দলনেতা শরিফ ভাইয়ের নির্দেশ পেয়ে গর্বিত পায়ে এগিয়ে যায় মন্টু। এমন একটা গুরুদায়িত্ব জীবনে এই প্রথম, যা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধেও নয়। স্কুলে পড়ার সময় বোনের সঙ্গে যে শহরে চলে আসতে হয়েছিল, তাতে জোরজবরদস্তি ছিলই। কেউ একবার জিগ্যেসও করেনি, ‘কি রে মন্টু, শহরে যাবি, না গ্রামে থাকাটা তোর পছন্দ?’ শহরে মন্টুর অবস্থা দাঁড়ায় গাছের খোড়ল থেকে ছিটকে পড়া চোখ-না-ফোঁটা পাখির ছানার মতো, যারা একদিন তার হাতের তালুতে তিরতিরিয়ে কাঁপত। কত রাত সে কেঁদে কেঁদে বালিশ ভিজিয়েছে! ওখানে মন্টু ছিল বোনের হাতের ক্রীড়নকতার ইচ্ছা-অনিচ্ছার দাস। শেষমেশ সে যখন মিছিল-মিটিংয়ের উত্তপ্ত নগরীর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ল, প্রথমবারের মতো ভাবতে পেরেছিল এটি তার নিজের শহর, তখনই মরিয়ম তাকে জোর করে গ্রামে পাঠিয়ে দেয়। তার বড় হওয়াটা পরিবারের কেউ কখনো গ্রাহ্যই করেনি। এমনকি বাইরের লোকেরাও। এখানে সে যে একজন ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা, সঙ্গের ছেলেরা তাকে একফোঁটাও দাম দেয় না। অবসর সময়ে ‘ডওরা মন্টু, রাইতে হিসি করে বিছানা ভিজায় দিস না কইলাম’ বলে বলে উত্ত্যক্ত করে। কেবল কমান্ডার শরিফ ভাই তাকে আজ যথার্থ সম্মান দিলেন। হাতে স্টেনগান দিয়ে বললেন, ‘কি রে, পারবি?’
পারব শরিফ ভাই, পারব–মাথা নেড়ে অস্ত্রটা হাতে নেয় মন্টু। তার মাত্র তিন গজ দূরে কয়েকটা আলোর ফুটকি–জ্বলছে-নিবছে। ভাই রে মন্টু, ভয় পাস না, এগুলো আলেয়ার আলো। সংসারে এদের অস্তিত্ব নাই রে ভাই। এরা মায়ার জালে জড়িয়ে পথিককে দিগভ্রান্ত করে, ভুল পথে টেনে নিয়ে হত্যা করে। এক-দুই-তিন শরিফ ভাইয়ের কণ্ঠস্বর যেন বহু দূর থেকে ভেসে আসে। তিনি যেন অন্য কারো গলায় অর্ডার দেন, ‘মন্টু রেডি? ফায়ার ওপেন কর। বিশ্বাসঘাতকের শাস্তি মৃত্যু।’ ঠা-ঠা-ঠা মন্টুর স্টেনগানের মুখ থেকে এক ঝলক আগুন বেরিয়ে যায় অট্টহাসি দিয়ে। আর উড়ে গিয়ে বিদ্ধ করে গাছে বাঁধা লোকটির বক্ষদেশ, কণ্ঠা, দাড়ি। নিমেষে দশাসই লোকটা পাখির ছানার মতো ছটফটিয়ে নিঃসাড় হয়ে গেল। এর আগে পানি খেতে চেয়েছিল পাখির মতোই চঞ্চু ফাঁক করে। সেই রাতের নায়ক মন্টু। শরিফ ভাই নিজ হাতে দিয়াশলাই জ্বেলে চারমিনার ধরিয়ে দেন। ফেরার পথে পিঠ চাপড়িয়ে বলেন, পিছিয়ে না পড়ে পাশাপাশি হাঁটতে। খানিকটা এগিয়ে ফের লুকোচুরি খেলা শুরু করে মন্টু। তারপর যথারীতি গোঁ-গোঁ ভয়সংগীত।
