‘আপনার পরনে কী ছিল তখন?’
‘খয়েরি রঙের একটা ছাপা শাড়ি ছিল। এই কাপড়ের আঁচলডা এক্কেরে টানের চোটে দুই ভাগ হইয়ে গেছিল, ফাইরা হালোই ছিল কাপড়। বেলাউজ ছিল না শইলে। পেটিকোট ছিল না, না ছিল–এত বছর আগের কথা, আমি ঠিক বলতে পারি না।’
মুক্তিযোদ্ধা পারুল, যার নাম স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে এক সরকারের আমলে লেখা হয়ে পরের সরকারের সময় যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে বাদ পড়ে যাবে, সে বলে, ‘আমি ধরা পড়িছি সম্মুখসমরে। ওইটা শুক্কুরবার দিনগত রাইত। অস্ত্রসহ আমরা ধরা পড়িলাম। তখন পালাব কী কইরে? আর কোথায় পালাব? বর্ষার পানিতে খাল-বিল, খেত-খামার টুপু টুপু কচ্চে। আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না।’
‘আপনে যে একজন মুক্তিযোদ্ধা, হের প্রমাণ কী? বন্দুক চালাতি পারেন?’
‘হে পারি। পারি–দ্যাকপেন? আমরা ইভাবে সিনা টান টান করি থিরি নট থিরি রাইফেল ধরিতাম। চেম্বারে গুলি উঠোইয়ে যখন ফায়ার করতি হবে, তখন হাতের বাজুতে ঠেকিয়ে নিরিখ করে গুলি মাইরতে হবে। বাম হাত থাইকপে রাইফেলের মধ্যিখানে আর ডান হাত থাইকবে চাবির গোড়ায়।’
আর্মি ক্যাম্পে ধরে আনার পর একজন রাজাকার পারুলের হাতে বন্দুক তুলে দিয়ে বলেছিল–এই অস্ত্র ছাড়। তুই কী রকম আমাগের সাথে যুদ্ধ করেছিস দ্যাকা দিকি! দ্যাকা কীরকমভাবে ফায়ার করতি অয়।
‘তো আপনে গুলি করলেন?’
‘হে করিলাম। করার পর রাজাকার বুইল্লো–ওরেবাহ্ এ তো কিছু থোবে না নে। শ্যাষ করে দেবে। আমাগের গুষ্টি-গেরাত সব মাইরে ফেলাবে।’
শ্যামলী বলে, ‘কিন্তু কেউ ভারত যাচ্ছে কি না বা সেখানে গিয়ে ট্রেনিং নিচ্ছে কি না বা মুক্তিবাহিনী তৈরি হচ্ছে কি না–আমি জানি না। আমি নিজের যুদ্ধ নিয়াই ব্যস্ত।’ কেননা তখন সবে স্বামীর সঙ্গে শ্যামলীর ছাড়াছাড়ি হয়েছে, ছেলে দুটি থাকে এক জায়গায়, সে নিজে আরেক জায়গায়। এ রকম খারাপ সময়ে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। শ্যামলীর এলাকায় যুদ্ধের আগে থেকেই গন্ডগোল। বাঙালি-বিহারি লাগাতার দাঙ্গা। আজ এ ওরে মারে তো কাল ওরে এ মারে। লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, মিল ধর্মঘট কখনো বন্ধ হয় না। অসহযোগের সময় কয়েক দফা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়ে গেল বিহারি-বাঙালিতে। সর্বত্র লাশ। রক্তে পথঘাট পিছল। নদীতে নৌকো চলে না। লাশে লগি আটকে যায়। ফলে ২৫ মার্চের পর আর্মির তাড়া খেয়ে সেই এলাকার বাঙালিদের পালাতে দেরি হয়েছিল।
