শত্রুশিবিরে রমিজ শেখের অ্যাপায়নটা হয় কল্পনাতীত। প্রথম তাকে ভোলাই দেয় দেশি বিশ্বাসঘাতক মিরজাফরের চ্যালাচামুণ্ডারা। যে যেভাবে পারে–ডান্ডা ডান্ডা সই, লাখি লাথি সই, ঘুষি ঘুষি সই। তারপর তাকে আধমরা করে, হাত-পা বাঁধা অবস্থায় গরাদের ভেতর ফেলে রেখে যে যার মতো চলে যায়। বাকি রাত কীভাবে কেটেছে, রমিজ শেখ বলতে পারবে না। শুধু মাঝেসাজে হুশ ফিরলে নতুনগাওয়ের কিশোর বালকের দুটি বড় বড় চোখ অন্ধকারে সে জ্বলতে দেখে। ক্ষোভে না বিস্ময়ে, তা বোঝা যায় না। সকালবেলায় সুদূর অতীতকাল থেকে ভেসে আসে নকিবের চোঙা ফোকার দীর্ঘ লয়ের আওয়াজ, ‘নবাব মনসুর-উল-মুলক সিরাজ-উ-দ্দৌলা শাহ্কুলি খাঁ মির্জা মুহাম্মদ হায়বতজঙ্গ বা-হা-দু-র-হা-জি-র।’ ঝনঝন শব্দে গরাদের দরজা খুলে গেলে রমিজ শেখ বুঝতে পারে, তার দরবারে যাওয়ার সময় হয়েছে। তাকে হাতে ধরে খাড়া করায় দুজন লোক। তারপর ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যায় একটি লম্বামতন ঘরের বারান্দায়। সেখানে পাঠান হাবিলদারের পাশে একজন রাজাকার বসা। রাজাকারটা তার মোচ ধরে টান মেরে একপাশ থেকে তুলে ফেলে। রমিজ শেখ অপারগ। হাত দুটি পিছমোড়া থাকায় নবরত্ন অপেরায় নটের মতো সেটি স্বস্থানে বসাতে পারে না। মুখ খোলা থাকা সত্ত্বেও জিহ্বায় শক্তি নেই যে, এমন চরম মুহূর্তে যথাযথ ডায়লগ দেবে।
ঘরের ভেতর দরবার বসেছে। এক ধোপদুরস্ত মেজর বিচারক। কোথা থেকে ভাঙা ট্রাংক টানতে টানতে সভাস্থলে হাজির হয় একজন। তার পেছনে আসে আরো কয়েকজন। এরা বাদী। রমিজ শেখ বিবাদী। এ নিয়ে দু’বার তার বিরুদ্ধে এজলাস বসল। প্রথমবার সে ছিল খুনি, এবার মনে হয় খুন হতে যাচ্ছে। তাকে দেখিয়ে বাদী একজন বলে, ‘এই লোক হুজুর, আমার চাচা লাল মোহাম্মদরে মার্ডার করছে।’ তারপর ভাঙা ট্রাংক হাট করে বিচারকের সামনে সে মেলে ধরে, ‘এই দ্যাখেন আমার বাড়ি লুট করছে হুজুর, এই লোক।’ পরের জন চিৎকার দিয়ে মেজরের পা জড়িয়ে ধরে, ‘মার্চ মাসের পয়লা তারিখে আমার পেটের এইখানে চাকু মারছে হুজুর, এই লোক। আপনে এর বিচার কইরেন। নাড়িভুড়ি বেরই গেছিলো আমার। ভাইগ্যক্রমে বাইচে গেছি।’ তৃতীয় ব্যক্তি মওলানা তোফাজ্জেল। ‘এই লোক স্যার আমার বন্দুক কেড়ে নেছে’ বলেই মওলানা তার গালে এমন কষে চড় মারে যে, তার আলগা হয়ে যাওয়া মোচটা উড়ে গিয়ে মেজর সাহেবের কোলে পড়ে। তিনি তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে ওঠেন, ‘তুম লোগ ভাগো ইয়াসে, ইসে ম্যায় সামালুঙ্গা।’
