হেঁসেল থেকে বেরিয়ে যুদ্ধে যাচ্ছে মন্টু। রাজায় রাজায় যুদ্ধ নয়, গেরিলা যুদ্ধ। তাই কেউ বাদ্য বাজায়নি, শিঙা ফোঁকেনি, বাজি পোড়ায়নি। এই যুদ্ধের বাহ্যিক আড়ম্বর নেই, লোকের পিলে চমকে দেওয়ার মতো শান-শওকত নেই। হাতি নেই, ঘোড়া নেই। তবে মন্টুর মনে দামামা বাজছে, অসম্ভব কিছু করে দেখানোর উত্তেজনায় সে এগিয়ে যাচ্ছে সবার আগে-আগে। এমন পাগলের লাহান করতাছো ক্যান, মিয়া? আমিনুল তার স্টেনগানের ফিতা টেনে ধরে বলে, ‘এত সাহস কিন্তু ভালো না।’ মন্টু তার কথা আমলে নেয় না। আগের মতোই আচরণ করে। কী হয়েছে আজ মন্টুর, হা ভাতের মতো এমন করছে কেন সে? তারা চলেছে বিপজ্জনক এক অপারেশনে। সামনে যে লোহার রেলিং, কাঠের পাটাতনের বারো পিলারের ব্রিজ, এর মুখটায় রাজাকার ক্যাম্প। রাজাকারদের খেদিয়ে ব্রিজ দখলে আনতে হবে। তারপর হাতে সময় থাকলে ব্রিজ ওড়ানোর কাজ। এ অপারেশনে শরিফ ভাই নেই। তিনি পায়ে গুলি লেগে হাইডআউটে পড়ে রয়েছেন। তার অনুপস্থিতিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে দলের সেকেন্ডম্যান মতিন পাটোয়ারি। লোকটা দুর্ধর্ষ আর গোঁয়ার। আজকের অপারেশনের শেষ কোথায় খোদা মালুম।
আমিনুলের ডিউটি পড়ে খালের দক্ষিণ পাড়ে। ওইখানে কয়েকটা হিজলগাছ। ফুলের ঝুরি নামিয়েছে। হিজলগাছের আড়ালে পজিশন নিয়ে ফায়ার করতে হবে। খুব তাড়াতাড়ি যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। আমিনুল বলে, ‘পানি তো, পানির জন্যি আগুনি যায় না। গাছ ছাড়লে গায়ে গুলি আইসা লাগে। আমি গাছ ছাড়ি নাই। গাছের সাইডে দাঁড়াইয়্যা খালি গুলি করছি। আমার ডাইন সাইডে আমার পিছনে আমার বামে আমার সামনে অনেকে ফায়ারিং করতাছে। তহন কে বাঁশি দিল, মানে যুইদ্ধ শেষ, রাজাকার বাহিনী ভাইগ্যা গেছে। আমরা জাহুর দিয়া, জয় বাংলা স্লোগান দিয়া আগুই গেলাম।
অপারেশন সাকসেসফুল। তখন মাঝরাত। ভোর হতে আরো তিন-চার ঘণ্টা বাকি। এর মধ্যে কাঠের ব্রিজ ভাঙা শুরু হলো। মন্টু আর মিলন পোদ্দার নামে আরেকজনকে পজিশনে রাখা হয়েছে ব্রিজের ওপারে পাকা সড়কের দিকে মুখ করে। সবার নিরাপত্তার বিষয়টি তারা দেখবে। তারপর দলের বাকি ছেলেদের ডাঙায় রেখে মতিন ভাই চারজন যোদ্ধা নিয়ে খালের গলাপানিতে নেমে গেলেন। খালে আমিনুলও আছে। তারা পিলারের গায়ে সবে এক্সপ্লোসিভ লাগিয়েছে, তখনই মন্টুর সঙ্গের ছেলেটি–মিলন পোদ্দার যার নাম, সে নদীর ধু-ধু চড়া দিয়ে দুজন সৈন্যকে হেঁটে আসতে দেখে। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় পানিতে ডুবসাঁতার আর ডাঙায় ছোটাছুটি। সহযোদ্ধারা পালালেও মন্টু নড়ে না। চোখের ভুল বুঝতে পেরে মিলন আগের জায়গায় ফিরে আসে। পজিশন নিয়ে বলে, ‘আমি ভয় পাইছিলাম মন্টু, তুমি ভয় পাও নাই?’ মন্টু তার কথার জবাব দেয় না। সে তখনো চর বরাবর স্টেনগানের নিশানা করে শার্দুলের মতো মাটি আঁকড়ে পড়ে রয়েছে, যা ব্যতিক্রম শুধু নয়, অস্বাভাবিকও।
