কে দেখল, কে দেখল না, মরিয়মের সেদিকে তখন খেয়াল নেই। সে তখন অনুভূতিশূন্য, চোখে অন্ধকার দেখছে। বাড়িতে মিলিটারি ঢুকে পড়লে চৌধুরীবাড়ির বউ-ঝিরা দেউড়িঘরের খিল তুলে দিয়ে কুলহু আল্লাহ সুরা বিড়বিড় করে পড়তে শুরু করে। বন্ধ ঘরে বাচ্চারা চিল্লাচ্ছে। মুখে কাপড় চাপা দিয়েও তাদের থামানো যাচ্ছে না। হিন্দুবাড়িতে মানুষ মেরে, জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খানেরা তখন উন্মাদ। তাদের এক লাথিতে দরজার পাল্লা দুটির কবজি খুলে যায়। ঘরে মেয়ে আর শিশু। পুরুষেরা পালিয়েছে। মেয়েদের বেরিয়ে আসতে বললে তারা চিৎকার-চেঁচামেচি করে ঘরের চিপায়-চাপায় লুকোয়। মিলিটারির ভাষা বোঝে না। বাচ্চাগুলো ততক্ষণে কান্নাকাটি বন্ধ করে দিয়েছে। মিলিটারির বন্দুকের বাড়ি খেয়ে আরেক দফা চিৎকার করতে করতে মেয়েরা যখন বেরিয়ে আসে, তখনো কয়েকজন জোরে জোরে কুলহু আল্লাহ সুরাটা পড়ছিল। মরিয়মের পরনে ছিল সালোয়ার-কামিজ আর সুতির ওড়না। ওড়নাটা দিয়ে সে মুখের ওপর লম্বা করে ঘোমটা টেনে দিয়েছিল। কিন্তু ঘর থেকে বেরোনোর সময় মেয়েদের ধাক্কাধাক্কিতে ঘোমটা খসে তার চাঁদপনা মুখটা বেরিয়ে পড়ে। সে দেখে উঠোনে পাঁচ-ছজন মিলিটারি। তারা ঠায় দাঁড়ানো, অপারেশনে নেই। হয়তো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অর্ডার করছিল। আবার ঘোমটা টানার আগে একজনের চোখ পড়ে মরিয়মের ওপর। লোকটা চিতাবাঘের মতো লাফ দেয়। তারপর যে কী হয়ে গেল। আমার, মরিয়ম বলে, ‘কিছু বুঝতে পারছিলাম না। অনুভব করতে পারছিলাম না। আর্মির হাতে ধরা পড়ে গেলাম! এরা কি আমাকে মেরে ফেলবে? শরীরে কোনো সেন্স ছিল না।’
এ অবস্থায় কীভাবে দুই ক্রোশ পথ পায়ে হেঁটে মল্লিকপুর সদরে এসেছে, মরিয়ম জানে না। অথচ গাঁও-গেরাম যখন, পথের বাঁকে বাঁকে নিশ্চয় মানুষের ঘরবাড়ি ছিল, দু-চারটা খাল-বিলও তাকে পেরোতে হয়েছে, খেত-খামারে তখন ছিল হাঁটুসমান পাটের গাছ, ধানের চারা–অথচ এসবের কিছুই সে দেখতে পায়নি। শহরের পিচের রাস্তায় ওঠার পর পায়ের তলায় গরম সেঁকা লাগতে প্রথম বোঝে যে, পায়ে স্যান্ডেল নেই। তখন সাঁড়াশির মতো তার বাহু খামচে ধরা কয়েকটা আঙুল চোখে পড়ে। ওপরে তাকাতে একজোড়া লালচে মোটা গোঁফ। সিঁড়ি ভেঙে যখন দোতলায় ওঠে তখনো মোচঅলাটা তার বাহু খামচে ধরেছিল। ঘরের ভেতর ফেলে দেওয়ার সময় হাতটা ছেড়ে দেয়। মরিয়ম উড়ে গিয়ে পড়ে ভাঙা বেঞ্চির ওপর।
: বেঞ্চি আসলো কোত্থেকে?
: এটা ছিল স্কুলঘর, আমাকে প্রথম যেখানে রেখেছিল।
: ঘরে ফ্যান ছিল?
: ছিল? না না ছিল না। নাকি ছিল? তখনকার সময়ে স্কুলঘরে ফ্যান চলত?
: প্লিজ, একটু মনে করার চেষ্টা করেন।
: না, মনে পড়ছে না। তবে ফ্যান না থাকলেও হুকটুক ছিল বোধ হয়। কেন?
: আপনার গায়ে কি ওড়না ছিল? সুতির ওড়নাটা?
: হ্যাঁ ওড়না ছিল।
: ওড়না ছিল?
: ছিল। কামিজ ছিল পরনে। ওড়না তো থাকবেই। তখন তো এরকম কামিজ ছিল না। আরেকটু টাইট আর খাটো মতন।
: খাবারের কথা কি মনে আছে? কী ধরনের খাবার খেতেন?
