মুক্তির মুখে যুদ্ধাপরাধের বিচারের গল্প শুনতে শুনতে বহু বছর পর মরিয়মের মনে পড়ে একজন মেয়ের কথা, যার নাম শ্যামলী-শ্যামলী রহমান। মুক্তিযুদ্ধের পর শ্যামলী রহমান যুদ্ধাপরাধের বিচারের অপেক্ষা করেনি, নিজের হাতে আইন তুলে নিয়েছিল। অথচ সে ছিল মরিয়মের জানামতে একমাত্র নারী, যুদ্ধাবস্থায় হলঘর থেকে জীবিত ছাড়া পাওয়ার সৌভাগ্য যার হয়েছে। এ ঘটনায় সবচেয়ে বেশি টাল খায় অনুরাধা। অমরত্বের ঊর্ধ্বলোক থেকে সে মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে। আর তখন থেকেই ভাবতে শুরু করে, সব যুদ্ধই একদিন শেষ হয়, এই যুদ্ধও হবে। কিন্তু তারা পূর্বপরিচয়ে আগের ঠিকানায় ফিরে যেতে পারবে না, তাদের জায়গা হবে দেশ বিদেশের বেশ্যালয়ে।
যুদ্ধের কয়েক বছর পর শ্যামলীর সঙ্গে মরিয়মের ফের দেখা পাকিস্তান। দূতাবাসের সামনে। সে মরচে ধরা কিচেন নাইফ কোমরে গুঁজে দিনেদুপুরে ঘুরঘুর করছে। পায়ে পোয়াতির মতো পানি নেমে গেছে, পরনে ময়লা শাড়ি, চুল মাথার ওপর উঁই করে বাঁধা, মুখে মদের গন্ধ। মরিয়মকে দেখামাত্র হাত ধরে টানতে টানতে রাস্তার ওপাশে নিয়ে শাড়ির কুঁচি সরিয়ে সে ছুরিটা দেখায়–যা দিয়ে মানুষ খুন করবে।
কাকে?
পাকিস্তানি আর্মি অফিসার শাহাদতকে, কারণ প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও লোকটা শ্যামলীকে বিয়ে করেনি। মাঝখান থেকে তার ছোট ছেলে বুলু মারা যায়, বিনা চিকিৎসায়, অবহেলায়।
কত কথা ডুবে ডুবে রয়েছে, কত শত নির্যাতন! বলতে চাইলেও পুরোটা মুখ ফুটে বলা যায় না। বা কথা তো গাছের পাতা, একবার খসে পড়লে ডালে ফেরত যাবে। কেঁচো খুঁড়তে হয়তো সাপ বেরিয়ে পড়বে। ‘কিন্তু’ মুক্তি তাকে জিগ্যেস করে, ‘যদি এমন হয় যে আপনারা সে সময়ের কয়েকজন একসঙ্গে বসলেন, বাইরের কেউ আশপাশে থাকল না, তখন কি বলা সম্ভব?’
সম্ভব কি না মরিয়ম জানে না। তবে মুক্তির কথা শুনে তার মুখে হাসি ফোটে। অনুরাধা নিজের কানে এ উদ্ভট প্রস্তাবটা শুনলে বইয়ের ভাষায় নাম দিত–নির্যাতিতের কনফারেন্স।
১০. নির্যাতিতের কনফারেন্স
শ্যামলী রহমান, যে মদ খেতে খেতে মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে লিভার সিরোসিসে মারা যাবে, সে বলে, ‘পাক-আর্মি আমারে ধরেছে ওষুধের দোকান থেকে, ভুলবশত। কারণ আমি অফিস করে দোকানে গেছিলাম ওষুধ কিনতে। আমার ছোট ছেলেটার অসুখ।’
‘ছেলের অসুখ তো বুঝলাম। কিন্তু মেয়েরা অফিস করত নাকি যুদ্ধের বছর?’
যুদ্ধের দিনে শ্যামলী অফিস করেছে। তার অফিসের নাম মুন জুট মিল। বস পাঞ্জাবি। সে নিজে একজন বাঙালি টেলিফোন অপারেটর। পাকড়াও হওয়ার দিনও শ্যামলী অফিসে গেছে। তবে অফিস ছুটির এক ঘণ্টা আগে ফোনে তালা লাগিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল। তাকে যেতে হবে রেললাইন পেরিয়ে শহরের বাইরে গ্রামমতো এক নিরিবিলি জায়গায়, নাম তালতলা। সেখানে শ্যামলীর বিধবা মায়ের তত্ত্বাবধানে তার ছেলে দুটিকে রেখেছে। ছোট ছেলে বুলুর অসুখ। মিলের গেটে বিহারি দারোয়ান হাতের তালুতে খৈনি পিষছিল। মুখ না তুলেই সে জানতে চায়, কাহা যারাহাহে, দিদি?’
