শরিফ ভাইয়ের এ এক দোষ, সব সময় বক্তৃতা শেষ করেন মজিবরকে দিয়ে। মজিবর তাদের বীরত্ব না ভুলের প্রতীক? এখন বোঁচকা-বাচকি নিয়ে দেশে ঢুকতে গেলে মজিবরের কবরের পাশ দিয়েই তাদের যেতে হবে। কেউ তাতে রাজি হয় না। দেশে ফেরার অন্য কোনো পথও নেই। তাই তারা কৌতূহলী জনতার মাঝখানে। গুটিসুটি বসে রাতের জন্য অপেক্ষা করে। রাত নামার পর অন্ধকারের আড়াল নিয়ে ভীতিকর জায়গাটা পেরিয়ে যাবে, যেখানে দলের প্রথম ক্যাজুয়ালটি শহিদ মুক্তিযোদ্ধা। মজিবর চিরনিদ্রায় শায়িত।
দুজন ছেলেসহ মজিবরকে মধ্যমগ্রামে পাঠানো হয়েছিল অস্থায়ী আর্মি ক্যাম্প রেকি করতে। সময়টা দুপুর-বিকালের মাঝামাঝি। পরিষ্কার-ঝকঝকে দিন। তার মধ্যে দু-তিনটা গ্রেনেড অবস্থা বুঝে ফাটাবে। সেই মতো স্টেনগান বাগিয়ে, মাথা নিচু করে, কোমর বেঁকিয়ে শত্রুর আস্তানার পঞ্চাশ গজের ভেতর ঢুকে পড়ার পর সেন্ট্রি টের পেয়ে গেলে শুরু হয় বৃষ্টির মতো অঝোর গুলিবর্ষণ। বাকি দুজন পাটখেতের আড়াল নিয়ে পালিয়ে আসে। মজিবর পজিশন নিয়ে স্টেনগানের ট্রিগারে চাপ দেয়। দু’বারের ব্রাশেই ম্যাগাজিন শূন্য। তখন পাটখেতের ভেতর দিয়ে না পালিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে গ্রেনেডের পিন খোলে। তারপর বর্শা নিক্ষেপকারীর মতো সামনে কয়েক পা দৌড়ে গ্রেনেড ছোড়ে এবং সে অবস্থায় গুলি খেয়ে স্থির হয়ে যায়। আশপাশের গাঁয়ের লোক গোলাগুলির শব্দে তখন পালাচ্ছিল। হঠাৎ গোধূলির আলোয় একজন মুক্তিযোদ্ধার উত্তোলিত হাত এবং দৌড়ের ভঙ্গিতে শূন্যে ঝুলে থাকার দৃশ্যটি তাদের নিশ্চল করে দেয়। আরেক দফা গুলিবর্ষণের আগ পর্যন্ত তারা যার যার জায়গায় দাঁড়িয়েই থাকে।
যুদ্ধের উনত্রিশ বছর পর মুক্তির কাছে মধ্যমগ্রামবাসী অভিযোগ করে বলে যে, স্বাধীনতার ভাস্কর্যগুলি ঠিকভাবে তৈরি হচ্ছে না শহরে। তারা মুক্তির কাছে এমন একটা পাথরে খোদাই মুক্তিযোদ্ধার বায়না ধরে, যে উদ্বাহু, শূন্যে স্থির, বাংলার মাটিতে যার খাই নেই। ‘কেন?’ মুক্তির প্রশ্ন শুনে তারা খানিক ভাবে। এরপর বলে, বাস্তবে এমন একজন শহিদ মুক্তিযোদ্ধা তারা দেখেছে, যার স্মৃতি পাটগাছ বড় হয়ে মাথা ছাড়িয়ে গেলে তাদের মনে পড়ে। কারণ সে তো যুদ্ধ না করে পাটখেতে লুকোতে পারত। সেটা সে করেনি। কারণ সে মানুষ না, ফেরেশতা ছিল। আর চাওয়া-পাওয়ার হিসাবটা হলো মানুষের। মানুষ মরলেও দাবি ছাড়ে না। গাঁয়ের এক শহিদের মাকে দেখিয়ে তারা মুক্তিকে শেষের বাক্যটি বলে। তিনি অশীতিপর বৃদ্ধা, সোমত্ত ছেলে যুদ্ধে হারিয়ে উনত্রিশ বছর ভিক্ষা করে খাচ্ছেন। বাংলার মাটিতে তার ছেলের যে দাবি, তা সে ছেড়ে যায়নি। ছেলের হয়ে তিনি তা বহন করছেন। কবরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এই বোঝা তাকে বইতে হবে।
