুটি মুক্ত। দেশ কি স্বাধীন হয়েছে? অনুরাধা কোথায়? তাদের না পাকিস্তান চলে যাওয়ার কথা! হাউ ডু ইউ ফিল?’ হঠাৎ ঝোলা মুখটা তার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়তে মরিয়ম আরো একটা সাক্ষাৎকারের জন্য প্রস্তুত হয়। কিন্তু এবার আর অদৃশ্য তর্জমাকারীর কণ্ঠ শোনা যায় না। এ এক নতুন উপদ্রব। তবু আগের চেয়ে ভালো। হলরুমের নোংরা কম্বল-শয্যা থেকে ক্যাম্প খাট, সাদা নিপাট-পরিচ্ছন্ন বিছানা, শিয়রে লাল গোলাপ, সিল্ক শাড়ি। তার মানে সব জায়গাতেই পদোন্নতির ব্যবস্থা আছে–সেটি বন্দিশিবির আর সময়টা ১৯৭১ সাল হলেও!
‘আর ইউ ওকে?’ মরিয়ম বালিশের ওপর ভারী মাথাটা এদিক-ওদিক করে এবং এই প্রথম শোনে যে, সে নিজের মুখে প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে–‘ইয়েস।’ লোকটা মেজর ইশতিয়াকের মতো খুশি হয়। তার সংক্ষিপ্ত ইংরেজি ভাষ্য শুনে নাকি তাকে সুস্থ হয়ে উঠতে দেখে-মরিয়ম জানে না। তার শীর্ণ হাতটা কোলে তুলে বিছানায় বসার পর, ঝোলা মুখ রূপান্তরিত হয় মেজর ইশতিয়াকের ঢুলুঢুলু মাতাল চেহারায়। মরিয়মের মনে পড়ে, সার্কিট হাউসের সেই মাতালটার থাপ্পড়, যার ধাক্কায় সে উড়তে উড়তে রেলিংয়ের গায়ে পাতার মতো সেঁটে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও অনুরাধার উপদেশ স্মরণ করে সে জানতে চায়, আর ইউ মেজর ইশতিয়াক? তার প্রশ্ন শুনে লোকটা যেন বিদ্যুতের শক্ খেয়েছে, ঝপ করে হাতটা ছেড়ে দেয়। চেঁচিয়ে বলে, ‘নো নো, হাউ ডু ইউ নো হিম?’ এর জবাব মরিয়ম কেন দেবে? যুদ্ধের দিনে বাঙালি মেয়ের সঙ্গে পাকিস্তানি আর্মির কীভাবে সাক্ষাৎ-পরিচয় ঘটে–প্রশ্নকর্তারই তো তা ভালো জানার কথা। মেজর ইশতিয়াকের নামটাই শুধু তার মনে ছিল। এ ছাড়া ইউনিফরম পরা প্রত্যেকটা লোকই এক। ততক্ষণে লোকটার চেহারা পাল্টে আগের মতো ঝুলে পড়েছে। মিনিটে মিনিটে চেহারার পরিবর্তন–মরিয়মের মাথা ঘুরে ওঠে।
