যুদ্ধের পর এই ঘরগুলোতে একদল অনুসন্ধানকারী হয়তো তল্লাশি চালাবে। কিন্তু লুঙ্গি-গেঞ্জির ছেঁড়া টুকরা, হাড়গোড় এসব দেখে প্রথম বুঝতে পারবে না বন্দিরা নারী, পুরুষ ছিল। নিজের জট পাকানো চুল মুখের কাছে টেনে এনে অনুরাধার সেদিনের ভবিষ্যদ্বাণী–‘এই চুল তখন সাক্ষী দেবে।’
হয়েছিলও তাই। ভূগর্ভস্থ বাংকার আর ব্যারাকগুলোতে স্বাধীনতার পর রাশি রাশি লম্বা চুল আবিষ্কৃত হয়। মাদার তেরেসা ঢাকা সেনানিবাসে পৌঁছে গিয়েছিলেন ডিসেম্বর কি জানুয়ারিতে। তার মাথায় ছিল ভ্রুণহত্যার খ্রিষ্টীয় পাপ আর অনাগত শিশুদের দত্তক বানিয়ে বিদেশে পাঠানোর পাঁয়তারা। সেখানে মাদার কোনো মেয়ে দেখতে পাননি। গোছা গোছা লম্বা চুল, ঘেঁড়া পেটিকোট আর কিছু টুকিটাকি আবর্জনা দেখে সেইবার তাকে কলকাতায় ফিরে যেতে হয়েছিল।
অনুরাধা আরেক দিন আড়িপাতা বাদ দিয়ে মরিয়মকে উদ্ভট একটা প্রস্তাব দেয়, ‘চলো দেয়ালের গন্ধ শুকি। কানের বদলে নাক! কেন? মরিয়ম বেঁকে বসে। তখন ঘরের আরেক প্রান্ত থেকে ছুটে আসে শোভা রানী। অনাহারক্লিষ্ট দুর্বল শরীর, ঘন ঘন দম নেয়-হাঁপায়। দেয়ালে নাক ঘষে হাঁপাতে হাঁপাতে সে বলে, ‘অ্যাঁ রাম, কুমড়োর গন্ধ!’ শোভা রানী তখন গর্ভবতী। বলেই চাক চাক কুমড়ার টুকরা হড়হড় করে বমি করে দেয়। যদিও গত এক মাসের মেন্যুতে এক দিনও মিষ্টি কুমড়োর ঘাট ছিল না। শোভা রানীর পর মরিয়মের পালা। সে দেয়ালের ঘ্রাণ শোঁকে–ভেজা ইট-সিমেন্টের বালি বালি গন্ধ। ‘নাকটা চেপে ধরো!’ অনুরাধা উচ্ছ্বসিত, ‘কি, পাচ্ছ তো? আহা ধোঁয়া ধোঁয়া শিশিরের গায়ে জড়িয়ে থাকা শিউলি ফুলের মিষ্টি সৌরভ!’ বমির ওপর থেকে। শোভা রানী ক্লান্ত স্বরে বিড়বিড় করে, ‘মা দুর্গা কৈলাস ছেড়ে অচিরেই আসছেন।’ ইন্দিরা গান্ধীর চেহারাটা তার মনে আসে না।
শরৎ এসে গেছে, তারপর হেমন্ত। তাদের আর কতকাল এভাবে বাঁচতে হবে? অনুরাধা বলে, ‘মনোবল হারালে সৈন্যরা যেমন যুদ্ধ করতে পারে না, আমরাও তেমন বাঁচতে পারব না।’
মরিয়ম দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুক্তির দিকে তাকায়। যার এত বাঁচার শখ ছিল, সে আজ বেঁচে আছে না মারা গেছে? কত আশা ছিল মেয়েটার! ভবিষ্যৎ নিয়ে কত কথা! মুক্তি নড়েচড়ে বসে। তখন সময়টাই ছিল অন্যরকম। সে এক আশাবাদের যুগ-জটিলতাবর্জিত আর একরৈখিক। যেমন এক দেশ, এক জাতি, এক নেতা, এক স্লোগান। জয়বাংলা স্লোগান দেওয়ার বিনিময়ে মানুষ মরতে প্রস্তুত ছিল। তারা বিশ্বাস করত, রক্ত দিয়ে যে-কোনো অর্জনই সম্ভব। রক্তের আরাধনায় গীতিকার-গায়কেরাও মেতে ওঠেন–রক্তে যদি ফোটে জীবনের ফুল/ ফুটুক না ফুটুক না ফুটুক না। সেই বেহিসেবি আশাবাদের কালে অনুরাধার অমরত্বে বিশ্বাস ছিল।
