মে মাসের শেষ দিকে জনাব শামসুদ্দোহা ধরা পড়ার পর বেশ কিছুদিন রমিজ শেখের সঙ্গে মল্লিকপুর থানার লকআপে ছিলেন। এই অদ্ভুত মানুষটাকে কাছ থেকে দেখা তার। স্মৃতিকথায় তিনি প্রশ্নসমেত একটি জরুরি বিষয় উত্থাপন করেন, যা রমিজ শেখের পক্ষে যায়। শামসুদ্দোহা লিখেছেন, ‘মাত্রাতিরিক্ত টর্চারের ফলে রমিজ শেখের পাগল হয়ে যাওয়া অসম্ভব কিছু নয়। তা না হলে এক সাধারণ প্রজা নিজেকে নবাব সিরাজউদ্দৌলা ভাবতে যাবে কেন?’ এ ছাড়া সাক্ষাৎকারে মরিয়মও সবিস্তারে বর্ণনা করেছে, কীভাবে লোকটা আলেয়া-আলেয়া বলে চিৎকার করতে করতে সিপাহিদের বন্দুকের নল দু’হাতে সরিয়ে ওর দিকে দৌড়ে আসছিল। পাগল ছাড়া, মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী জেনে এরকম ছুটে আসার সাহস কোনো স্বাভাবিক মানুষের হবে?
পিঠে গুলি লাগার পর রমিজ শেখের দৌড়ানোর গতি হঠাৎ বেড়ে যায়। কারণ পায়ের দড়ি ছিঁড়ে যাওয়ায় তার দৌড়টা আর ঠ্যাং-বাঁধা মোরগের মতো থাকেনি, বাঘের তাড়া খাওয়া হরিণের লাফে রূপান্তরিত হয়। মরিয়ম মুক্তিকে বলে, লোকটি যেন মুখ থুবড়ে মাটিতে না পড়ার ধনুকভাঙা পণ করেছিল। প্লেন ওড়ার আগে যেমন ধীরে ধীরে স্পিড তুলে রানওয়েতে দৌড়ায়, সে খানিকক্ষণ তা-ই করল স্কুলমাঠের চারদিকে। শেষ সময়টায় তার পা দুটি মাটি ছোঁয়নি। মুখেও প্লেনের ইঞ্জিনের গোঁ-গোঁ আওয়াজ। মরার আগে লোকটা পাকিস্তানি সৈন্যদের খুব শাসিয়ে গিয়েছিল। তবে তখন সে কী বলছিল, মরিয়ম শুনতে পায়নি। কারণ অনেকগুলো বন্দুকের নল একসঙ্গে গর্জে উঠলে কানে তালা লাগার উপক্রম হয় আর মাঠটা ঘন কালো ধোঁয়ায় ভরে যায়। তাই রমিজ শেখের শেষযাত্রা উড়ে না দৌড়ে সমাপ্ত হয়েছে, মরিয়ম তা বলতে পারবে না।
ভয়ে, উৎকণ্ঠায় মরিয়মের তখন হিস্টিরিয়া রোগীর অবস্থা। সাক্ষাৎকারে সে মুক্তিকে বলে, ওর দিকে লোকটার দৌড়ে আসাটাই বিচলিত করে বেশি। শুধু ব্রেসিয়ার আর এক চিলতে ত্যানা পরনে থাকায়, জানালার পাশ থেকে সে প্রথম সরে এলেও পরে বিষয়টা তার মনে থাকেনি। কারণ তখন পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ, কল্পনাতীত। ‘ত্যানা পরায়ে রাখল বা ধর্ষণ করল,’ মরিয়ম মুক্তিকে বলে, ‘তা শুধু না। প্রত্যেকটা বুটের লাথি, বেয়নেটের খোঁচা কি সিগারেটের ছ্যাকা–আমার কাছে সমান ভয়াবহ। একটাও নরমাল না। একটার থেকে আরেকটা কম না। মিলিটারি দিনে-রাতে ক’বার ধর্ষণ করেছে, লোকে খালি এর হিসাব জানতে চায়। অন্য সব নির্যাতন তারা নির্যাতন মনে করে না।’
রমিজ শেখের মৃত্যুতে মরিয়ম শোকার্ত হয়েছিল যুদ্ধের বহু বছর পর। যখন সে বুঝতে পারে, তার শত্রু-লাঞ্ছিত দেহটা স্বাধীন বাংলাদেশের পুরুষেরা একইভাবে ব্যবহার করবে, কোনোদিন তারা তাকে আপন ভাববে না, তখন এই ভেবে সে সান্ত্বনা পেত যে, পৃথিবীতে অন্তত একজন পুরুষ তার দিকে ছুটে আসতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। তখন রমিজ শেখের এই অদৃশ্য ভূমিকার কথা মরিয়মের বোঝার কথা নয়। তারা দুজনই তখন বন্দি। কেউ কারো উপকারেই লাগছে না।
‘আমার ভাগ্যটাই খারাপ,’ মরিয়ম বলে। তা না হলে নিজের বাড়ি যেখান থেকে মাত্র এক দিনের পথ, এমন এক গায়ে সে ধরা পড়ে! দূরত্বটা নির্ণয় করা হয়েছিল ফুপু সাহার বানুর শ্বশুরবাড়ি যাওয়া-আসার সময় হিসাব করে। যুদ্ধের তিরিশ বছর আগে সাহার বানুর বিয়ে হয় নতুনগাওয়ের পার্শ্ববর্তী গ্রাম রাধানগর। তখন ইংরেজ আমল। পথে-ঘাটে ডাকাতের উপদ্রব। তাই কফিলউদ্দিনের মরহুম আব্বাজান সলিমুদ্দিন সূর্য ওঠার আগে পরিচিত বেহারার পালকিতে মেয়েকে উঠিয়ে দিতেন। ‘উঁহুম না উঁহুম না’ করে তারা মুন্সিবাড়ির দরজায় পৌঁছে যেত বাদ-আসর, সূর্য যখন পশ্চিমাকাশে ডুবো ডুবো করছে। বেহারারা হাঁটে না, দৌড়ায়। সেই