তারা তখন হলরুমের মতো লম্বা একটি ঘরে বন্দি। জায়গাটা কোথায় মরিয়ম জানে না। কারণ চোখ বেঁধে তাদের ওখানে আনা হয়েছে, কয়েকবার বের করেও নিয়ে গেছে চোখ-বাঁধা অবস্থায়। প্রথম দিনেই মরিয়ম দেখেছে, ঘরের জানালা পেরেক। ঠুকে বন্ধ করা। প্রধান ফটক বাদে সব কটা দরজায় বাইরে থেকে তালা ঝোলানো। বিশাল ঘরে বাতির ব্যবস্থা নেই। যেটুকু আলো আসে ভেন্টিলেটর দিয়ে। ঘরে কয়েকটা ভূগ্রস্ত মেয়ে কম্বল গায়ে নড়াচড়া করে। তাদের আলাদা কোনো চেহারা নেই, পরিচয় নেই, নাম নেই।
‘ধরো আমার নাম অনুরাধা সরকার’–দেয়ালে আড়ি-পাতা মেয়েটি একদিন মরিয়মকে ফিসফিস করে বলে। মরিয়ম তার চোখ দুটি কাছ থেকে দেখে অবাক হয়। মাইনাস ফাইভ চশমার পরকলার অভাবে তার যে মাছের মতো ঘোলা চোখ-কথাটা বলে মরিয়মের দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসে অনুরাধা সরকার। তাকে তখন আরো অদ্ভুত দেখায়। পাকসেনারা বিএম কলেজের ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রীটিকে বইয়ের জগৎ থেকে উপড়ে এনে ফেলেছিল চার দেয়ালের মাঝখানে। প্রথম দিনের ধস্তাধস্তির ফলে। চশমাটা ভেঙে যায়। থাকলে কী হতো? এখানে তো এর কোনো কার্যকারিতাই নেই। তবে কাগজ-কলম বরাদ্দ থাকলে, অনুরাধা তাকে বলে, সে আনা ফ্রাংকের মতো। বন্দিজীবনের ডায়েরি লিখত।
যেদিন হলঘরের সর্বকনিষ্ঠ মেয়েটিকে দরজার বাইরে গুলি করে হত্যা করে মিলিটারিরা, অনুরাধা দেয়ালের কিনার থেকে হাতছানি দিয়ে ডাকে মরিয়মকে। সঁতসেঁতে দেয়াল। গত কদিন ধরে মেয়েটির কাশির সঙ্গে রক্ত পড়ছিল। যক্ষ্মা হয়েছিল বোধ হয়। তা বলে গুলি করে মেরে ফেলবে! হলঘরের মেয়েরা যখন নড়াচড়া করতেও ভয় পাচ্ছিল, দেয়ালে আড়িপাতার খেলা শুরু হয়ে যায় অনুরাধার। তারপর শুরু হবে অদৃশ্য খাতার পাতায় ডায়েরি লেখা। মরিয়ম এগিয়ে যেতে অনুরাধা। ফিসফিসিয়ে বলে, ‘দেয়ালে কান পাতো, মেরি। কি, শুনতে পাচ্ছ কিছু?’ মরিয়ম মাথা। নাড়ে। ‘শক্ত করে চেপে ধরো। পাবা। আরেক হাত রাখো ওই কানটায়। কী শুনতেছ?’ মরিয়ম ঠোঁটে তর্জনী চেপে তাকে চুপ থাকতে বলে। অনেকক্ষণ পর শোনে, রিমঝিম বৃষ্টির সুরেলা আওয়াজ। সে হয়তো অসম্ভব কিছু শোনার প্রত্যাশা করেছিল, তাই মুখ বেঁকিয়ে বলে, ‘এহ বৃষ্টি!’
