মেজর সাব যে যুদ্ধে জয়লাভ করে ফিরেছেন, গরাদে থেকে রমিজ শেখ তা টের পায়। সামনের চাতালটায় হাঁস-মুরগির কটর-কটর, গরুর ডাক, ছাগলের চিৎকারে। নরক গুলজার। অন্ধকারে ঝনঝন তালা খুলতেই জনা পাঁচেক লোক তার গায়ের ওপর উড়ে পড়ে। পড়েই হড়হড় করে বমি। রক্তে না বমিতে কয়েদখানা ভেসে যাচ্ছে, আলোর অভাবে তা বোঝা যায় না। পুরুষলোকরা তো এখানে, হাঁস-মুরগিরও ডাক শোনা যাচ্ছে, মেয়েরা কোথায়? নতুনগাঁও আক্রান্ত হলে মরিয়মের ধরা না পড়ে উপায় নেই। কিন্তু বিষয়টা রমিজ শেখকে আগের মতো ভাবায় না। এখন সবাই ইয়া নাফসি ইয়া নাফসি করছে।
মাঝরাতে রক্ত আর দাস্তবমির মাঝখানে রমিজ শেখের ঘুম ভাঙে রান্না মাংসের সুঘ্রাণে। বিজয় উপলক্ষে ভোজ চলছে। বাতাসে ভাসতে ভাসতে গন্ধটা গরাদে ঢুকে। তার পেটে ধাক্কা দেয়। কীসের মাংস আহ্-এমন সুন্দর ঘ্রাণ! নতুনগাঁওয়ের চৌধুরী বাড়ির পাতলা খিচুড়ির পর দু’দিন দু’রাত পার হয়ে গেছে, পেটে দানাপানি কিছু পড়েনি। এই প্রথম তার খিদার উদ্রেগ হয় এবং মাংস খাওয়ার তীব্র বাসনা নিয়ে রমিজ শেখ বমি করতে শুরু করে।
পরদিন জেরা, আবারও প্রহসন। রমিজ শেখের যাওয়া-আসার পথে দৃশ্যপট ক্রমে পাল্টে যাচ্ছে। কয়েদখানা এখন থানার লকআপ ছাড়িয়ে অদূরের স্কুলঘর পর্যন্ত বিস্তৃত। যে ঘরে একসময় হেড মাস্টার বসতেন, মেজরের দরবার বসে সেখানে। কক্ষের কাঁচের আলমারি থেকে ছাত্রছাত্রীর পরীক্ষার খাতার বান্ডিল সরিয়ে আসামিদের অদৃশ্য ফাইলপত্র রাখা হয়েছে। দরবার চলাকালে মেজরের অর্ডার পেয়ে খাস নফর আলমারি খোলে বটে, তবে শূন্য তাক থেকে এক টুকরো কাগজও বের হয় না। আলমারি বন্ধ করে টেবিলে সে যা রাখে, তা-ও কিছু না। মেজর মিটিমিটি হাসেন। তার পেছনের দেয়ালে মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর গুরুগম্ভীর প্রতিকৃতি। ঘরের চালায় পাকিস্তানের চাঁদ-তারা খচিত পতাকা। আগে স্কুলমাঠের দক্ষিণ প্রান্তে কৃষ্ণচূড়াগাছের তলায় যে চারকোনা শহিদমিনারটি ছিল, এখন এর ভাঙা বেদিতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কালো আলখাল্লা পরে যে বসে থাকে, সে একজন কসাই। নাম নাঈমুদ্দিন। নাঈমুদ্দিন মানুষের গলাপ্রতি কুড়ি টাকা পায়। সে বেদি থেকে বারবার সিপাহিদের কাছে উঠে আসে তদবির করতে। যুদ্ধের আগে বেশি করে গরু ভাগে পাওয়ার জন্য হাটে আসা ব্যাপারীদের সঙ্গে ঠিক এই কাজটাই করত সে। একদিন দরবার গৃহে যাওয়ার সময় কসাই নাঈমুদ্দিন রমিজ শেখকে কাগজের বিড়ি ফুঁকতে দেয়। হাত বাঁধা থাকায় রক্তের কটু গন্ধময় কসাইয়ের আঙুলে ধরা বিড়িটা সে ঘনঘন টান দিয়ে শেষ করে। জায়গাটা ভারতীয় বাহিনীর দখলে যখন চলে আসে, নাঈমুদ্দিন কালো আলখাল্লা খুলে মুজিব কোটের তলায় বেশিক্ষণ গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে পারেনি। মুক্তিযোদ্ধারা তার এক পা চেপে ধরে, অন্য পা টান মেরে ফরফর করে ছিঁড়ে ফেলার আগে কসাই নাঈমুদ্দিন একটা বিড়ি প্রার্থনা করেছিল।
