সেদিন মন্টুর নিখোঁজ-সংবাদ পত্রিকায় দেখামাত্র, মরিয়ম তা এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলে। তবে বুঝতে খানিকটা দেরি হয়। হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি ক্রমে বেড়ে চলেছে। এ অবস্থায় সে ফের চেনা আলোকচিত্রটির দিকে তাকায়–মন্টুর তেলসিক্ত চুল পরিপাটি আঁচড়ানো, কপালটা ভেজা ভেজা, যেন আঙুল দিয়ে ছুঁলেই তেলের আঠায়। তর্জনী আটকে যাবে। ফুলতলি গায়ের ধূলি-বালি থেকে শহরে উপড়ে আনা কিশোরের দুঃখ ভারাক্রান্ত চোখজোড়ায় ক্যামেরার প্রথম ফ্লাশ বিস্ময় ফোঁটাতে পারেনি। ঠোঁট দুটি আঁটসাঁট–এক বুক অভিমান প্রাণপণে চেপে রাখার চেষ্টা করছে। কিছুতেই বাইরে বেরোতে দিচ্ছে না–স্টুডিওর লোকটার বারবার এক্স-রে মেশিন অপারেটরের মতো ‘দম ছাড়ো, বি ইজি’ বলার পরও। সেদিন স্টুডিও থেকে বেরিয়ে মরিয়ম ভাইয়ের ওপর খুব চোটপাট করে, ‘তুই একটা গাঁইয়্যা ভূত। এই ছবি দেখলে শহরের স্কুলে ভর্তি নেবে? শুধু শুধু কতগুলি টাকা খরচ!’
‘যারা আজও ফেরেনি’ শিরোনামের সচিত্র খবরের মাঝখানে ‘দম ছাড়ো, বি ইজি’ নির্দেশ অমান্যকারী মন্টুর সেই ফটোগ্রাফ–খবরের কাগজের প্রতিদিনের নিখোঁজের তালিকার আজ জায়গা করে নিয়েছে। মরিয়মের সামনে থেকে কাগজের অক্ষরগুলো জড়াজড়ি ছেড়ে সরে দাঁড়ায়, এক লাইন আরেক লাইনের পিঠ থেকে নেমে পড়ে, সিটি বাজানো বন্ধ হয়ে দেয়। একাত্তরের এপ্রিল মাসের শেষ দিকে মন্টু বাড়ি থেকে উধাও। ভারতের ট্রেনিং ক্যাম্পে থাকার সময় একটা হাতচিঠি পাঠিয়েছিল। তারপর আর খবর নেই। বাবা-মা, ছোট দুই বোন অধীর আগ্রহে তার অপেক্ষা করছে। কোনো সহৃদয় ব্যক্তি মন্টুর খোঁজ পেলে, তাকে নিম্ন ঠিকানায় যোগাযোগ করার অনুরোধ জানানো যাচ্ছে। পিতা কফিলউদ্দিন আহমেদ, সাং ফুলতলি, ডাকঘর সাহারপাড়।
এটি হারিয়ে যাওয়া মন্টুকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ঠিকানা। সেখানে বাবা-মা, ছোট দুই যমজ বোন রত্না-ছন্দা বাস করে। তারা বেঁচে আছে। মন্টু গত বছরের এপ্রিল মাস থেকে উধাও। মরিয়ম কোথাও নেই। তার জন্য বাবা-মা, ছোট দুই বোন। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে না। করলেও বিজ্ঞাপনে তার উল্লেখ নেই। কিন্তু সে তো বেঁচে আছে এবং ডাক্তারের কথামতো দ্রুত সেরে উঠছে! পুনর্বাসনকেন্দ্র থেকে বারবার তার ঠিকানা চাওয়া হচ্ছিল, যদি আপনজনেরা এসে নিয়ে যায়। কেউ কেউ নিরাময় লাভের পর ইতিমধ্যে নিজের বাড়িঘরে ফিরে গেছে। যদিও সংখ্যায় তারা অতি নগণ্য। ঠিকানা চাইতে এলে মরিয়ম পিঠ ফিরিয়ে দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকে, টুঁ শব্দটি করে না। বিজ্ঞাপনটা পড়ার পর তার মনে একটাই প্রশ্ন, মন্টু নিখোঁজ! স্বাধীনতার দু’মাস পর নিখোঁজ কেউ ফিরে আসে? মন্টু আসবে?
