‘তোমরা প্রতিশোধ নাও,’ মন্টু শোনে মেজর শর্মার উত্তেজিত স্বর। এখন বক্তৃতা প্রায় শেষ পর্যায়ে। তিনি বলছেন, ‘ডোন্ট বি অ্যাফরেড। হামলোক তুমহারা সাথ হ্যায়। তুমকো মদদ করে গা। অল শর্টস অব হেলপ। দেখো, একদিন না একদিন তুমহারা দেশ স্বাধীন হোগা। ইয়ে হোনে চাইয়্যে। গুডলাক সান। জয় বাংলা।’
সেই রাতে বর্ডার পেরিয়ে মন্টুদের দল রাজাকার ধরার অভিযান চালায়। রাজাকারকে বাড়ি না পেয়ে তার টাটু ঘোড়াটা ক্যাম্পে নিয়ে আসে। এর পিঠে চড়ে লোকটা ধানের মৌসুমে ভিক্ষা করতে বেরোত। ফেরার সময় তারা পাঁচটা গ্রেনেডের চারটাই ভিক্ষুকের খালি উঠোনে ছোড়ে। যার একটাই শুধু ফাটে বিকট শব্দে। তারা ছুটছে, সঙ্গে ঘোড়াটাও। দেশের মাটিতে ক্ষণকাল তিষ্টানোরও সাহস নেই তাদের। তাড়াহুড়োয় গ্রেনেডের পিন খুলতেও ভুলে গিয়েছিল। ভারতের সীমানায় ঢুকে তবে তারা দৌড়ানো থামায়। ভাবে, তারা চোর, ঘোড়া চোর। আর চোরের মতোই হয়েছে তাদের প্রথম দিনের অপারেশন।
‘অ্যাই করে হবে যুইদ্ধ, দেশ স্বাধীন হইব এইভাবে?’ তিরস্কারটা করেন স্বয়ং প্লাটুন কমান্ডার। একই প্রশ্ন অপারেশনে যাওয়া ছেলেদেরও। তবে তারা এজন্য খুশি যে, জানটা হাতে নিয়ে ক্যাম্পে ফিরতে পেরেছে। একজনও খোয়া যায়নি। নিজের দেশ যে এত ভীতিকর–জানা ছিল না। ভারতের প্রশিক্ষণ-শিবিরে থাকার সময় শুধু ভেবেছে, কবে মশা আর জোঁকের কামড় থেকে রেহাই পাবে, আধপেটা খেয়ে শারীরিক কসরতের দিন ফুরাবে কবে, কখন স্বদেশে ঢুকবে একজন পরিপূর্ণ যোদ্ধার মতো অস্ত্র হাতে। এর মধ্যে তাদের গায়ের চামড়া পুড়ে তামাবর্ণ ধারণ করেছে, পেশিতে নীল শিরার নকশা ফুটেছে আর মুখ ঘিরে আছে না-কাটা দাড়ি-গোঁফের বিশৃঙ্খল জঙ্গল। পরিবর্তিত অবয়বের তলায় মনটাও ক্রমে বদলে যাচ্ছিল। যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে কারো এক মুহূর্ত তর সইছিল না।
প্রথমে তারা হতাশ হয় অস্ত্রের স্বল্পতা দেখে। পাকবাহিনীর আছে ট্যাংক, মেশিনগান আরো সব অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র। এসবের বিরুদ্ধে রাইফেল, স্টেনগান, গ্রেনেড দিয়ে কত দিনে তারা দেশটা স্বাধীন করবে? তারপর সামান্য গ্রেনেড ব্যবহার করতে না পেরে ভীষণ দমে যায়। প্রতিশোধের আগুনটাও কখন যেন নিভে ছাই হয়ে গেছে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্র এসব হতাশা, নৈরাজ্য বরদাস্ত করে না। তোমাকে মারতে বা মরতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। প্লাটুন কমান্ডারের এ রকম কড়া কথা শুনে একেক সময় যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তাদের পালাতে ইচ্ছা করে। পুরোনো দিনগুলো পেছনে টানে শার্টের আস্তিন ধরে। সেখানে ছিল পরীক্ষার পড়া মুখস্থ করার মতো ক্লান্তিকর জীবন। কখনো কখনো প্রেমপত্র লিখে নাস্তানাবুদও তারা হয়েছে। প্রতারণা আর প্রত্যাখ্যানের ভুক্তভোগী দলের কম-বেশি সবাই। তখন আত্মহত্যা করা ছাড়া কোনো পথ দেখতে পায়নি। যুদ্ধের তোপের মুখে পুরোনো কষ্টগুলো বাতাসে উবে যায় । একঘেয়ে অতীতটা হয়ে ওঠে নানা বর্ণে উজ্জ্বল, স্বপ্নের মতো স্পর্শাতীত।