জীবিত মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে মধ্যমগ্রামবাসীর গর্ব নেই। একসময় অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করলেও সমাজের আর দশজনের মতোই এখন। সবার মতো তাদেরও বয়স বেড়েছে। ছেলেমেয়ের বাবা হয়েছে, কেউ-বা নাতি-নাতনির দাদা-নানা। যুদ্ধের পর পর তাদের যে জেল্লা আর দাপট ছিল, দেখে মনে হতো এ গাঁয়ের ছেলে হলেও তারা যুদ্ধ করে দেশটাকে স্বাধীন করেছে, তারা গ্রামের গৌরব, বীর মুক্তিযোদ্ধা–এখন আর ওসব কিছু মনে হয় না। চোখের সামনে তাদের উত্থান-পতন দুই-ই দেখেছে। গ্রামবাসী। তখন দু-একজন চাল-গম-কম্বলের ডিলারি করে বিস্তর কামিয়েছিল। যে পথে টাকা এল, সেই পথেই গেল। ভোগ করতে পারল না। তবে রিলিফের সিমেন্টে তৈরি থানা কমান্ডারের দালানবাড়িটা এখনো অক্ষত আছে। সরকার বদলের সঙ্গে দলবদল করে করে সে এখন দু-দুটি কোল্ড স্টোরেজ আর পেট্রোলপাম্পের মালিক। গায়ে থাকে না। নির্বাচনের আগে শহর থেকে নেমে আসে ভোট চাইতে। একেকবার একেক মার্কা। অন্যদের বেলায় সরকার বদল হয় তো বাড়িতে পুলিশ এসে তাদের ধরে নিয়ে যায়–মারে-কাটে। লাঞ্ছনার শেষ নেই। অবশ্য এমনিতেই দু-চারটা খুনখারাবির মামলা-মোকদ্দমা লেগেই থাকে। জেল খাটা, কোর্ট-কাছারি করা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। গ্রামবাসী মুক্তিকে বলে, আরো আগে তার গায়ে আসা উচিত ছিল। কারণ এখন কে মুক্তিযোদ্ধা, কে রাজাকার বলা মুশকিল। একেকটা সরকার ক্ষমতায় এসে যাচাই-বাছাই করে। তখন এমনও হয়, যে ছিল রাজাকার সে হয়ে গেল মুক্তিযোদ্ধা আর যে সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা ছিল, তার নাম কলমের খোঁচায় তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেল। সবকিছু এখন তালগোল পাকিয়ে গেছে। এ অবস্থায় মাথাটা পরিষ্কার আছে কেবল ভূমিহীন কৃষক আমিনুলের।
‘উহু হু-হু, হেই বছরডায় যে কী বিষ্টি!’ আমিনুল ইসলাম মুক্তিকে বলে, ‘আন্ধার রাইত, হাতের তালু দিহা যায় না, এমুন। ওরা আমাগো ঘরের পিছ দিয়া ছপছপ কইরা হাইট্যা যায়, আমরা ঘর থিক্যা টের পাই। পুকি দিয়াও দেহি, কথা কওনের সাহস হয় না।’ একদিন আমিনুল সাহস করে জানালা দিয়ে টর্চ মারে। আর যায়। কোথায়। সঙ্গে সঙ্গে হ্যান্ডসআপ করিয়ে টেনে-হেঁচড়ে বাইরে আনে। একজন মারে তো আরেকজন বাধে। সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের একটি জরুরি অপারেশন ছিল। আমিনুলকে সঙ্গে নিয়ে তারা ধানখেত, বিল-বাওড় পেরিয়ে যায় আরেক গ্রামে। সেদিন থেকে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে আমিনুলের ওঠা-বসা, বন্ধুত্ব। তার কাছ থেকে মুক্তি জানতে পারে, মধ্যমগ্রামে যার কবর, সে মন্টু নয়, তার নাম মজিবর, উদ্বাহু সেই মুক্তিযোদ্ধা। মজিবরের কবর খুঁড়েছে সে নিজে। দলনেতা শরিফ ভাই মন্টুর শেষ অপারেশনের আগেই পায়ে গুলি লেগে বেহুশ অবস্থায় হাইডআউটে পড়েছিলেন। তিনি আর যুদ্ধ করতে পারেননি। পরে তার পাওটাই কেটে বাদ দিতে হয়। আর মন্টুর মৃত্যুসংবাদ বয়ে নিয়ে গেছে যে মুক্তিযোদ্ধা ছেলেটি, নাম সরফরাজ হোসেন, তাকে সে সময় ভারত পাঠানো হয় অস্ত্র বা রসদ আনার জন্য। ‘৭৫ সালের আগস্ট মাসে মরিয়ম সরফরাজের কাছ থেকে মন্টুর কবরসংক্রান্ত ভুল তথ্যই পেয়েছে।