অনুরাধা চেয়েছিল, কীভাবে তারা নির্যাতিত হলো, কারা তাদের নির্যাতন করল, কেন নির্যাতন করল–ভবিষ্যতের মানুষ সেসব জানুক, তাদের কথা মনে রাখুক। মুক্তিদের গবেষণার প্রকল্পে রয়েছে যুদ্ধাপরাধের বিচারের একটি সম্ভাব্য ছক, যা অনুরাধার মাথায় ছিল না। কারণ সময়টা ছিল ১৯৭১। মেয়েদের পক্ষ থেকে বিচারের দাবি উঠতে আরো দু’দশক লেগে যায় এবং তা বিস্তার লাভ করে পৃথিবীর আরেক ভূখণ্ডে। সেখানকার যুদ্ধ শেষ হওয়ার পঁয়তাল্লিশ বছর পরে। অভিযোগকারীরা কমফোর্ট উইমেন, যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জোরপূর্বক সৈন্যদের যৌনসেবায় নিয়োজিত ছিল। যুদ্ধশেষে এ মেয়েরা যেন দুর্গন্ধময় পচা মাছ-সমাজ-পরিবারে জায়গা পায়নি। সে আরেক কাহিনি–পৃথিবীর পূর্ব প্রান্তের, সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের, ঈশ্বরের প্রতিভূ সূর্যবংশীয় সম্রাট হিরোহিতোর আর তার সাম্রাজ্য বিস্তারের।
সম্রাট হিরোহিতোর যুদ্ধ ১৯৩২-এ মাঞ্চুরিয়ায় শুরু হয়ে, শেষ হয় ১৩ বছর পর ১৯৪৫ সালে বার্মায়, বর্তমান মিয়ানমারে। জাপানি সৈন্যরা নিয়তির মতো গোটা পথ বয়ে নিয়ে বেড়ায় কমফোর্ট স্টেশনসহ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বন্দি নারীদের। তারা তাদের বেঁধে-বেড়ে খাওয়ায়, নোংরা কাপড় কেচে দেয়, স্ত্রী বা গেইশাদের মতো যৌনসুখ বিলায়। বিনিময়ে রাজকীয় সেনারা সেসব মেয়েদের যৌনাঙ্গে তলোয়ার চালায়, স্তন কেটে নেয়, স্তন থেকে দাঁত দিয়ে বোঁটা উপড়ে ফেলে, গর্ভপাত করায়, শরীরে গনোরিয়া-সিফিলিসের জীবাণু ছড়ায়, গুলি করে, সাবমেরিনে তুলে গভীর সমুদ্রে ডুবিয়ে মারে। ’৪৫-এর আগস্ট মাসে তিন দিন আগে-পরে বোমা পড়ে হিরোশিমা আর নাগাসাকিতে। সম্রাট হিরোহিতো যুদ্ধে হেরে যান। ১৫ আগস্ট অনুগত সুনাগরিকদের উদ্দেশে রেডিওতে ভাষণ দেন তিনি, ‘আমি এখন থেকে আর ঈশ্বর নই, আমি মানুষ। মানুষ! জাপানিরা নাগাসাকি-হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়েছে বলে নয়, যুদ্ধে হেরে গেছে বলে নয়, সেদিন গণকান্নায় ভেঙে পড়ে তাদের এত কালের আরাধ্য। ঈশ্বরকে হারিয়ে। সেই ঈশ্বর ’৯১ সাল থেকে ক্রমাগত আসামির কাঠগড়ায়। কমফোর্ট নারীরা তাকে রাজকীয় কবর থেকে তুলে এনেছে। মানুষরূপী ঈশ্বর ধর্ষণের হোতা, কমফোর্ট স্টেশনের প্রতিষ্ঠাতা। উচ্চপদস্থ রাজপুরুষ-জেনারেলসহ তার বিচার হোক, সে ক্ষমা চাক, ক্ষতিপূরণ দিক। ’৩২ থেকে ৪৫-এর নির্যাতনের জন্য তো বটেই, যুদ্ধ পরবর্তী নারীর আমৃত্যু ক্ষয়ক্ষতির মাসুলও তাকে গুনতে হবে।