ব্যারিকেড ভেঙে মিলিটারিরা যেদিন শহরে ঢোকে, শ্যামলী লাশের ওপর দিয়ে দৌড়াতে শুরু করে। আশপাশের আর যারা পালাচ্ছে, সবারই পরিবার আছে, ওর ছাড়া। দশ-বারো জন উদ্বাস্তুর সঙ্গে সে এক পোড়ো বাড়িতে আশ্রয় নেয়। শ্যামলী তখন পুরোদমে নিঃস্ব। চাকরি নেই, টাকা নেই, স্বামী নেই, সন্তান নেই। পথের ভিখিরির অবস্থা তার। তবু সে এপ্রিল মাসটা সেই বাড়ির আশ্রিত পুরুষদের ভজিয়ে ভাজিয়ে থাকবার চেষ্টা করে। তাতে করে মেয়েরা তার বিরুদ্ধে চলে যায়।
স্বর্গধামের অনুরূপ অবস্থা–মরিয়মের মনে পড়ে।
মুক্তিযোদ্ধা পারুল বলে, আমার অবস্থাটা ভেন্ন। ভাগ ভাগ হয়ি ভাইগের সাথ আমরা থাইকতাম। রাতে কোনো দিন কেউ এক জায়গায় থাকতে পারিনি। যত দিন ধরা না পড়িছি, তত দিন জানে-মানে কোনো সময় নিরাপদ থাকিনি। কেননা কখন কোন বিপদ আসপে, কখন কার হাতে ধরা পড়ব, কে আমাদের ক্ষতি করবে, এই একটা চিন্তাভাবনায় সব সোমায় অস্থির হয়ে থাকতাম। আমরা পানির ভিতর কত দিন কাটাইছি! আমাদের রাইতও কাটছে পানির ভিতর। তখন তো ভাদ্র মাস।
‘এই যে মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের সঙ্গে থাকতেন কোনো অসুবিধা হয়নি?’
‘না, তখন এরকম কিছু হয়টয়নি। ছেলেতে-মেয়েতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করে যাচ্ছি। সমস্যা হয়েছে যুইদ্ধের পর, যখন সহযোদ্ধা শরাফত মিথ্যা কথা বুইলে পতিতালয় বিক্কিরি করতি নিয়ে গেল আমারে।’
‘কী সাজ্জাতিক অপমান!’ শ্যামলী ঝরঝরিয়ে কাঁদে। ওই বাড়ির লোকগুলো তাকে খেতে দিচ্ছে না, তার শোওয়ার বিছানাটাও মেঝে থেকে তুলে নিয়েছে। এর চেয়ে মরে যাওয়া ভালো। কিন্তু সে বলে, আমি বাঁচতে ভালোবাসি। এ অবস্থায় অতীত জীবনটা ফিরে পাওয়া একান্ত জরুরি। যেখানে একটা চাকরি আছে। মাসের শেষে মাইনে পাওয়া যায়। তা-ই দিয়ে নিজের হাতে সে বাজার করতে পারে। মিষ্টি আর খেলনা কিনে দিলে ছেলে দুটিও খুশি হয়। হাতে টাকা থাকলে তোকজন আড়ালে যা-ই বলুক, সামনে কিছু বলার সাহস পায় না।
শ্যামলীর নামেই অফিস। যুদ্ধের সময় আসল অফিস শুরু হয় বিকাল পাঁচটার পর। একেক দিন একেক আর্মি অফিসার গাড়ি হাঁকিয়ে আসে। বস সিডিউল করে দেন। আজ নৌবাহিনীর উইং কমান্ডার, কাল সার্কিট হাউস থেকে আসবে মেজর, পড়শু দিন মার্শাল ল কোর্টের কর্নেল–এইভাবে। তবে শেষ সময়েও সিডিউল রদবদল হতে পারে। যদি উইং কমান্ডার পর পর দুদিনই চান, সে ক্ষেত্রে মেজরের নাম কলমের খোঁচায় বাদ পড়ে যায়। জীবনের চেহারা ক্রমে পাল্টে যাচ্ছিল। আলিশান গাড়ি ড্রাইভ করে একেক দিন একেক অফিসার আসে–যেদিন যার পালা। জলের ভেতর যেন সাঁতারু মাছ, শহরের বিপণির সামনে দিয়ে গাড়ির আরোহীরা তেমনি নির্বিঘ্নে চলাচল করে। সুন্দর সুন্দর সিল্ক শাড়ি, পারফিউম, লিপস্টিক, ঘড়ি-গাড়ির জানালা দিয়ে চলে আসে। নেমে দোকান পর্যন্তও যেতে হয় না। দাম পরিশোধেরও বালাই নেই।
