উদ্বাহু মুক্তিযোদ্ধা মজিবরের মৃত্যুর দিনটা আমিনুলের স্পষ্ট মনে আছে। সেদিন ছিল বুধবার, হাটের দিন। আচমকা গোলাগুলি শুনে আমিনুল ভেবেছিল, আর্মি বুঝি গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে গ্রামে ঢুকে পড়েছে। কিন্তু পাল্টা আওয়াজ কেন? মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে আমিনুলের তত দিনে মর্টারের শেল ফাটার শব্দ, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের থেমে থেমে ব্রাশফায়ার আর রাইফেলের সিঙ্গল শট–আলাদা করে চেনা হয়ে গেছে। আর তো বিলম্ব চলে না। চটজলদি বাড়ির বগলের সবচেয়ে উঁচু সুপারিগাছটায় উঠে পড়ে সে।
গোলাগুলির শব্দটা ততক্ষণে থেমে গেছে। কিন্তু মানুষের দৌড়ঝাঁপের খামতি নেই। আমিনুল ওপর থেকে ধোঁয়ার ছোট্ট একটা কুণ্ডলী দেখে ইউপি অফিসের চাতালটায়। বাপরে, দিনদুপুরে শত্রুর আস্তানায় মুক্তিফৌজের আক্রমণ! যা হোক, ভিমরুলের চাকে ঢিল মারা হয়ে গেছে। এখন কামড়ানোর আগে পালাতে হবে। সেও গাছ থেকে নেমে পলায়নপর মানুষের কাফেলায় ভিড়ে যায়।
সন্ধ্যায় সাত রাজাকারসহ চার আর্মির পাততাড়ি গুটানোর খবর পেয়ে আমিনুল হাঁটা দেয় ক্যাম্পের দিকে। পথে থাকতেই একজন মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুসংবাদ কানে আসে। সে যে মৃত্যুর পরও দণ্ডায়মান, উদ্বাহু ছিল সেসময় পথচারীরা তা বলাবলি করছিল। ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখে, লাল গামছায় ঢাকা একটি সাধারণ মৃতদেহ। মাথার কাছে কুপি জ্বলছে আর লাশটা ঘিরে বসে আছে সাত-আটজন সহযোদ্ধা। শোকে মোহ্যমান। সংবিৎ ফেরার পর ভারতের ভূখণ্ডে তাদের বেসক্যাম্পে সৈনিকের মর্যাদায় তাকে গোর দেওয়ার প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু ওপারের কর্তারা তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাতে তারা ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়। অতীত বিদ্বেষ আবার ফিরে আসে। তারা বলে, দুদিন আগেও ভারত তাদের শত্রু ছিল, এখন মিত্র, কারণ তারা যুদ্ধ করছে ভারতের শত্রু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। আমিনুলের গা ছমছম করে। ভয় পেয়ে সাত রাজাকারসহ চার আর্মি ক্যাম্প ছেড়ে চলে গেছে ঠিকই, তবে যে-কোনো সময় ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ফিরতে পারে। শত্রুর দখলকৃত ভূখণ্ডে বসে বসে শোক করা বা রাগ দেখানো ঠিক হচ্ছে না। যে গেছে, গেছে। বাকি মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপত্তার দিকটা ভাবতে হবে। সে নিজ উদ্যোগে কোদাল হাতে পোর খুঁড়তে শুরু করে। ঠিক সে সময় সহযোদ্ধাদের বেষ্টনী ছেড়ে মন্টু এগিয়ে আসে। চাক-চাক মাটির ওপর দাঁড়িয়ে সে গোরখোদকের। কাছে একটা সিগারেট চায়। আমিনুল কানের গোঁজ থেকে বিড়ি বের করে তার হাতে দিলে সে বলে, জীবনে এই প্রথম কবর খোঁড়া দেখছে। গোরখোদক তাতে অবাক হয়, কোদাল চালাতে চালাতে জিগ্যেস করে, কী কও মিয়া, হাছাই? মন্টু মাটি কাটার ছপছপ শব্দ শোনে, উঁকি দিয়ে অন্ধকার গর্ত দেখে ভয়ে পিছিয়ে যায়। বিড়বিড় করে বলে, মানুষকে এভাবে গর্তে পোরাটা তার ভাল্লাগে না। কেমন দমবন্ধকর অনুভূতি হয়। অন্ধকারে আমিনুল ছেলেটার মুখ দেখতে পায় না। তবে বোঝে যে, সে ভয় পেয়েছে। আর ভয় তাড়ানোর জন্যই হয়তো আমিনুলকে না-দিয়ে বিড়িটা একাই সাবাড় করে দিয়েছে। ‘খোদার কী কুদরত,’ মুক্তিকে যুদ্ধের উনত্রিশ বছর পর আমিনুল বলে, ‘ছেলেডা কবরে গেল না। খানেরা লাশ গায়েব করে দিল ওর।’