এবার শুরু হয় আসল জেরা। মৃত পাহারাদার ছয়জন নবাব সিরাজউদ্দৌলার ফৌজ ছিল বলাতে মেজর সাব তার খাস নফরকে হাত দিয়ে ইশারা করেন। লোকটা রমিজ শেখকে প্রথম চেয়ারে বসায়, পরে পা দুটি বেঁধে সিলিংয়ের আড়ায় ঝুলিয়ে দেয়। সোজা এবং উল্টো অবস্থায় সে যখন একই কথা বলে, তখন মেজর খাস নফরকে অর্ডার দেন, ‘লে যাও উসকো, বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা কা নওয়াবকো আচ্ছা তারাসে বানা দো।’ ঘরের চৌকাঠে পা দিয়েই নফর যখন তাকে বানাতে উদ্যত, তখন পেছনে থেকে মৃদুস্বরে অর্ডার আসে, কাল ফির লে আনা।
মেজরের রুম থেকে হাজতে ফিরে ছোট ছেলেটিকে রমিজ শেখ দেখতে পায় না। দেয়ালে রক্ত দিয়ে লেখা, ‘মাগো কেঁদো না, আমি তোমার খুদিরাম। তাকে সেন্ট্রি জানায়, মাসুম বাচ্চা বাংলাদেশ মে চলা গিয়া। মগর তুম নেহি মানগে, তুম নওয়াব হ্যায় তো কেয়া, তুমহারা হালত অ্যাইসা হোগা।’
পরদিন ফের দরবার বসেছে। জেরা শুরু হবে, তখন ফোন বেজে ওঠে। রিসিভার তুলে মেজর চিৎকার করে ওঠেন, ‘ঘুরলিয়ে! সকাল সকাল ঘুরুলিয়া, নতুনগাঁও, দাউদনগর, খিদিরপুরে মুক্তিবাহিনীর ফাইট স্টার্ট হয়ে গেছে। পেছনের দেয়ালে মানচিত্র। মেজর তা টেবিলে নামিয়ে নাকে চশমা ঝুলিয়ে দেখেন, কোথায় নতুনগাঁও, কোথায় দাউদনগর, কোথায় খিদিরপুর আর কোথায় ঘুরুলিয়া। মানচিত্র দেখা শেষ হয়েছে কি হয়নি, এর মধ্যে ফিফটি সিসি মোটরসাইকেল চালিয়ে হুড়মুড় করে হাজির হয় শান্তি কমিটির জেলা সভাপতি। স্যার, স্যার, অ্যাটাক হো গিয়া, অ্যাটাক হো গিয়া।’ রমিজ শেখ লোকটাকে চেনে না, দেখেওনি কোনো দিন। তবে ভাবভঙ্গিতে বোঝে যে, সে বিশ্বাসঘাতক মিরজাফরের লোক, বর্তমানে দেশপ্রেমিক নাগরিক, বিদেশি শত্রুকে যুদ্ধের খবর জানাতে ছুটে এসেছে। শুয়ার কা বাচ্চা! মেজর সাব পিস্তল উঁচিয়ে তেড়ে যান শান্তি কমিটির জেলা সভাপতির দিকে, ‘তুম কিউ চিল্লায়া থা? সারা পাবলিক কো মালুম হো গিয়া। তুমকো গোলি কর দেগা।’
ওই লোক তো নাকের ডগায় পিস্তল দেখে সঙ্গে সঙ্গে চুপ। রমিজ শেখের অবাক লাগে–এই যদি হয় দেশপ্রেমিকদের অবস্থা, কীসের আশায় তারা মিরজাফরি করছে? সিংহাসনে তো বসতে পারবে না! রমিজ শেখ যা মার খেয়েছে, তার সিংহভাগ এ লোকগুলোর হাতে। এদিকে মেজর তাড়াতাড়ি স্কোয়াড রেডি করে ফেলেছেন। তিনি সমরনায়ক। দেশপ্রেমিক নাগরিক পথপ্রদর্শক। মিলিটারিরা লাফিয়ে লাফিয়ে গাড়িতে উঠছে। রমিজ শেখ উঠতে গেলে বসার চেয়ারটাও তার সঙ্গে সঙ্গে উঠে আসে। তার হাত দুটি চেয়ারের হাতলের সঙ্গে পাটের দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা। এ অবস্থায় সে দরজার কাছাকাছি চেয়ারসহ হেঁটে চলে আসে। মেজর গাড়িতে স্টার্ট রেখে খাস নফরকে কাছে ডাকেন, এই বাইনচোত কো কাল ফির লে আনা।’ এরপর চলে গেলেন রণক্ষেত্রে।