: ডাল দিত, ভাত দিত মনে হয়, কয়েক দিন গোশত দিছিল–এই এক-দুই পিস, ছোট ছোট।
: রুটি?
: হ্যাঁ হ্যাঁ রুটিই দিছে বেশি। তবে ইনফেকশন তো শরীরের এসব জায়গায়। জ্বর থাকত সব সময়। খাওয়ায় রুচি ছিল না।
: পানি খাওয়ার গ্লাসটাস দিছিল?
: মেয়েটা যে কী বলে, আবার পানির গ্লাস! স্কুলের জমাদার বড় একটা মাটির সানকি আর এক বদনি পানি দিয়ে যেত দু’দিন পরপর। সেই পানিতে খাওয়া চলত। পেসাব-পায়খানার পর পরিষ্কারের কাজও সেই পানিতে। ঘরে বাথরুম টাথরুম ছিল না। স্কুল ঘর তো। একদম পেছনে ছাত্রদের জন্য কয়েকটা টাট্টি–খাট্টা পায়খানা। কীভাবে যে দিন কাটাইছি! গোসল করতে পারিনি এক দিনও।
: গন্ধ লাগত না? নিজের শরীরের দুর্গন্ধ?
: লাগত। কাপড়চোপড়ে রক্ত, এর গন্ধ আছে না আলাদা একটা? পরিস্থিতি বাধ্য করেছে এভাবে থাকতে। উপায় নেই তো। এগুলো কি কাউকে বুঝায়ে বলা যায়? এর কোনো ভাষা আছে? কোন ভাষায় বলব?
: কিন্তু সত্যি সত্যি বলেন তো ঘরে ফ্যান ছিল কি না, ফ্যান না থাকলে সিলিংয়ে হুক ছিল কি না।
: হুকটুক থাকলেও থাকতে পারে। কে এত খেয়াল করেছে। নিজের জ্বালায় বাঁচিনে তখন।
: আশ্চর্য সিলিংয়ে হুক ছিল, গায়ে সুতির ওড়না ছিল!
: এতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে?
: এ পরিস্থিতিতে অনেক মেয়ে তো আত্মহত্যা করেছে তখন।
: অহ্! আমি কিন্তু আত্মহত্যার কথা ভাবতাম না। বাঁচার কথা ভাবতাম। আত্মহত্যা করার কথা ভেবেছি যুদ্ধের পর। আরেকটা কথা মনে পড়েছে–ঘরে একটা জানালা ছিল। এক পাশের পাট ভাঙা। তাই দিয়েই রমিজ শেখকে দৌড়ে আসতে দেখেছিলাম।
: তখন আপনার পরনে সালোয়ার-কামিজ আর ওই ওড়নাটা ছিল?
: না, ছিল না। টাইনে-টুইনে ছিঁড়ে ফেলাই দিছিল মিলিটারিরা। জমাদার বর্জ নেওয়ার সময় দলা পাকিয়ে সেই যে নিল, এগুলো আর ফেরত পেলাম না। তাই রমিজ শেখকে দৌড়ে আসতে দেখে প্রথম সরে গেছিলাম জানালার পাশ থেকে।
: আপনার পরনে তখন কিছু ছিল না?
: ছিল। ব্রেসিয়ার আর এক টুকরা ছিঁড়া ত্যানা।
মুক্তি হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। লম্বা-চওড়া সুতির ওড়নাটা বই-পুস্তকের লিখিত তথ্যের সঙ্গে কিছুতেই খাপ খাচ্ছিল না। বিশেষত যার ঘরে ফ্যান না থাকলেও গলায় ওড়না পেঁচিয়ে সিলিং থেকে ঝুলে পড়ার মতো হুক লাগানো ছিল, তার তো সতীত্ব খোয়ানোর পর আত্মহত্যা করার কথা। এ অবস্থায় স্কুলের জমাদার কাপড়চোপড় তুলে নিয়ে মরিয়মকে শুধু আত্মহত্যা করার দায় থেকেই রেহাই দেয়নি, মুক্তিকেও যারপরনাই স্বস্তি দিয়েছে। কিন্তু চৌধুরীবাড়ির কাজের মেয়ে টুকি আর যোগেন বাইন্যার বড় বেটি বিন্দুবালা-তাদের পরনে তখন কী ছিল? মরিয়মের দ্ব্যর্থবোধক জবাব, শাড়ি ছিল মনে হয়, গ্রামের মেয়েরা শাড়িই পরত তখন, সঙ্গে সায়া, ব্লাউজ। কাজের মেয়ে টুকির পরনে খালি একটা শাড়িই ছিল বোধ হয়। পরে মুক্তিকে এই একই কথা অন্যভাবে বলে টুকি, ‘আমারে ব্লাউজ-পেটিকোট কিনে দিব কিডা? একখান শাড়িই ছিল পরনে। ছাপা শাড়ি। খিদিরপুর হাট থিকা আব্বা কিনা দেছিল ঈদের সোমায়। আমার বয়স অইছে, এ পর্যন্ত আমি কইতে পারি না এক দিনও সালোয়ার-কামিজ পরছি কি না।’