মন্টুদের দলটা জঙ্গল ঘেরা একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে ঘাঁটি গাড়ার পর আমিনুল ইসলাম ঘরবাড়ি ছেড়ে তাদের সঙ্গে থাকতে চলে আসে। কারণ তাকে তখন উত্ত্যক্ত করছিল স্থানীয় রাজাকার বাহিনী। মিলিটারিরও ধরি ধরি ভাব। গ্রামে ঢুকে তারা জনে জনে জিগ্যেস করে, মুক্তিফৌজ কাঁহা হায়, মুক্তিফৌজ কাঁহা হায়। এরপর বাড়ি থাকা যায়? সব শুনে দলনেতা শরিফ ভাই বললেন, ‘আমিনুল, তুমি আমাগো লগে থাকতে চাও ভালো কথা, কিন্তু অস্ত্র ট্রেনিং তো লাগবে। তাইলে পর শত্রুর বিরুদ্ধে ফাইট দিতে পারবা।’ শরিফ ভাই কোমল মনের মানুষ হলেও দুর্ধর্ষ যোদ্ধা ছিলেন। তিনি সকাল-সন্ধ্যা আউরপাড়া স্কুলমাঠে আমিনুলকে নিজের হাতে ট্রেনিং করাতে লাগলেন। অস্ত্রের মধ্যে থ্রি নট থ্রি রাইফেল আর গ্রেনেড। গ্রেনেড চার্জ করতে বললেই আমিনুলের বুকটা কেমন ধড়ফড় করত। তাই থ্রি নট থ্রি রাইফেলটাই সে ব্যবহার করত বেশি।
মন্টুর ছিল স্টেনগান। এই নিয়েই সে অপারেশনে গেছে। আমিনুল ইসলাম গেছে থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে। তখন একসঙ্গে তাদের খাওয়া-বসা-শোয়া। অবসরমতো তাস পিটিয়েছেও একসঙ্গে। ‘তয় ছেলেডা বড় ডওরা আছিল, ঘুমের মধ্যে খালি কাইন্দা কাইন্দা উঠত।’ আমিনুল দুঃখ করে বলে, ‘হেরে আমি মায়ের পেডের ভাইয়ের মতো জানতাম। বয়সে ছোড়ু আছিল তো! ছেলেডার মনে কী দুঃখু আছিল রে মা, আমারেও কোনোদিন ভাইঙ্গা কয় নাই। দুঃখু কার ছিল না? হক্কলতে বাড়িঘর, বাপ-মা থুইয়্যা যুইদ্ধে গেছে। কারো বাপ শহিদ, বইনের খোঁজ নাই, বউরে মিলিটারি ধইরা নিছে।’
সে সময় ভয়কাতুরে স্বভাবের জন্য দলে মন্টুর খুব দুর্নাম। নিজে ভয় পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাকি ছেলেদেরও সে বিভ্রান্ত করত। তার জন্য পুরো দল দু-দুবার পথ হারিয়ে বিপদে পড়ে। রাতের অপারেশনে বেরিয়ে অন্যে যা দেখে না, সে তাই দেখে, অন্যে যা শোনে না, সে তাই শোনে। তার এই দেখাটা, এই শোনাটা ছিল সংক্রামক। একবার মুখ দিয়ে উচ্চারণ করলে, দলনেতা শরিফ ভাইও তা বিশ্বাস করে ফেলতেন। তখন পথ বদলানোর হিড়িক পড়ে যেত। এই করে করে একবার তারা পাক আর্মির অ্যামবুশের ভেতর পড়ে যায়। গেরিলা যোদ্ধাদের আর যা হোক পালানোর কায়দাটা ভালোই রপ্ত থাকে। সেই রাতে খালবিল সাঁতরে, গোলাবারুদ ভিজিয়ে, পরনের লুঙ্গি ফেলে কোনোক্রমে পালিয়ে আসে ক্যাম্পে। ক্ষতিটা হয় ভয়ংকর। অস্ত্রশস্ত্র শুকোতে, নিজেদের চাঙ্গা হতে তিন থেকে চার দিন লেগে যায়। ফলে দুটি জরুরি অপারেশন বাতিল করতে হয়। এর সাজাস্বরূপ লঙ্গরখানার কাজে ঢোকানো হয়েছিল মন্টুকে। যা ছিল তার জন্য অপমানজনক। কারণ এমন না যে, সে যুদ্ধ করতে চায় না। খুব চায়। কয়েকটা অপারেশনে দুর্ধর্ষ ভূমিকা রেখেছে। এভাবে তাকে বঞ্চিত করাটা অন্যায়। সে হাঙ্গার স্ট্রাইক করে। শরিফ ভাইয়ের দয়ার শরীর। তার জায়গায় আর কেউ হলে, যুদ্ধের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অপরাধে মন্টুর কোর্টমার্শাল হয়ে যেতে পারত। তিনি শুধু তাকে শপথ করান। সে যদি অন্ধকারে আলোর ফুটকি দেখে, ভূতের কানাকানি শোনে, তবু কাউকে মুখ ফুটে বলবে না। তা গোপন রাখবে। মন্টু আরেক ধাপ এগিয়ে যায়, দলনেতার বদান্যতায় মুগ্ধ হয়ে বলে, সে যদি এসব দেখেও, বা শোনেও নিজে তা বিশ্বাস করবে না। শেষের শপথ বাক্যটা মন্টুর জীবনে কাল হয়েছিল।