মুখে যে যা-ই বলুক, দলের সবাই যে সাহসীতা নয়। বিষয়টা ধরা পড়ে ভারত থেকে ক্যাম্প গুটিয়ে আসার দিন। এর আগে তারা ছিল অনুপ্রবেশকারী, আরেক দেশের বর্ডার ক্রস করে চটজলদি আক্রমণ চালিয়ে রাতের অন্ধকারে ফিরে গেছে। যুদ্ধের ভাষায় একে বলে-ইনফিলট্রেশন। কাজটা বেআইনি। যত দিন না ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ বাধানো হচ্ছে, ভারত তত দিন পাকিস্তানের ভূখণ্ডে যুদ্ধ করার জন্য লোক পাঠাতে পারে না। এ ছাড়া মন্টুদের ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে দেশের মধ্যে ঢুকে গেরিলা কায়দায় যুদ্ধ করার জন্য। এর ফলাফল হাতে-নাতে পাওয়া যাবে না ঠিকই, তবে নানান রকম নাশকতামূলক কাজ করে শত্রুকে ব্যস্ত রাখার নামও যুদ্ধ। এতে করে শত্রুসৈন্যের কাজে বিঘ্ন ঘটবে। তারা বিরক্ত হবে। ভয় পাবে। পরিশ্রান্ত হয়ে পড়বে। মেজর শর্মার দীর্ঘ বক্তৃতায় ছেলেরা খুশি হতে পারে না। ভারতের এই ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ কৌশলে তাদের ঘোর আপত্তি। তাহলে দেশটা স্বাধীন হবে কবে? মেজরের পক্ষে এর জবাবে কিছু ভেঙে বলা সম্ভব নয়, তা স্টেট সিক্রেট। তিনি ছেলেগুলোর ওপর বিরক্ত হন। এরা দেখা যাচ্ছে, দিনদুনিয়ার কোনো খবরই রাখে না! রাতের বেলা দু-চারটা দালাল খতম করে ভারতে বসে স্বপ্ন দেখে দেশ স্বাধীন করার! তিনি তাদের দুই ব্যান্ডের রেডিও কেনার পরামর্শ দিয়ে ক্যাম্প ছেড়ে বেরিয়ে যান। পেছনে তার আদেশটা বহাল থাকে।
রেডিও কেনা হয়, তবে তা শোনার সময় বা ইচ্ছা কারো নেই। দিন থাকতেই পাততাড়ি গোটাতে হবে। সন্ধান করতে হবে নিরাপদ আশ্রয়ের। দুটি মিলিটারি ট্রাক বর্ডারের কাছাকাছি স্থানে মালসামানসহ মন্টুদের নামিয়ে দিলে তাদের অবস্থা দাঁড়ায় শরণার্থীদের মতন। পার্থক্য শুধু শরণার্থীরা যাচ্ছে ভারতে, তারা উল্টো ঢুকছে শত্রু আক্রান্ত ভূখণ্ডে। দৃশ্যটা সত্যিই বিরল। তা দেখতে আশপাশের দু’চার গায়ের লোক ছুটতে ছুটতে আসে। যেন সার্কাস পার্টি গ্রামে ঢুকেছে। ছোট ছোট ছেলেরা সবচেয়ে বেশি বেপরোয়া। তাড়া করলে খিলখিলিয়ে হেসে পালিয়ে যায়, পরক্ষণে বন্দুকের ধাতব নলগুলো ছুঁয়ে দেখার জন্য পা টিপে টিপে ফিরে আসে। ভিক্ষুকের ঘোড়াটা সঙ্গে থাকলে একজন ভাবে, তারা নাজেহাল হতো কম। ঘোড়া আভিজাত্যের প্রতীক, এমনকি তা ভিক্ষুকের হলেও। ক্যাম্প গোটানোর সময় একজন প্রস্তাবটা দিয়েছিল। তার যুক্তি ছিল, যুদ্ধে ঘোড়সওয়ার বাহিনী থাকে না! আমরাও একে যুদ্ধের কাজে লাগাতে পারি। তত দিনে কয়েকজন ছেলে অশ্ব চালোনায় সুদক্ষ হয়ে উঠেছে। শরিফ ভাই রাজি হলেন না। উল্টো ঝাড়া এক ঘণ্টা বক্তৃতা দিলেন-তোমাদের বোঝা দরকার, গেরিলা যুদ্ধ সম্মুখ-সমর নয়। তা করতে হয় নিঃশব্দে, শত্রুকে নিজের উপস্থিতি জানান না দিয়ে। তার জন্য খালি পায়ে জল-কাদা পাড়াতে পাড়াতে আমাদের আঙুলের চিপায় সাদা সাদা ঘা হয়ে গেল, পায়ের তলাটা চালনির মতো ঝাঁঝরা করে ফেলল পানিপোকারা। সহযোদ্ধা মজিবর গুলিবিদ্ধ হলো শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গ্রেনেড ছোঁড়ার সময়…
