‘ডু ইউ স্মোক?’ তার মস্তবড় থাবার ভেতর ডানহিলের প্যাকেট। তবে তা টেবিলের ডিশগুলোর মতো অস্থির বা খালি নয়। মরিয়ম আঁতকে ওঠে। তার দিকে সিগারেট এগিয়ে না দিয়ে, পিস্তল ধরলে সে অপ্রস্তুত কম হতো হয়তো। যেন যুদ্ধ নয়, এ শান্তির সময় আর তার দিকে ডানহিলের প্যাকেট ভুলবশত এগিয়ে দিয়েছেন তার অফিস বস, চটজলদি মরিয়ম তাই ‘নো নো থ্যাংক ইউ স্যার,’ বলে তার অপারগতা জানায়। মেজর খুশি হয়। সিগারেটের প্যাকেট ফেলে তার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলে, ‘ডু ইউ নো ইংলিশ?’ জবাবের অপেক্ষা না করেই তার গা থেকে প্রথম তোয়ালে সরায়, তারপর পাঁজাকোলে করে নিয়ে যায় বেডরুমে। লোকটার অপ্রত্যাশিত আচরণে মরিয়ম মুগ্ধ না হয়ে ভয়ে কাঁপে। হাঁটু দুটি বাড়ি খেতে শুরু করে। জসিমুল হককে তার ভালো লেগেছিল ছেলেটি ইংরেজি জানত বলে। সেসব দূর অতীতের এক গাঁয়ের কথা, যেখানে ইংরেজিতে কেউ কথা বলতে পারত না। মেজর ফিসফিস করে বলছে, ‘আই ওয়ান্ট টু টক টু ইউ। আই হ্যাভ টু টক টু সামওয়ান। সাচ এ ব্লাডি ওয়ার, ইফ আই কান্ট, আই উইল ডাই।’ কথা বলতে বলতে তার চোখ পড়ে মেয়েটির হাঁটু জোড়ার ওপর, যা কিছুতেই বশ মানছিল না। হোয়াট হেপেন্ড? লোকটার উম্মা দেখে, গাড়িতে যা যা ঘটেছিল মরিয়ম সব খুলে বলে। তাতে মেজরের চেহারা পাল্টে গিয়ে এমন বিকট আকার ধারণ করে, যা মরিয়ম শুরু থেকে প্রত্যাশা করেছিল। শালা নূর খান, শালে শুয়ার কা বাচ্চা!’ নূর খানকে শাসাতে বোধ করি টেলিফোনের দিকে ছুটে যায় মেজর। ফোনে তাকে পাওয়া যায় না। ঘুরে তাকাতেই দেখে মরিয়ম খাটের ওপর দাঁড়িয়ে গেছে। ব্লাডি হোর! মেজর ছুটে এসে এমন জোরে গালে থাপ্পড় মারে, মরিয়মের অত্যাচার-অনাহার ক্লিষ্ট শরীরটা খোলা দরজা দিয়ে গাছের পাতার মতো উড়তে উড়তে বারান্দা পেরিয়ে রেলিংয়ের গায়ে আটকে যায়। রেলিংটা মাথা সমান উঁচু না হলে, পরদিন সার্কিট হাউসের চাতালে তার লাশ পড়ে থাকত।
পারুল বলে, ‘অনেকগুলি লাশ আমি নিজেই মাটি দিছি। অত্যাচার করে করে এদের মেরেই ফেলাইছে মিলিটারিরা। তারা রাইতের অন্ধকারে কোদাল-সাপোল এনে দিত। গর্ত খুঁইড়ে টানতে টানতে তিনজন, চাইরজন আইনে এর ভিতর পুঁইতেছি। ছোট ছোট মেয়ে সব, আমারই বয়সের, কিংবা আমার চেয়ে ছুটো। পুরা ক্যান্টনমেন্ট চইষে ফেলে দিতে অয়-তালি পর লাশ বেরোবে অনেক।’
‘আপনি যখন গর্ত খুঁড়তেন, আর্মি পাহারায় থাকত?’
‘হে, ওই পাশেই ঘুরঘুর কইরত। সিগারেট খাইত, গল্প-গুজব করত, হাসি তামশা করত। কেননা রাইতের বেলা তারা মদ-বিড়ি-সিগারেট খাইত।’
‘মদ খাইয়্যা আলি পর’ বিন্দুবালা বলে, ‘রাজাকাররা তাগো ঘরে দিয়া নিজেরা সইরে পড়ছে। আমরা চার-পাঁচজন মেয়েছেলে টিন দে কাঠ দে তোলা একটা ঘরে। এই ঘরেই অত্যাচার কইরত। সবার সামনে। কোনো আড়াল ছেল না, কোনো ভেদাভেদ ছেল না।’
‘কয়জন ঢুকত একসঙ্গে?’