এখন একবার সোজা করে, পরের বার উল্টিয়ে ঝুলিয়ে প্রতিবার রমিজ শেখের মুখে একই জবানবন্দি শুনে মেজর অশেষ আনন্দ পান। ফাঁকে ফাঁকে নবরত্ন অপেরার সিরাজউদ্দৌলা পালাটাও বিনা টিকিটে দেখা হয়ে যায়। যুদ্ধের উৎসবহীন দিনে মেজরের জন্য এ উপরি পাওনা। তার হুকুমে রমিজ শেখ যখন নবাবের বন্দিত্বের অংশটা রোজ অভিনয় করে দেখায়, তখন নিজেকে তিনি ইংরেজ সেনাপতি ভেবে আঙুলের ডগায় মোচ মোচড়ান। এদিকে দেশপ্রেমিক নাগরিকদের তরফ থেকে রমিজ শেখের গায়ে যে উত্তম-মধ্যম পড়ে, সেসব অভিনয় নয়, সত্যিকারের।
দরবার গৃহে এভাবে অভিনয় করতে করতে রমিজ শেখ ক্রমে নবাব হয়ে ওঠে। দেশপ্রেমিক নবাব সিরাজউদ্দৌলা। শত্রু সৈন্য আর বিশ্বাসঘাতকদের যাবতীয় বিদ্রূপ, অত্যাচার-অবিচার অতিশয় মর্যাদার সঙ্গে সে গ্রহণ করে। নিজেকে সে ভাবে ভগবানগোলায় ধৃত নবাব সিরাজউদ্দৌলা, যাকে শত্রুরা মুর্শিদাবাদে বন্দি করে নিয়ে এসেছিল। যার কণ্টক আসন, ছিন্ন পাদুকা কোনোভাবে নবাবি মেজাজ থেকে টলাতে পারেনি। গভীর রাতে একদিক থেকে যখন মেয়েদের আর্তচিৎকার আর গোঙানির আওয়াজ আসে, আরেক দিকে নদীপাড়ে মৃতদেহের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে শিয়াল কুকুরে মারামারি চলে, তখন কয়েদখানায় বসে বন্দি নবাব আগামী দিনের যুদ্ধের ফন্দি আঁটেন। তার সঙ্গে যোগ দেয় ছয়জন মৃত পাহারাদার। নবাবের দীনহীন কুটিরের এক কোনায় ঘাপটি মেরে পড়ে থাকা রমিজ শেখকে তারা ঠিকই শনাক্ত করে। নবাব তাদের সাদরে গ্রহণ করেন। বসতে দেন বিষ্ঠা আর উচ্ছিষ্টের থালাবাটি সরিয়ে। তারা যেখানে গোল হয়ে বসে, সেদিকের দেয়ালে রক্তের অক্ষরে লেখা, ‘মা গো কেঁদো না, আমি তোমার খুদিরাম।’ লেখাটার দিকে তাকিয়ে পাহারাদারদের একজন বলে, ‘খুদিরামের সংখ্যা দিনকে দিন বেড়ে চলিছে।’ কথায় কথায় এলাকায় যে অসময়ে বন্যা শুরু হয়েছে সেই প্রসঙ্গ আসে। সিরাজউদ্দৌলা পালার মঞ্চস্থল এখন দশ হাত পানির নিচে। এ অবস্থায় গ্রাম পাহারা দিয়ে কোনো ফায়দা নেই। মুক্তিবাহিনীও এসে গেছে। তারা পাটখেতের চিপায় পজিশন নিয়ে বসে থাকে। কোনো দিন শিকার মেলে, কোনো দিন মেলে না। কলাগাছের ভেলায় চেপে তাদের খাবার দিয়ে আসে গ্রামের বউ-ঝিরা। ইঞ্জিনবোটের আওয়াজ কানে গেলেই মুক্তিরা ট্যাসট্যাস করে স্টেনগানের গুলি চালায়। গুলি শেষ হয়ে গেলে নৌকা নিয়ে পালিয়ে যায় গাঁয়ের পেছন দিক দিয়ে। পাকসেনারা আরেক দিক থেকে ঢুকে গাঁয়ের লোকদের মেরে-ধরে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে শেষ করে। ‘কিন্তু এ অবস্থা বেশিদিন চলতি দিয়া যায় না, নবাব!’ এ কথা বলে একজন প্রাক্তন পাহারাদার রমিজ শেখের ছিন্ন আঙুলসমেত করতল মুঠোয় তুলে নেয়। একে একে শূন্য জায়গাটায় সবাই হাত বোলায়, গভীর আবেগে চুম্বন করে। রমিজ শেখও তাদের বুলেট-ঝাঁঝরা বুকে-পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়। তারা তখন জানতে চায়, নবাব ফের কবে শত্রু শিবির আক্রমণ করবেন। কবে তারা ফিরতে পারবে জন্মভূমি বাংলায়। তাদের একজন আবার গোলাম হোসেনের মতো ললিত ভঙ্গিতে বলে, বাংলাকে ভালোবেসে বাংলার নবাবকে আমরা ভালোবেসে ফেলেছি। রমিজ শেখ শেকলবদ্ধ টলোমলো পায়ে উঠে দাঁড়ায়। ঝনঝন শব্দে বাজনা বেজে ওঠে। নবাব আবেগাপ্লুত, কম্পিত কণ্ঠে বলেন, ‘গোলাম হোসেন, বাংলাকে তোমাদের মতো আমি তো ভালোবাসিনি। তবু আজ নিজের সব দুঃখ-দুর্দশা ছাপিয়ে, বাংলার কথাই বারবার মনে পড়ে কেন?’