তারপর যার যার কাজে লেগে যায় সবাই। সেফটি ফিউজের মাথায় আগুন ধরানো হয়েছে। কাঠের ব্রিজের পাটাতন জ্বলছে ফরফর শব্দ করে। এর আগে ওপার থেকে উইথ ড্র করা হয়েছে মন্টু-মিলনদের। এখন পালানোর সময়। ঠিক তখন উল্টোদিক থেকে একটি তির্যক আলোকরেখা তিরবেগে ছুটে আসে। সবাই দৌড়াচ্ছে, পালাচ্ছে। মন্টু কোথায়? বিস্ফোরণের আর সামান্য বাকি। আর গাড়িটাও দ্রুত এগিয়ে আসছে। আমিনুল ঘাড় ফিরিয়ে সেদিন যা দেখেছিল, তা আজও তার অবিশ্বাস্য মনে হয়। সে ঘটনাস্থলের তখন এতটা কাছাকাছি, তীব্র আলোর ঝলকানি আর বিকট শব্দে ব্রিজটা যখন ভেঙে পড়ে তখন উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। আর অনুভব করে, বুকের নিচের মাটি ধাক্কা দিয়ে তাকে আসমানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অবশ্য বিস্ফোরণের আগে ঘাড় ফিরিয়ে আমিনুল যা দেখেছিল, সেই দৃশ্যটার তুলনায় এ কিছুই নয়। তখন মন্টুর গায়ে ছিল স্যান্ডো গেঞ্জি, পরনে লুঙ্গি, কাঁধে স্টেনগান। সেফটি ফিউজের ম্লান আলোয় তার ভুতুড়ে ছায়াটা প্রথম ব্রিজের কিনারায় উদয় হয়। তারপর সে জ্বলন্ত ব্রিজ ডিঙিয়ে নদীর ওপারের ঝোঁপঝাড় পার হয়ে আর্মির জিপের হেডলাইটের ওপর পতঙ্গের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে।
তখন মন্টুর স্টেনগানের নিশানা ছিল না।
০৯. অনুরাধার ডায়েরি
মন্টুর হারিয়ে যাওয়ার সংবাদ মরিয়ম দেখে ‘৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, পত্রিকার নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তির পাতায়। সে তখন নারী পুনর্বাসনকেন্দ্রের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তখন সিনেটর কেনেডিকে যে রাজকীয় সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছিল, তার সচিত্র প্রতিবেদনের নিচে একগুচ্ছ ছবিসহ নিখোঁজ বিজ্ঞাপনগুলো ছাপা হয়। তাতে মন্টুর স্কুলজীবনের সাদা-কালো ফটোগ্রাফ। নিচে লেখা সাইফুদ্দিন আহমেদ মন্টু। বয়স বিশ। এর আগে মরিয়ম হাসপাতালের বেডে দৈনিক পত্রিকা নাড়াচাড়া করলেও পড়ে দেখেনি কখনো। অক্ষরগুলো মনে হতো পরস্পর জড়াজড়ি করা, এক লাইন আরেক লাইনের পিঠে চড়ে সিটি বাজিয়ে চলে যাচ্ছে অজানা গন্তব্যে, যার সঙ্গে মরিয়মের কোনো সম্পর্ক নেই। নতুন দেশের মানুষের হাসি-কান্না, পুনর্মিলনী তাকে স্পর্শ করে না। শহিদ পরিবারের ফ্যামিলি ফটোগ্রাফগুলো বেজায় ক্লান্তিকর। বিদেশি স্বেচ্ছাসেবকদের উৎসাহ-উদ্দীপনার খবরাখবর সে দলা পাকিয়ে ছুঁড়ে ফেলে খাটের তলায়। ধ্বংসস্তূপের ওপর এত হাঁকডাক আয়োজন অন্য কারোর জন্য, এর শরিক নয় সে।