‘একসঙ্গে চাইরজন-পাঁচজন কইরা ঢুকত। আর ভয় দিত যে, আমাগো কথামতো যদি না চলছ, তাইলে কইলাম মাইরা ফালাই দিমু নদীতে। ইসব কথা মনে পড়লে, ভয়েতে আমার কলজের রক্ত শুকোয় যায়।’
‘কথা বুঝতে পারতেন তাদের? আমি তো এক বর্ণও উর্দু বুঝতাম না।’
‘কী তারা বলত আমরা বুঝতে পারতাম না, আমরা খালি ভ্যাবলার মতো দাঁড়াই থাকতাম।’
স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে যে অ্যালকোহলিক হয়ে যাবে, মদ আর টাকার লোভে গুলশান এলাকায় সন্ধ্যার পর যে ঘুরঘুর করবে, বা টাকাও নয়, মাত্র কয়েক পেগ হুইস্কির বিনিময়ে যে সারা রাতের সঙ্গী হবে সাদা পুরুষদের, সে অর্থাৎ শ্যামলী রহমান বলে, ‘মেরেধরে এক ফোঁটা মদও অফিসাররা তখন আমারে খাওয়াইতে পারে নাই, তাই চিড়বিড়িয়ে মাথায় আগুন ধরে যাইত ওদের।’
মদ আর শরীর নিয়ে টানা-হেঁচড়া করতে করতে মাঝরাত। যেসব আর্মি অফিসার মদ খাওয়ার পর জীবনের পরোয়া করত না, তারা গভীর রাতে গাড়ি চালিয়ে বাড়ির দরজা পর্যন্ত শ্যামলীকে পৌঁছে দিত। বেশিরভাগ লোক কাজ শেষ হলে বিছানা ছেড়ে নড়তে নারাজ। শ্যামলীর কান্নাকাটিতে অতিষ্ঠ হয়ে তাদের একজন শুয়ে শুয়ে একদিন ফোন করে, ‘হ্যাল্লো শওকত জঙ্গ, জলদি আযা ভাই। আই হ্যাভ অ্যা গেস্ট। শি নিডস আ লিফট ইয়ার!’ তাঁবেদার অবাঙালি ব্যবসায়ী পাঁচ মিনিটে গাড়ি নিয়ে হাজির। রাস্তায় শ্যামলীর সঙ্গে কথা হয় না। বাড়ির দরজায় নামিয়ে দেওয়ার সময় সাপের মতো হিসহিসিয়ে বলে, ‘তোমাকে তো ভালো মেয়ে জানতাম। এ লাইনে কবে থেকে?’ শ্যামলী জানে, সে-ও তাকে কুপ্রস্তাব দেবে, তবে দুই দিন পর। ‘বুঝলে তো ইয়ে, আমার স্ত্রীর সঙ্গে একদম…’ প্রস্তাব দেওয়ার ভাষাটা বেসামরিক পুরুষদের ছিল এরকম। ‘এখন এসব কথা মনে পড়লে’ শ্যামলী বলে, ‘মাথায় আগুন ধরে যায়।’
পরদিন বস অফিসরুম লক করে তার ভাগের ট্যাক্স আদায় করে। আপত্তি জানালে আগে আগে চেক কেটে টেবিলের ওপর রেখে দেয়। বলে, ‘ইউ আর নাথিং বাট এ হোর।’ প্রথম প্রথম শ্যামলীর টাকাটা ছুঁতে ঘেন্না হতো। পরে দেখেছে নিলেও যা, না নিলেও তা। এদিকে খরচও বেড়ে যাচ্ছে। আত্মীয়স্বজন লুকিয়ে-চুরিয়ে টাকা চাইতে আসে। আড়ালে গিয়ে তারাই আবার কুৎসা রটায়। শ্যামলীর শরীরটা বারোয়ারি সম্পত্তি। তাই তার টাকায়ও হক আছে সবার। অফিসের ড্রাইভার-পিয়ন উঠতে বসতে গায়ে হাত দেয়, রাতে শোয়ার অফার করে।