মরিয়মের সামনে থেকে হাসপাতালের সাদা দেয়ালটা সরে দাঁড়ায়। চোখের পর্দায় ভেসে ওঠে প্রায়ান্ধকার একটি কক্ষ। সেখানে টিমটিমে আলোর বালুবের নিচে ভাগ্যগণনা করছেন একজন কৃশ, খর্বাকৃতির লোক। স্বরটা অসম্ভব ভারী। যেন তার নয়, অন্য কারো কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত হচ্ছে—’হাতের তালুতে দীর্ঘ আয়ুরেখা নিয়ে অসময়ে চিরদিনের মতো কেউ হারিয়ে যেতে পারে না, যদি না প্রতিজ্ঞার বরখেলাপ হয়।’ ‘জ্যোতিষশাস্ত্রে সুপণ্ডিত, এশিয়া বিখ্যাত হস্তরেখাবিশারদ প্রফেসর কিউ এম তালুকদার’-এর চলটা ওঠা সঁতসেঁতে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে মনমরা হয়ে বসে আছে মন্টু। প্রফেসরের পাথরের আংটি পরা বিশাল থাবায় পাখির ছানার মতো তার কচি হাতটা তিরতির করে কাঁপছে। মরিয়ম অদূরে। আবেদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে সে উদ্বিগ্ন। গলির ভেতরের তস্যগলিতে সে একা আসতে পারবে না বলে ভাইকে সঙ্গে এনেছে। মন্টুর হাত দেখানো ছিল ফাউ। তাই ছোটবেলায় মরিয়ম যে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেছিল, প্রফেসরের প্রায়ান্ধকার ঘরে বসে সেদিন মনে পড়েনি। আজ পড়ছে।
মেরির সাত আর মন্টুর পাঁচ বছর বয়স তখন। আব্বা-আম্মার বিছানা থেকে সদ্য তাদের চালান দেওয়া হয়েছে পাশের ঘরে। সেখানে ভাই-বোনের জন্য পাশাপাশি দুটি বিছানা। তখন মন্টুর বড় কোনো অসুখ নয়, সামান্য জ্বরই হয়েছিল। ফুলতলি বাজারের হাতুড়ে ডাক্তারের ওষুধে সারছিল না। ভাইয়ের জন্য বোন অন্ধকার ঘরে নিঃশব্দে কাঁদতে কাঁদতে সেদিন আল্লার কাছে মানত করেছিল, মন্টু সুস্থ হলে ছাপরা মসজিদে চার আনার মোমবাতি দেবে। আজ দেবে, কাল দেবে করে কোনোদিন যা আর দেওয়াই হয়নি। ভাই সুস্থ হওয়ার পর আগের মতোই সেই ঝগড়াঝাটি মারামারি। একজন মেরে পালালে, মার খায় যে, সে অভিশাপ দেয়—’কুষ্ঠ হইয়্যা মরবি তুই।’ বড় হওয়ার পর মেরি-মন্টু একে-অন্যের মরণ চায়নি ঠিকই, তবে দীর্ঘায়ু কামনা করে খোদার দরবারে ফরিয়াদও জানায়নি। হয়তো জানাত, যদি তারা বাঁচতে বাঁচতে একদিন বৃদ্ধ হতো। সে সময়টা আসার বহু আগেই যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল।
মন্টু আজ নিখোঁজ। মেরি হাসপাতালের বেডে। তাকে বাবা-মার অস্বীকৃতিটাও মনে খুব বাজে। যদিও কেন্দ্রের রেজিস্ট্রেশনের দিন থেকে সে তাদের লাগাতার অস্বীকার করে এসেছে, নিজের পরিচয়টাও ঠিকভাবে কেসহিস্ট্রিতে লিখতে দেয়নি। তবে দুটি বিষয়ে ফারাক বিস্তর–বাবা-মা অস্বীকার করছে সন্তান আর সে আড়াল করেছে নিজের পূর্বপরিচয়, যে পরিচয়ে বাস্তবিকই সে আর বাঁচবে না। নির্যাতন ক্যাম্পের দেয়ালের কিনারে যে মেয়েটি আড়ি পেতে বসত, যার নাম অনুরাধা সরকার, এটি ছিল তার ভবিষ্যদ্বাণী। হাতের রেখা না দেখেই অনুরাধা ভবিষ্যৎ বলে। দিতে পারত।
