কিন্তু শ্যামলী তো বন্দি ছিল না। সে অফিস থেকে পালাল না কেন?
শ্যামলী বলে, একজন আর্মি অফিসার যখন তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে, সে পালাতে যাবে কেন। তাকে অচিরেই সে বিয়ে করবে। কনফারেন্স কক্ষে হাসির রোল পড়ে। শ্যামলী তো তখনো বন্দি। বন্দিদশায় বিয়েটা হতো কী প্রকারে?
বন্দি কারণ সেই ভুল-বোঝাবুঝি। তাকে ভুল করে ধরেছে পাকসেনারা। ক্যান্টনমেন্টে জেরা-নির্যাতন করে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ওষুধের দোকানের বিহারি কম্পাউন্ডারের কাছ থেকে অফিসারের হাতে চিরকুট পৌঁছাতে যত দিন লাগে, তত দিন তাকে বন্দি থাকতে হয়। তারপর আর্মি অফিসারটি শ্যামলীকে যে বিয়ে করবে, এ ব্যাপারে সে তখন একশ ভাগ নিশ্চিত। লোকটা শ্যামলীর মা খোদেজা বিবিকে আম্মি ডাকত আর বাচ্চা দুটিকে কোলে নিয়ে হাউ সুইট’ বলে গাল টিপে আদর করত। ছোট বাচ্চাটা তার গ্রেফতারের আগের সপ্তাহে হিসি করে অফিসারের ইউনিফর্ম ভিজিয়ে দেয়। শ্যামলী ভয়ে অস্থির। ‘এই এই বুলু, ছি বাবা, তুই যে আমার সর্বনাশ করলি!’ কিন্তু সর্বনাশ করেছে যে, তার সঙ্গে লোকটা তখন শিশুর মতো খিলখিলিয়ে হাসছে। কী নিষ্পাপ হাসি!
মুক্তিযোদ্ধা পারুলও তাতে সায় দেয়, ‘সবাই তো এক রকম ছেল না। আমারে যেদিন ধইরে নিয়ে আইসলো, আমার এ সমস্ত জাগায় বেয়নেট মারা ছিল তো, সমস্ত শরীর রক্তাক্ত। ওনার নাম ‘র’ দে শুরু। রউফ, আবদুর রউফ। একজন ডাকিলো তাই বুইঝলাম। তো উনি আমার গায়েটায়ে হাত বুলোয়ে দেখিলো জিনিসগুলি। তারপর উঠে গিয়ে একটা মলম কিনে আইনলো আমার জন্য। আর মালিশ দিতি দিতি অনেক কথা কইলো, যা লেখাপড়ার অভাবে আমি বুইঝতে পারিনি।’
‘গায়ের জোরে মিথ্যা বলব কেন?’ শ্যামলী আদালতের জবানবন্দির মতো হলফ করে বলে, ‘যা সত্য তা-ই বলব, সত্য বৈ মিথ্যা বলব না।’ অফিসারটা বিকালে এসে বলে, ‘ভালো লাগছে না। চলো একটু ঘুরেটুরে আসি। তারা গাড়িতে করে ঘোরাঘুরি করে। চলো কোথাও বসে একটুখানি চা খাই।’ শ্যামলী বলে, ‘চা না আমি কফি খাব। আল-এসলাম রেস্তোরাঁয় বসে কফি খাওয়ার পর অফিসার বলে, ‘জায়গাটা নিরাপদ না, মুক্তিফৌজ অ্যাটাক করতে পারে। যাবে আমার গেস্টহাউসে? ‘চলো যাই।’ লোকটা হাসে, না যেতে চাইলে জোর করব না।’ ‘না-না চলো।’ শ্রোতারা তাজ্জব। তবে অভিসার অভিসারই। জোরজবরদস্তি ধর্ষণ তো করছে না। কিন্তু সব যুদ্ধই একদিন শেষ হয়, এই যুদ্ধও শেষ হবে। শ্যামলী তখন কী করবে?
‘যুইদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই,’ বিন্দুবালা আঙুলের কড়া গুনে বলে, এই ধরেন আষাঢ় মাসে আমারে ধইরে নেছে, শাওন-ভাদর-আশ্বিন, তিন মাস পর কার্তিক মাসে মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়েরা আমাগের মুক্ত কইরলো। তখন তো বিন্দুবালাদের গায়ে কোনো পোশাকই ছিল না। মুক্তিযোদ্ধারা আশপাশের বাড়ি থেকে কাপড় এনে তাদের পরতে দেয়। ওখান থেকে বন্দি মেয়েরা চলে যায় যার যার বাড়ি। কিন্তু বিন্দুবালা যাবে কোথায়। যোগেন বাইন্যা তার পরিবার নিয়ে চলে গেছেন ভারতের শরণার্থী ক্যাম্পে। ভারতে তখন মুক্তিযোদ্ধাদের ডেইলি যাওয়া-আসা, আদান-প্রদান, যোগাযোগ। তারা বলল, ‘চলো বিন্দু, তোমারে আমরা ভারত দিয়ে আসি।’ বিন্দুবালা বেঁকে বসে, আর যেখানেই যেতে বলুক যাবে, ভারত সে যাবে না।
‘কেন?’