‘হ্যাঁ বৃষ্টি।’ অনুরাধার চোখের কোণ দুটি সরু, কপালে গভীর কুঞ্চন। মরিয়ম কান খাড়া করে। অদৃশ্য খাতার পাতায় অনুরাধা কলম ছাড়া ডায়েরি লেখে-বর্ষাকাল এসে গেছে। মুক্তিযোদ্ধারা ভেবেছিল, সৈন্যরা জল-কাদায় নড়তে-চড়তে পারবে না। বৃষ্টির ভয়ে কেঁচো হয়ে থাকবে। তাদের অনুমান ভুল। সর্বাংশেই ভুল। স্পিডবোটে চড়ে সৈন্যরা এখন প্রত্যন্ত অঞ্চল চষে বেড়াচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যে গাঁয়ের মেয়েতে হলঘরটা ভরে উঠবে। এখন আমরা যদি হই পাঁচ, মাস শেষে দশ হব।
সত্যি সত্যি তা-ই হয়েছিল। নতুন মেয়েগুলোর একজনের নাম ছিল শোভা রানী। ঘোর বর্ষায় বাড়ির পেছনের জঙ্গলে সে ধরা পড়ে। শোভা রানীর বিয়ে হয়েছে। ছয় মাসও হয়নি। এর মধ্যে সে স্বামী হারিয়েছে। সুযোগ পেলেই গড়গড়িয়ে নিজের অত্যাচারের কাহিনি বলত আর হাপুস নয়নে কাঁদত। সেদিন জঙ্গল থেকে ধরে এনে। বাড়ির আঙিনায় দুজন সৈন্য তাকে ধর্ষণ করে। ঘটনাস্থলের অদূরেই ছিল কুমড়োর মাচা। যা শোভা রানীর স্বামীর পারিবারিক সম্পত্তি। যুদ্ধ শুরুর আগে সে মাটি কুপিয়ে নিজহাতে বীজ বুনেছিল। আর্মির ভয়ে পালিয়ে বেড়ানোর সময়ও গাছের গোড়ার আগাছা সাফ করেছে, পুকুর থেকে কলসি ভরে পানি এনে ঢেলেছে। স্বামী বিমল দাসকে সঙ্গে নিয়ে একটা একটা করে লকলকে ডগা সযত্নে তুলে দিয়েছে কাঁচা বাঁশের মাচায়। কুমড়ো-লতা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে লাগল। অজস্র হলদে ফুল ফুটিয়ে ফল। ফলাল। তখন চোর নেই চুরি করার। নিজেরা যে কুমড়ো পেড়ে স্বস্তিতে রান্না করে। একবেলা সবাই মিলে খাবে, সেই সুযোগও মিলিটারি আর রাজাকাররা তাদের দেয়নি। অথচ সেদিন একজন সৈন্য মাচার বড় কুমড়োটার বোঁটা ছিঁড়ে তাকে ধর্ষণের পারিশ্রমিক দিতে চায়। শোভা রানী ঘেন্নায় নেয় না। শাস্তিস্বরূপ উঠানের ঘাস-কাদায়। মাখামাখি তার রক্তাক্ত শরীরটা ক্যাম্পে চালান করে। এর আগে স্বামীকে গুলি করে মারে সেই মাচাটার নিচে। শোভা রানীর বৃদ্ধা শাশুড়ি সুরবালা তখন মুখ-বাঁধা অবস্থায় গলাকাটা মুরগির মতো দাওয়ার ওপর দাপাদাপি করছিলেন।
আস্তে আস্তে দিনগুলো আরো কঠিন হচ্ছে। গণধর্ষণের ফলে জবা নামের হাসিখুশি মেয়েটি সবার চোখের সামনেই মারা গেল। শেষ সৈন্যটি শরীরে থাকতেই ওর দম বেরিয়ে যায়। দিন গিয়ে রাত নামে, ডেডবডি সরাতে কেউ আসে না। কম্বলের নিচে পচে উঠছে তাদের রাতদিনের সঙ্গী, ফুলের মতো মেয়ে জবার শরীর। এরকম সময় অনুরাধা অদৃশ্য খাতার পাতায় ডায়েরি লিখছে–হানাদারদের সামনে দৃশ্যত এখন কোনো শত্রু নেই। যারা আছে, তারা পাটখেতের আড়াল থেকে রাতের অন্ধকারে অতর্কিতে আক্রমণ চালায়, পাকা সড়কে বা জলপথে অ্যামবুশ রচনা করে। অদৃশ্য শত্রুর ভয়ে সৈন্যরা তাই কাণ্ডজ্ঞানরহিত, দিশাহারা। এভাবে ভয় পেতে পেতে মনোবল হারিয়ে ফেললে তাদের দিয়ে আর যুদ্ধ হবে না। বাড়ির কথা মনে পড়বে–গলফ ক্লাব, টেনিস বল, ঘি আর টেংরি কাবাবের সেই সুখী, নিরাপদ, ভোগবিলাসের জীবন। কর্তারা তাই লাগাম খুলে দিয়েছেন–যে যত পারো খুন-ধর্ষণ লুণ্ঠন করো। এ কাজগুলো হচ্ছে ফুয়েল-পেট্রোলের মতো, যা যুদ্ধ চালু রাখে, এর গতি বাড়ায়। কিন্তু এইভাবে চলতে থাকলে…অনুরাধা কথার মাঝখানে খেই হারিয়ে ফেলে। আচমকা বর্তমান সময়টা ছুটতে ছুটতে আটকে যায় ধূসর অ্যালবামের পাতায়। যেখানে কতগুলো সাদা-কালো ছবি, যা ভবিষ্যতের মানুষ পাতা উল্টিয়ে দেখছে, বিশেষত আজকের মতো কোনো এক বৃষ্টির দিনে।
