তখন তাদের ধরে এনে কোথায় রেখেছে, কী করেছে মরিয়ম জানে না। চিৎকার শুনেছে শুধু। কে কোথায় কাঁদছে? পাশের রুম, না তার পরের রুম? স্কুলবাড়িতে তো রুমের কমতি নেই! যুদ্ধের আগে সিক্স থেকে টেন পর্যন্ত ক্লাস চলত একসঙ্গে। কান্নাকাটির শব্দে আন্দাজ করত যে, কাছাকাছি আরো কয়েকটি মেয়ে আছে। তাদের মধ্যে টুকি, বিন্দুবালার থাকাটা অসম্ভব নয়।
মল্লিকপুর থেকে মরিয়ম যেদিন চালান হয়, তখন রাত না দিন, মেয়ে দুটি সঙ্গে আছে কি নেই, তারা শাড়ি পরেছে কি পরেনি, বোঝার উপায় ছিল না। কারণ ঘর থেকে চোখ বেঁধে তাদের বাইরে আনা হয়। সেখানে অন্ধ প্যাঁচার মতো তারা দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর মিলিটারিরা পাছায় লাথি মেরে মেরে তাদের গাড়িতে তোলে। ‘নিচা হো যাও, নিচা হো যাও’ অর্ডারটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিন স্টার্ট হয়ে যায়। গাড়িটা যে একটা ট্রাক এবং এর খোলা পিঠে ওরা যে উবু হয়ে বসে আছে, তা বুঝতে পারে গায়ের ওপর ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়লে। মরিয়মের কানের কাছে টুকির মতো একজনের মুখ, ‘এ দি খোলা টেরাক! শরমে বাঁচিনে, রাস্তার মানুষ আমাগের দেইখ্যে ফেইল্লো, ছি!’
ট্রাক যাচ্ছে উঁচু-নিচু এবড়োখেবড়ো পথ ধরে। অনেকক্ষণ শুধু ইঞ্জিনের ঘর্গর আওয়াজ। একসময় তা ছাপিয়ে জনতার হর্ষধ্বনি ভেসে আসে। এরা কারা–এই যুদ্ধের দিনে উল্লাস করে? মরিয়ম হাত দিয়ে মুখ ঢাকে। অন্তর্বাস পরা শরীরটা ট্রাকের এক কোনায় লেপ্টে থাকে মার-খাওয়া জন্তুর মতো। আর সে অন্ধ চোখে দেখে-মহুয়া সিনেমা হলের সামনে দিয়ে অন্তর্বাস পরা অবস্থায় খোলা ট্রাকে তাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেদিনের সিনেমা হলের দর্শকদের একজন জসিমুল হক। মরিয়মের প্রথম প্রেমিক, যার সঙ্গে সিনেমা দেখতে গিয়ে তিন দিনের মধ্যে প্রণয় এবং বিচ্ছেদ। সে হয়তো হল-ভাঙা দর্শকদের সঙ্গে বিশাল হোর্ডিংয়ের নিচে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুকছিল, ট্রাক ভর্তি ন্যাংটা মেয়ে দেখে সিটি বাজিয়েছে। এমন দৃশ্য তো ব্ল্যাকে টিকিট কেটে ‘কেবলমাত্র প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ইংরেজি মুভিতেও সচরাচর দেখা যায় না। ওই সময়ের কথা মনে পড়তে মরিয়মের কপালে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম ফোটে। লজ্জায় মাথাটা নুয়ে পড়ে। আর দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় পায়ের আঙুলের চিপায়। যুদ্ধের দিনে সিনেমা হলে তো কারোর যাওয়ার কথা নয়। ভাবনাটা যেন আকাশ থেকে হঠাৎ উড়ে পড়ল। মরিয়ম মাথা তুলে মুক্তির দিকে সরাসরি তাকায়, তা না হলে, সামনে মৃত্যু না কী–কিছুই তো জানতাম না তখন, তা আসলো কোত্থেকে!’ তারপর তাদের লজ্জা নিবারণের জন্যই বোধ হয় বৃষ্টিটা আরো জোরে তেড়ে আসে। সে এমন মুষলধারে বৃষ্টি, যেন দুনিয়া ভাসিয়ে নেবে। গাড়িটা ব্রেক কষে থেমে যায়। লোকগুলো নেমে তাদের দিকে ছুঁড়ে দেয় বিশাল বিশাল বাদুড়ের ডানার মতো ত্রিপল। আসলে চোখ বাঁধা থাকায় এমন মনে হইছিল,’ মরিয়ম মৃদু হেসে বলে। তারা প্রত্যেকেই ভেবেছিল, যার যার বাড়ির কাছ দিয়ে ট্রাকে করে যাচ্ছে। যারা শিস দিচ্ছে বা তালি বাজাচ্ছে, তারা তাদের চেনা লোক, কারো কারো প্রাক্তন প্রেমিক। তবে তাদের সেদিনের এ চিন্ত টা ছিল অন্ধের যষ্টির মতো, যা দিয়ে তারা তাদের ভবিষৎকে ছুঁয়েছিল, যেখানে ক্রমে জমা হচ্ছিল আপন-পরনির্বিশেষে সকলের টিটকারি আর ধিক্কার। পরে শত শত ত্রিপল দিয়েও এ থেকে তাদের আড়াল করা যাবে না।
এ চলার যেন শেষ নেই। পথ নয় গোলকধাঁধা–সুন্দরীর জলার মতন। আর মন্টুও আছে সঙ্গে। চোখ-বাঁধা অবস্থায় ত্রিপলের নিচে বসে মেরির মনে হয়, যেন অনন্তকাল ধরে তারা ভাই-বোন নিজেদের বাড়ি ফেরার পথ খুঁজছে। কিন্তু জলাভূমির গোলকধাঁধায় কিছুতেই পথের হদিশ পাচ্ছে না। মন্টুটা আগের মতোই বোকা–এই যুদ্ধের দিনেও। সুন্দরীর জলার রহস্য ভেদ করে যে কখনও প্রাপ্তবয়স্কে উত্তীর্ণ হবে না। শৈশবের প্রশ্নগুলোর মীমাংসা না হতেই এই কিশোরের জীবনে যুদ্ধ চলে আসে। যুদ্ধে যায় সে।
০৮. যোদ্ধা
‘কেয়া, ডর লাগতা হ্যায়?’
‘না স্যার, নেহি।’ বুক টান করে মেজর শর্মার প্রশ্নের জবাব দেয় মন্টু। মেজর এগিয়ে যান ফল ইন-এ দাঁড়ানো পরবর্তী যোদ্ধার দিকে। আজ তাদের প্রথম অপারেশনের দিন। শত্রুর দখলকৃত স্বদেশে তারা ঢুকবে এলএমজি, গ্রেনেড, রাইফেল হাতে। ছেলেদের চেকআপ শেষ করে মেজর এবার বক্তৃতা দিচ্ছেন। মন্টু বুক থেকে পুরো বাতাস বেরিয়ে যেতে দেয় না। প্রাণপণে ধরে রাখে। যাতে মি. শর্মা বক্তৃতা দিতে দিতে অনেকগুলো ছেলের মাঝখানে তার ফোলানো বুকটা দেখতে পান। আর এ কাজে মন্টুর অনেকখানি মনোযোগও ব্যয় হয়। মেজর যোদ্ধাদের তখন তাতাচ্ছেন। মন্টু বুকে দম আটকে মেজরের কথাগুলো মনে মনে মাতৃভাষায় উচ্চারণ করে-বাচ্চারা, মনে হিম্মত রাখো, সাহস রাখো। যুদ্ধ ছাড়া দেশ স্বাধীন করা যায় না। শত্রু তোমাদের জন্মভূমি নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। তোমাদের মানুষদের মারছে। কুকুর-বিড়ালের মতো। তোমাদের মা-বোনদের ইজ্জত লুঠ করছে।
মন্টুর পশমহীন মসৃণ বুকটাতে ভূমিকম্পের কাঁপন। অতি কষ্টের আটকে রাখা বায়ু বুক তোলপাড় করে গলায় ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে যায়। মার্চ মাসের পর এপ্রিল চলে গেছে, মেরিবুর খবর নেই। মা মাঝরাত্তিরে উঠে ঘর-বাহির করেন। বাড়িতে কান্নাকাটি নিষেধ। আব্বা সবকিছু ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ‘ঢাকায় এখন একটা কুত্তাবিলাইও নাই।’ শহর থেকে পালিয়ে আসা লোকদের কাছে এসব কথা শুনে গাঁয়ের মানুষ জানতে চায়, ‘মেরি কই? হে কি বাড়ি আইছে, না ঢাকায় রইছে?’ মা অনেক দিন ‘মেয়্যেটা আমার ছোডু ভাইয়ের বাসায়, দোয়া কইরেন গো, বড় আদরের মেয়ে আমার,’ বলে বলে চালিয়েছেন। তখন তারাও বলত ‘দোয়া করি মা গো, আল্লাহ্ যান সহি সালামতে রাহে আপনের মাইয়্যাডারে।’ গোলাম মোস্তফার সপরিবারে গায়ে আসার পর জারিজুরি ফাঁস হয়ে যায়। মায়েরও গায়ের লোকদের বলার মতো কিছু থাকে না, লুকিয়ে কান্নাকাটি করা ছাড়া। মেয়েটা চিরদিনের মতো হারিয়ে গেল–বড়। আদরের মেয়ে গো আমার।