‘আমি যদি ভারতে যাই তো লোকে কবে তোরে মিলিটারিতে টাইন্যে নেছে, তোরে অত্যাচার কইরছে, তুই আবার এহনে ইন্ডিয়ায় আইছস ক্যা? তো আমি রাজি হলাম না। আর মুক্তিযোদ্ধা ভাইগের কইলাম-এই দেশ এই মাটি আমার মা, এই মাটিই আমার সব, মরতে হয় এই দেশেই আমি মরব। বলি, এক যুদ্ধ করে আইছি, আরেক যুদ্ধ করতে চাই। এই বুলে আমি তাগের হাতে হাত মিলাইলাম।’
টুকি বলে, ‘আমার শরীলের রক্ত দিয়ালে দিয়ালে হাত দিয়ে মেখ্যে আসিলাম, যে ঘরে ওরা আমারে একতালে চার মাস আটক রাখছিল।’
‘কেন?’
‘রাখিলাম, কেননা ইগুলি হলো চিহ্ন–নির্যাতনের চিহ্ন। মুক্তিফৌজ যেয়ে সেই ঘরে যে রক্তের দাগ পাইলো, ও তা আমারই শরীলের রক্ত।’
এদিকে শ্যামলীর লেখা চিঠি ওষুধের দোকান থেকে আর্মি অফিসার শাহাদতের কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে দু’দিন আর রিলিজ অর্ডার পেতে লাগে দু’দিন। চার দিনের মাথায় তার বন্দিজীবনের আকস্মিক পরিসমাপ্তি ঘটে।
১১. ভবিষ্যতের জল্পনা-কল্পনা
শ্যামলীর মুক্ত হওয়ার দিন অনুরাধা সারা রাত ঘুমাতে পারে না। মরিয়ম স্বপ্নের ভেতর অচেনা এক শহরের রাস্তা দিয়ে নগ্ন দেহে হেঁটে যায়। শোভা রানী দেখে, সে বিমল দাসের সঙ্গে গাড়িতে ঘুরছে। তাদের নিজস্ব গাড়ি–সাদা রঙের। বর্ণনাটা শোনার পর মরিয়ম বলে, শোভা রানীর স্বপ্নের গাড়িটার নাম ফক্সওয়াগন।
সেদিন ছিল ২৫ অক্টোবর ১৯৭১, সোমবার, টাইম ম্যাগাজিনের চাঞ্চল্যকর খবর-ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ৫৬৩ জন মেয়ের প্রত্যেকেই গর্ভবতী। তাদের গর্ভপাতের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। খবরটা বড় শ্যালক গোলাম মোস্তফার মুখে শোনার পর কফিলউদ্দিন আহমেদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। তিনি মগবাজারের বাসার ড্রয়িংরুমের সোফা ছেড়ে কপালে হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়েন। সেখান থেকে গোলাম মোস্তফার পা দুটির দূরত্ব মাত্র এক হাত। ফুলতলি থেকে এক দিনের পথ পাঁচ দিনে পাড়ি দিয়ে কফিলউদ্দিন আহমেদ গতকাল ঢাকা পৌঁছেছেন। উদ্দেশ্য, বয়সে আর সম্পর্কে ছোট হলেও শ্যালকের হাতে-পায়ে ধরে যদি মেয়েটাকে মুক্ত করা যায়। কিন্তু গোলাম মোস্তফা যত বার না-না করে মাথা নাড়েন, ততবার তার পদযুগল দোল খায় ডানে-বাঁয়ে। মুখে কিছু বলেন না। ফুলতলি, বল্লবপুর, নবীনগর, কোমলকান্দিসহ আশপাশের আট-দশ মৌজায় যার এত দাপট, ঢাকায় সে মশা মাছিরও অধম, এ কি বিশ্বাস করার মতো, না এ বিশ্বাস করা যায়? এমন কথায় গোলাম মোস্তফার মুখে হাসি ফোটে, দুলাভাই যে আমারে কী ভাবেন, তা কেবল আপনের খোদায় জানে।’ তবে শ্যালক-দুলাভাই দুজনেরই ধারণা, যে মেয়ে ঢাকা থেকে নিখোঁজ, সে যদি মরে গিয়ে না থাকে তো ওই সেনানিবাসেই আছে। সেখানে থাকার অর্থ তাদের অবিবাহিত মেয়েটা এখন গর্ভবতী এবং তার গর্ভপাতের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে।