‘হাম? হাম দাওয়াই লেকে।’
সেদিন শহরের অবস্থা খুব খারাপ। এলোপাতাড়ি ধরপাকড় চলছে। শান্তি কমিটির শীর্ষস্থানীয় নেতা দিনদুপুরে খুন হয়েছেন। হত্যাকারীর দলে শাড়িপরা একটি মেয়েও ছিল। কিন্তু ছেলের জন্য শ্যামলীর ওষুধ না কিনলেই নয়। সে দোকানে ঢুকে ব্যাগ থেকে প্রেসক্রিপশন বের করেছে, বিহারি কম্পাউন্ডার তা দেখার সুযোগও পায়নি, তখন এক দল আর্মি হুড়মুড়িয়ে ঢোকে। ছেলের জন্য সে ওষুধ কিনবেই আর আর্মিরা তাকে কিনতে দেবে না। এ সময় কিঞ্চিৎ সওয়াল-জওয়াবও হয়। যেমন কোথায় সে চাকরি করে, কোন আর্মি অফিসার তার চেনা, কে তার বন্ধু। এসব বলার পর পিস্তলের নল পিঠে ঠেকে গেলে, সে শুধু প্রেসক্রিপশনের উল্টো পিঠে দু’কলম লিখে কম্পাউন্ডারের হাতে চালান দেওয়ার ফুসরতটুকু পায়। এরপর মিলিটারিরা তাকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে জিপে তোলে।
যোগেন বাইন্যার মেয়ে বিন্দুবালা, যে মরিয়মের সঙ্গে একই দিনে নতুনগাঁও থেকে ধরা পড়ে, ’৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মুক্তিযোদ্ধা নজর আলী শাদি করার ফলে যার নতুন নাম হয় লাইলি বেগম, সে বলে, রাস্তা থিক্যা আমাগো বাড়ি হইছে আধা মাইল পথ। গিরামের বাড়ি তো–ঝোঁপজঙ্গল। গাছগাছালির ভিতর দে খালি ধোঁয়া দেখা যায়। আগুন, আগুন। গুলির আওয়াজ পাতিছি আর মানুষ সব পালাচ্ছে। বাবা মাকে বলে, তুমি বাচ্চা কয়ডা নিয়া অমুকখানে চলে যাও। আমি থাকি। মা কয়, তোমারে একা বাড়ি থুয়ে আমি যাব না। তো সবাই মিলে যাচ্ছি। আমরা খুব গরিব ছিলাম। এটুখানি যেয়ে মা কয়, বিন্দু গামলার ভাত চারটা এক দৌড়ে নে আয় তো, মা। ভাত খাতি না পেলে ছাওয়াল-পাওয়াল বাঁচপে না। বিন্দুবালা আগুনের ভেতর দিয়ে সার্কাসের মেয়ের মতো দৌড়ে দৌড়ে বাড়ি ফেরে। ভাতের গামলায় ডাল ঢালার সময়টুকু সে শুধু পায়। গামলা তুলে দৌড় দেওয়ার আগে পেছন থেকে একজন মিলিটারি তাকে জাপটে ধরে।
‘আপনে জোরাজুরি করেন নাই ওদের সঙ্গে?’
বিন্দুবালার মাথায় ছিল লম্বা বেণি। আগের রাতে চুলে তেল মেখে বুড়ি ঠাকুরমা শক্ত দড়ির মতো বিনুনি পাকিয়ে দিয়েছিলেন। তার লম্বা বেণিটা খপ করে ধরে মিলিটারি আর সে ধরে ঘরের খুঁটি। বিন্দুবালা বলে, ‘অগো সাথে পারা যায় না তো! এই খুঁটি ভাইঙা আমারে চিত করে ফালাই দিয়া ছেচড়াতে ছেচড়াতে নিয়া আসে। রাস্তায় রাইফেল কাঁধে করে রাজাকাররা আগে আগে হাঁটে, মেলেটারি হাঁটে অগো পিছন পিছন। আমি মধ্যিখানে।’
