বিন্দুবালা বলে, ‘মিলিটারিরা ওই যে গেরামেরতে কেউর খাসি ধরে নিয়াসতো, কেউর মুরগি, গরু ধরে নিয়াসততা, দোকান লুটপাট করে চাউল, ডাইল, ত্যাল আনতো, রাজাকাররা ডাকবাংলায় বসে ওই তা রান্না করত।’
‘আপনেরে দিত খেতে?’
‘একবেলা চাইরডা ভাত দিত।’
‘ভাতের সঙ্গে?’
‘ওই যে রাজাকাররা মিলিটারিরা মুরগি ধরত, মুরগির ঠ্যাং-সিনা…’
‘পানিটানি দিত?’
‘পানির কথা বুল্লে ডাবের খোলায় করে পস্রাব আনি দিত আর পস্রাব করব বুলে পানিভইর্যা ডাবের খোলা আনতো।’
‘কাপড়-চোপড় কিছু দিছিল?’
‘না, আমি হেইকালে একদম বেবস্ত্র।’ বিন্দুবালা ঠোঁট চেপে কান্না রোধ করে, ‘এহনও রাইতে রাইতে স্বপ্ন দেহি, খাল-বিল ভাইঙা ওরা আসতিছে…’
সরকার বাড়ির কাজের মেয়ে টুকি, যে মরিয়মের সঙ্গে নতুনগাঁও থেকে একই দিনে ধরা পড়ে, যুদ্ধের বিশ বছর পর যে গার্মেন্টসের চাকরি ছেড়ে মরিয়মদের রায়েরবাজারের বাসায় মুরগি পুষতে শুরু করে, সে বলে, ‘আফা, এমনি আমার স্মৃতিশক্তি কম। মিলিটারির অইত্যাচারে অইত্যাচারে আরো কমে গেছে। এরা যে আমারে কই নিয়া রাইখলো, কী কইরলো–স্মরণে আসে না। তখন আঠারো বচ্ছর বয়স আমার। ওই বয়সে বাচ্চা হতিই পারে একজন মেয়েছেলের। সিখানে তাই আমার একটা বাচ্চা হয়্যেছিল।’ টুকির বাচ্চাটা ছিল স্টিলবর্ন–মরা। সে মেঝে থেকে পাটের বস্তা তুলে তা-ই দিয়ে বাচ্চাটাকে পোটলা বানিয়ে ঘরের কোনে রেখে দেয় । সেদিন আবার দরজা খুলে ঘরে ঢুকেছে মিলিটারি। টুকি বলে, ‘দুইকেই ওরা টাচ করতি চাচ্ছে আমাকে। অত্যাচারের একটা ইস্কিম নিয়ে আমার দিকে আউগাচ্ছে।’ তখন সে তাড়াতাড়ি পোটলাটা তাদের দিকে ঠেলে দেয়। বাচ্চা নিয়ে সেই রাতের মতো তারা সরে পড়লেও ঘরটা অপরিষ্কার থেকে গেল। টুকির শরীরে দুর্গন্ধ। ‘ঘরটা যে পরিষ্কার করতি হবে–হাঁড়িকুড়ি, ঝাঁটা-বালতি, কাঁথা-কাপড় কিছুই তো নেই আমার,’ টুকি আফসোস করে বলে। ‘আমি কোনোরকমে মাথা গুঁজে সিখানে বসে থাকি। কোনোদিন দেলো চারটা খালাম, না দেলো না-খালাম। পাগলের মতো সেখানে বাস করি।’
শ্যামলীর অবস্থাটা ভিন্ন। বিনা পয়সায় শাড়ি, কসমেটিকস সওদা করে আর্মি অফিসার যখন তাকে নিয়ে গেস্টহাউসে আসে তখন তার চোখ বাঁধা থাকে না। মেয়েটিকে তাদের ভয় পাবার কারণ নেই। যুদ্ধের দিনে চাকরি করতে এসেছে। অভাবের সংসার। ডির্ভোসি। দেশের লোক ভালো চোখে দেখে না। চাকরি ছেড়ে চলে গেলে আহার-বাসস্থানের অভাবে রাস্তায় মরে পড়ে থাকবে। এভাবে মৃত্যুবরণ বোকামি। শ্যামলী মরতে চায় না। মনে-প্রাণেও যতটা সম্ভব উদার। তা বলে একেক দিন একেকজনের সাথে সেক্স করা অস্ত্রের মুখে–শ্যামলী ভয় আর উৎকণ্ঠায় শক্ত হয়ে থাকে। তখন কেউ বুকে পিস্তল ঠেকিয়ে বিছানায় নেয়। কেউ মিষ্টি মিষ্টি কথা দিয়ে শুরু করে। ‘হাউ ওল্ড আর ইউ–সিক্সটিন?’ এরা ফ্লার্ট করে। লুক অ্যাট ইউ–সাচ সেক্সি লিপস! কাম অন, প্লে উইথ মি। কারো ধারণা মেয়েটাকে হুইস্কি গেলাতে পারলে কাজটা সহজ আর আনন্দদায়ক হবে। দুটি গ্লাসে মদ ঢালা হয়। একটায় কম, আরেকটায় বেশি। বেশিটায় ঘনঘন ঢালতে লাগে। কারণ বউ-বাচ্চার কথা বলতে বলতে, ইয়াহিয়া-ভুট্টো-শেখ মুজিবকে গাল দিতে দিতে সুরা নেমে যায় গ্লাসের তলায়। শ্যামলীর সামনের গ্লাস যেমন ছিল তেমন। ড্রিংক, ড্রিংক! প্রথম জোর করে ঠোঁটের ফাঁকে গ্লাস ঠেলে। জোরজবরদস্তকারীর চোখ লাল, স্বর জড়ানো। তার পরও শ্যামলী আপত্তি জানালে গ্লাস উপুড় করে ঢেলে দেয় তার যৌনাঙ্গে। বিকট চিৎকার আর অট্টহাসির মাঝখানে কয়েকটা মিনিট অন্ধকার।
মরিয়মের সারা শরীর প্রবলভাবে কেঁপে ওঠে। লাল সোফায় বসে বসে ঢুলছিল যে আর্মি অফিসারটি, তার নাম মেজর ইশতিয়াক। সন্ধ্যা থেকে ড্রিংক করছে মেজর। মাঝরাতে হলরুমের তালা খুলে মরিয়মকে এনে ফেলে দিয়েছে পাড় মাতালটার পায়ের কাছে। এর আগে গাড়িতে অর্ডার তালিম করা সৈন্যটি একবার পেছন দিয়ে আরেকবার সামনে থেকে পরপর দু’বার তাকে ধর্ষণ করে। তৃতীয়বার উদ্যত যখন, গাড়িটা সার্কিট হাউসের কোর্টইয়ার্ডে ঢুকে যায়। মরিয়মের গা-ভৰ্তি ঘামেভেজা ময়লা কাদা, চুল জট-পাকানো। সে ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে সার্কিট হাউসের ডাইনিং রুম দুর্গন্ধে ভরে যায়। মেজরের ব্যাটম্যান গলদা চিংড়ির ডিশ টেবিলে নামিয়ে এক জমাদারনিকে ডেকে আনে। সে তাড়াতাড়ি মরিয়মকে বাথরুমে ঢোকায়। তবে গোসলের সময় দরজা বন্ধ করতে দেয় না। পরনের ছেঁড়া লুঙ্গি-জামা জমাদারনিই খুলে দেয়। এ অবস্থায় শাওয়ারের নিচে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তোয়ালে জড়িয়ে মরিয়ম যখন বেরিয়ে আসে, ততক্ষণে ডিনার টেবিল সাজানো হয়ে গেছে। তাতে ঘিয়ে ভাজা লাল লাল গলদা চিংড়ি, মুরগির রোস্ট, পোলাও, জগভর্তি ফুটজুস। কত দিন পেট পুরে ভালো-মন্দ খায় না–মরিয়মের জিবে পানি চলে আসে। স্নান শেষে তাকে চেয়ারে বসতে দেওয়া হয়েছে ঠিকই কিন্তু পাতে কেউ খাবার তুলে দিচ্ছে না। নিজেরও তোলার সুযোগ নেই। টেবিলের ওপর মূল্যবান ডিশগুলো হাউজির নম্বরের মতো ঘুরতে ঘুরতে যখন তার সামনে থামে, তখন খালি ডিশ, শূন্য জগ বা চিংড়ির ঠ্যাং। মেজর ইশতিয়াক হো হো করে মাতালের হাসি হাসে।