তত দিনে পুরোদমে বর্ষা শুরু হয়ে গেছে। বেছে বেছে বৃষ্টির রাতগুলোতে অপারেশনের সময় ধার্য করা হয়। তারা গামছায় গ্রেনেড পেঁচিয়ে কোমরে বাঁধে, গায়ে চড়ায় অন্ধকারে মিশে যাওয়ার মতো গাঢ় রঙের শার্ট, কাঁধে ঝোলায় স্টেনগান বা রাইফেল, পরনের লুঙ্গিটা ভাঁজ করে হাঁটুর ওপর তুলে কোমরে গিঁট দেয়, তারপর একটুকরো পলিথিনে মাথা মুড়িয়ে খালি পায়ে বেরিয়ে পড়ে ক্যাম্প থেকে। শত্রুবাহিনী জোঁকের মতো সঁতসেঁতে বাংকারের গায়ে লেপ্টে আছে। গর্ত ছেড়ে বেরোনোর হিম্মত নেই। এই সুযোগে মন্টুরা অবরুদ্ধ স্বদেশের পথে ভিজতে ভিজতে এগিয়ে চলে। যদিও তারা আসল শত্রুর মুখোমুখি তখনো হয়নি, বুঝতেও পারছে না স্বাধীনতা কত দূর, তবুও প্রতিটি পদক্ষেপে মাড়িয়ে যাওয়া জল-কাদা-ঘাস তাদের মনে হয় নিজেদের অর্জন। এমনকি বর্ষার মেঘ থইথই আকাশ, বাংলার আকাশটায়ও যেন শুধু তাদেরই অংশীদার আর ঘুটঘুঁটে অন্ধকার রাত তাদের একার সঙ্গী। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রমের সময় জীবনের মায়া ত্যাগ করার বিনিময়ে এসব তারা অর্জন করেছে। মৃত্যুতেও যা হাতছাড়া হওয়ার নয়। অস্ত্রের চেয়ে এই দখলদারি মনোভাবের শক্তি প্রবল। তা তাদের শহিদি প্রেরণা জোগায়, শত্রু খতমে উদ্বুদ্ধ করে।
সমস্যা হলো, অপারেশনের রাতে বেশিরভাগ সময় টার্গেট বাড়ি থাকে না। কী করে যেন আগেভাগে খবর পেয়ে পালিয়ে যায়। তবে মন্টুরা সেসব বাড়ি থেকে খালি হাতে কখনো ফেরে না। গরুটা, ছাগলটা দড়ি ধরে গোয়াল থেকে বের করে আনে। সেই সঙ্গে সংসারের টুকিটাকি জিনিস দিয়ে উঠোনে বসে বোঁচকা বানায়। যুদ্ধের ময়দানে এসব জিনিস কী কাজে দেবে জানে না, তবে লোভে পড়ে বা দালালদের শায়েস্তা করার জন্যই হয়তো মালসামান লুট করে। বা খালি হাতে ফেরার মধ্যে পরাজয়ের যে গ্লানি থাকে, লুটপাটের উত্তেজনায় সেটা চাপা পড়ে যায়।
ফেরার সময় প্রতিবার এক দুর্বোধ্য ভয় মন্টুকে তাড়া করে। তার সামনে যেন রাতের সেই রহস্যময় জলাভূমি, যা পেরিয়ে আর কোনোদিন বাড়ি ফেরা হবে না। সে দু’কলাম করে মার্চ করা মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝখানে অনবরত জায়গা বদলায়। লুটের মালামালের আড়ালে লুকোতে চায়। তারপর একসময় দেখে, সে সবার পেছনে। পেছনটা শূন্য, সামনে অন্ধকার। সেখানে কয়েকটা আলোর ফুটকি। তখন মুখ থেকে। গোঁ-গোঁ আওয়াজ নিঃসৃত হয়–সহযোদ্ধারা যার নাম দিয়েছে ভয়সংগীত। তার এই ভয় জয় করার জন্য দলনেতা যেদিন দালাল খতম করার হুকুম দেন, সেদিনও ফেরার পথে সে একই কাজ করে।
