নবাব কুটিরে পিনপতন নিস্তব্ধতা। এদিকে সাক্ষাৎকারের সময় উত্তীর্ণ। যখন সেলের দরজা খুলে দুজন সিপাহি নবাবকে মেজরের দরবারে নিতে আসে, তখন মৃত পাহারাদাররা টুটাফাটা শরীর নিয়ে পড়িমরি পালায় ।
সেদিন রমিজ শেখের নবাবি ঘোর তখনো কাটেনি। এ অবস্থায় স্কুলমাঠ পর্যন্ত সিপাহিদের সঙ্গে সঙ্গে যায় সে। তারপর হঠাৎ করেই ‘আলেয়া আলেয়া’ বলে দোতলা স্কুল বাড়িটার দিকে দৌড়াতে থাকে। যাকে সে প্রাণপণ দৌড় ভাবে, দোতলার জানালা দিয়ে মরিয়মের সেটা ঠ্যাং-বাঁধা মোরগের ছোট ছোট লাফঝাঁপ মনে হয়। রমিজ শেখকে হঠাৎ করে দেখতে পাওয়া, তার আলেয়া আলেয়া চিৎকার, ঠ্যাং-বাঁধা মোরগের মতো লম্ফঝম্প–এসব কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। মরিয়মের তখন মাথা ঠিক ছিল না। আহাম্মকটাকে এক্ষুনি থামানো দরকার, তা না হলে গুলি খেয়ে মরবে। কিন্তু বাইরে থেকে ঘরটা ছিল তালাবন্ধ। এ ছাড়া যে বিষয়টি হঠাৎ তার মাথায় আসে, সেটি হলো এক চিলতে অন্তর্বাস ছাড়া তার পরনে কোনো বস্ত্র নেই। এদিকে দৌড়াতে দৌড়াতে রমিজ শেখ পিঠে একটা ধাক্কা অনুভব করে, সেই সাথে সুচ ফোঁটার মতো চিনচিনে যন্ত্রণা। ব্যথাটা তীব্র নয়, তবে শক্তি ধরে অসম্ভব। সেকেন্ডের মধ্যে নবাবের খোলস ভেঙে আগের পরিচয়ে ফিরে যায় রমিজ শেখ। সেখানে সে একজন সামান্য প্রজা, বউ খুন করার দায়ে যার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল এবং ডামাডোলের ভেতর যে দশ বছরের মাথায় জেল থেকে পালিয়ে এসেছে। রমিজ শেখ এক হাত দূরে বিয়ের সাজ করা বউকে পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। চেঁচিয়ে সরে যেতে বললেও মেয়েটি পুরোপুরি সরে না। ঘাতক স্বামীর মাঝখানে এক হাতের মতো ব্যবধান রেখে সে নিজেও দৌড়ায়। তবে আগের মতো তাদের পথটা মসৃণ আর সোজা থাকে না। তা মোড় নেয় হেড স্যারের রুমের পাশ দিয়ে, দোতলা স্কুলবাড়ি ছাড়িয়ে, পাকিস্তানি পতাকা আর কৃষ্ণচূড়াগাছ নিচে ফেলে ওপরের দিকে–শূন্যে।
০৭. অন্তর্বাস, শাড়ি ও সতীত্ব
ঘটনাটা একটা ক্লুয়ের কাজ করে, যুদ্ধের আটাশ বছর পর। পাকিস্তানি মিলিটারি ক্যাম্পে মরিয়মের পরনে যে শুধু অন্তর্বাস ছিল, আর কোনো বস্ত্র ছিল না, তা মুক্তির জন্য একটা জরুরি তথ্য। কারণ সে এ প্রথম বীরাঙ্গনাদের সঙ্গে মরিয়মের সামান্য হলেও একটা মিল খুঁজে পেয়েছে। যা তার রিপোর্টিকে বিশ্বাসযোগ্য করতে সাহায্য করবে। ‘৭১ সালে পাকসেনারা বন্দি নারীদের গা থেকে শাড়ি ছিনিয়ে নিয়ে লুঙ্গি বা ত্যানা পরিয়ে দিয়েছিল–আর্মির এ আচরণেরও নানান ব্যাখ্যা আছে। যেমন নতুনগাঁওয়ের জৈতুন বিবি মুক্তিকে বলেন, ‘যিখান থিকে পাকসেনারা এয়েছিল, অইভেনের বিডিরা শুইনছি শাড়ি পরত না, মুসলমানি লম্বা কুর্তা গরে দিত। শাড়ি হচ্ছে গে হিন্দুর পোশাক।’ কলেজছাত্র শাহরুকের বক্তব্য হচ্ছে ‘শাড়ি হচ্ছে বাঙালি রমণীকুলের ভূষণ। বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য। ওইদিকে পাকিদের ছিল চরম বাঙালিবিদ্বেষ। তারা বাঙালি নারীর বসন-ভূষণ-শাড়ি-ফাড়ি আর বাংলাদেশের পতাকা একসাথ করে পুইড়ে দেছিল যুদ্ধের বছর। আরেকটা কারণ, যা নানান জনের লেখাপত্রে রয়েছে, তা হলো, কিছু মেয়ে সতীত্ব হারানোর পর সেনানিবাস, সেনাক্যাম্পে শাড়ির ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে। সৈন্যরা তাই পরনের শাড়ি খুলে নিয়ে তাদের আত্মহত্যার অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিল। এসব সত্য-মিথ্যা। যা-ই হোক, শেষ পর্যন্ত বিষয়টি বাঙালির লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শাড়ি এবং সতীত্ব-হাজার বছরের বাঙালি ঐতিহ্যের যে ধারা, যা নারীর মাধ্যমে বাহিত এবং লালিত হয়ে আসছিল, যুদ্ধের বছর এ দুটিকে একসঙ্গে খোয়াতে হয়। জাতিগতভাবে বীরাঙ্গনা বিসর্জনের অন্যতম কারণ হিসেবে মুক্তি রিপোর্টিতে তা সংক্ষেপে উল্লেখ করে।
তারপর মরিয়মের কাহিনি বেশ খানিকটা জটিলতাবর্জিত, ঝরঝরে। আর দশটা বীরাঙ্গনার থেকে কোনোভাবে পৃথক করা যায় না। এ ছাড়া রমিজ শেখের আগমনের পর গোটা কাহিনিটা যেমন লেজে-গোবরে হয়ে উঠেছিল, তারও সমাপ্তি ঘটে এই পর্বে। ভাগ্য ভালো যে, লোকটা পাকিস্তানি সৈন্যের গুলিতে মরেছে, মুক্তিযোদ্ধারা তাকে মারেনি। এর ব্যত্যয় হলে, মুক্তি বুঝতে পারে না, সে কীভাবে এর ব্যাখ্যা দিত। যুদ্ধের তিন মাসের মাথায় যে জয় বাংলা আর পাকিস্তান জিন্দাবাদ শ্লোগান দুটির মর্ম আলাদা করে উপলব্ধি করতে পারেনি, তার মৃত্যুর সম্ভাবনা ছিল পাকিস্তানি আর্মি এবং মুক্তিবাহিনীর হাতে ফিফটি-ফিফটি। তারপর তো মোহাম্মদ শামসুদ্দোহা নামে একজনের একাত্তরের স্মৃতিকথা পড়ে জানা গেল যে, রমিজ শেখ মৃত্যুর আগে দেশপ্রেমিক বনে গিয়েছিল, যদিও মস্তিষ্ক বিকৃতির কারণে। পুল ভাঙতে গিয়ে স্টেনগানসহ জনাব শামসুদ্দোহা ধরা পড়েন রাজাকারদের হাতে। রাজাকার কমান্ডার অস্ত্রটা হাতিয়ে তাকে মার্শাল ল কোর্টে প্রডিউস করে। শামসুদ্দোহা বাঙালি হলেও একজন মোহাজের, সাতচল্লিশের দেশভাগের পর ভারত থেকে পূর্ব পাকিস্তানে বাবা মার সঙ্গে পালিয়ে আসেন। তারপর থেকে উক্ত রাজাকার কমান্ডারের পরিবার তাদের পেছনে লেগে আছে। ‘ইয়ে লোক হামকো ফাস আয়াথা জমিজমা লেনেকে লিয়ে স্যার’-–এরকম এক সাজানো কাহিনি বারংবার উর্দুতে বয়ান করে, তিনি মার্শাল ল কোর্ট, এফআইও (ফিল্ড ইনটেলিজেন্স অফিস), এমপির (মিলিটারি পুলিশ) মতো সব কটি মৃত্যুফাঁদ উতরে অক্টোবর মাসে জেলখানায় গিয়ে পড়েন। সেখান থেকে মুক্তিযযাদ্ধারা জেলের তালা ভেঙে দিলে বেরিয়ে আসেন ৭ ডিসেম্বর ১৯৭১।