হিসেবে পায়ে হেঁটে মরিয়মের বাড়ি পৌঁছাতে বড়জোর রাত দশটা বাজবে। ছয় পাহারাদারসহ রমিজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার পরদিন সে রওনাও করেছিল। কিন্তু যুদ্ধের দিন, পথঘাট নিরাপদ নয়, একা একজন মেয়ের বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা করাটা নতুনগাঁওয়ের মুরুব্বিরা অনুমোদন করেননি। তখন মিলিটারির গাড়ি পাগলের মতো পাকা সড়কে ছুটোছুটি করছে। পুলের গোড়ায় রাজাকার, মুজাহিদদের প্রহরা। গ্রামে গ্রামে চেকপোস্ট। অবস্থার উন্নতির জন্য মুরুব্বিরা তাকে আরো কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে বলে নিখোঁজ গ্রামবাসীর জন্য সাফা খতম পড়াতে মসজিদে চলে যায়। দ্বিতীয় দিনে ছয় ছয়টা লাশ-মৃত পাহারাদারদের। বাড়ি বাড়ি কারবালার মাতম। তারপর তো লাশ দাফন কাফন করতে-না-করতে গায়ে মিলিটারি চলে আসে।
‘মেয়েটা যেন ডাইক্যে আইনলো খান সেনাদের,’ জৈতুন বিবি বললেন। কারণ যুদ্ধ তখন তিন মাসে পড়েছে। মিলিটারিরা ধারেকাছের গ্রাম-বন্দর তছনছ করলেও নতুনগাঁওয়ে তখনো তাদের আঁচড় পড়েনি। মরিয়ম আসতে-না-আসতে একটার পর একটা অঘটন ঘটতে শুরু করে। অথচ চৌধুরীবাড়িতে শহরের একটা মেয়ে এসেছে শুনে, যুদ্ধের ডামাঢোলেও জৈতুন বিবি সেই রাতেই খাল পেরিয়ে তাকে দেখতে যান। শহরের মেয়ে হলে কী, দেখতে-শুনতে কেমন নরম-শরম। চাঁদপানা মুখ। কথাও বলে আস্তেধীরে। তিনি মেয়েটার মান-ইজ্জত যেন ঠিক থাকে, খানেদের হাতে যেন নষ্ট না হয়, এর জন্য দোয়া পড়তে পড়তে সেদিন বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন। তারপর তো বিপদ এসে পড়ল তার নিজের ওপর। ছয় পাহারাদারের একজন ছিল জৈতুন বিবির সতিনের বড় ছেলে। কোলে-পিঠে করে ছেলেটাকে তিনি মানুষ করেছেন। ছেলেটা কবরে যাওয়ার সময় তার শরীরের অর্ধেকটা যেন সঙ্গে নিয়ে গেল। তাই খানেরা আসছে শুনেও জৈতুন বিবি আর তার সতিন বাড়ি ছেড়ে নড়েননি। ঘরের পেছনের করমচার ঝোঁপের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিলেন। খানেরা তখন ডিস্ট্রিক বোর্ডের রাস্তা দিয়ে পঙ্গপালের মতো ধেয়ে আসছে। এই তাদের দেখা গেল দর্জিবাড়ির কাছে, চোখের পলকে হিন্দুপাড়ার বড় বড় পানের বরজ, ফলবাগান আর বাঁশঝাড়ের ভেতর। তখন তাদের কালো কালো পাছা ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছিল না। তারপর দাউদাউ আগুন জ্বলে উঠল। তারা পেট্রোল ঢেলে হিন্দুদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছিল। হিন্দুবাড়ি যাওয়ার পথে হানাদাররা লুটপাট করার জন্য গাঁয়ের লোকদের ঘর-বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। জৈতুন বিবি আর তার সতিন করমচার ঝোঁপের আড়ালে থেকে লুটের মালসামান নিয়ে লোকজনের ছোটাছুটি দেখেছেন। তারপরই পটপট করে কয়েকটা গুলির শব্দ। সেদিন মঠের পেছনের জঙ্গল থেকে ধরে এনে বলাই সাধুকে দুজন শিষ্যসহ পাকসেনারা এক কাতারে দাঁড় করিয়ে গুলি করে। বলাই সাধু অবস্থা বেগতিক দেখে শিষ্যসমেত পালাতে চেয়েছিলেন। অথচ ভারতে চলে যাওয়ার সময় ভাই-ভাতিজারা তাকে সঙ্গে নিতে চাইলে এক গাল হেসে বলেছিলেন, তোরা যেতি চাচ্ছিস-যা, আমারে নিয়ে অযথা টানাহেঁচড়া করছিস কেন? আমি একেশ্বরে বিশ্বাসী, খানেরা আমারে মারবে না। তারপর পাকসেনারা গায়ের ভেতর বেশিক্ষণ থাকেনি। দিনদুপুরে মানুষ মেরে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে খানিক বাদে একই পথ দিয়ে ফিরে যায়। যাওয়ার সময়, করমচার ঝোঁপ থেকেই জৈতুন বিবি দেখেছেন, চৌধুরীবাড়ির কাজের মেয়ে টুকি, যোগেন বাইন্যার বড় বেটি বিন্দুবালাসহ মরিয়মকে ডিস্ট্রিক বোর্ডের রাস্তা দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে।
