কিন্তু সেই সুযোগ মনে হয়, রমিজ শেখের জীবনে আর আসবে না।
নবাব সিরাজউদ্দৌলা পালা দ্রুত পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছে। ছয়জন নটের অবস্থা সঙ্গিন। পলাশীর যুদ্ধে নবাবের বাহিনী হেরে গেছে, মিরজাফর ক্লাইভের শিবিরে। লুকোছাপার পর্ব শেষ। সবকিছু দিনের আলোর মতো স্পষ্ট–শত্রু-মিত্র চিনতে কারো অসুবিধা হচ্ছে না। ইংরেজ বাহিনী দ্রুত এগিয়ে আসছে নবাবকে বন্দি করতে। তার সর্বক্ষণের সহচর এখন গোলাম হোসেন। সে নবাবকে ছেড়ে যায়নি। আরেকজনও যায়নি–সে আলেয়া। পাহারাদারদের মধ্যে কোনো নারী না থাকায়, চরিত্রটি আগাগোড়া উহ্যই রেখেছে। নবাব মুখে যতই বলুক, ‘উপায় নেই গোলাম হোসেন, উপায় নেই,’ আসলে গোলাম হোসেনই এখন তার একমাত্র বল-ভরসা। তা নবাবও জানেন। গোলাম হোসেন সিরাজউদ্দৌলাকে তাড়া দিচ্ছে রাজধানীতে ফিরে গিয়ে দ্রুত সৈন্যসামন্ত জোগাড় করে পুনরায় যুদ্ধ করতে। ভগ্নহৃদয় নবাব। মুখে যদিও কথার খই ফুটছে, চলাফেরার শক্তি রহিত। গোলাম হোসেন গোঁয়ারের হদ্দ, নবাবকে কৌশলে তাতাচ্ছে—’জাহাপনা, আমরা আবার যুদ্ধ করব। আবার সৈন্য সংগ্রহ করব। এক জন্মে না পারি, জন্ম-জন্মান্তরের সাধনা দিয়ে বাংলা, বাঙালির এই লজ্জা দূর করব।’ এদিকে নবাবও হুঁশের পাগল–চিবিয়ে চিবিয়ে বলছেন, ‘কিন্তু মিরজাফর, জগৎ শেঠ, রাজবল্লভ, রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফ, উমিচাঁদের দল কি আর জন্মগ্রহণ করবে না গোলাম হোসেন?’
তাহলে উপায়? ছয়জনের বিভ্রান্ত দৃষ্টি পড়ে রমিজ শেখের ওপর। এক পলকে অনেকগুলো বছর দৌড়ে পিছিয়ে যায়। মিরজাফর, জগৎ শেঠরা যুগে যুগে জন্মায় এই বাংলায়, দেশটাকে শত্রুর পদানত করে রাখতে। এই তো সামনে–নবজাতক বিশ্বাসঘাতক। তাদের ঝাড়েবংশে শেষ করতে না পারলে বাঙালির মুক্তি নেই। পাহারাদাররা দ্রুত রমিজ শেখের দিকে এগিয়ে যায়। দুই শ’ বছর আগেকার বাংলা, বাঙালির লজ্জা দূর করার শপথ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে হাজি সাহেবের বিশ্বস্ত অনুচরের ওপর।
রমিজ শেখ কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখে সে শত্ৰুবেষ্টিত। তাদের অস্ত্রগুলো তার মুখের ওপর অন্ধকারে ঝলকাচ্ছে। সে তো আর মিরজাফরদের ষড়যন্ত্রে শরিক ছিল না যে, তার প্রস্তুতি থাকবে। তবু রামদায়ের প্রথম কোপটা হাতের তালু দিয়ে ঠেকায়। দুটি তরতাজা আঙুল খসে পড়ে মাটিতে। রমিজ শেখ নিজে না চাইলেও সে একজন নট বটে এই পালার। তাই জানে, পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। অদূরে ইংরেজ শিবির, ওখানে স্বয়ং মিরজাফর আছেন। কোনোক্রমে একবার পৌঁছে গেলে প্রাণে বেঁচে যাবে। রমিজ শেখের গায়ে অসুর ভর করে। সে ছয়জনের বিরুদ্ধে খালি হাতে একা লড়ে শত্রুর বেষ্টনী ভেঙে বেরিয়ে যায়। তারপর গা ভরা রক্ত আর ক্ষত নিয়ে ছোটে একাত্তরের মিরজাফরের অনুচর শত্রুশিবিরের দিকে। আর তার পেছন পেছন দৌড়ায় ছয় পাহারাদার। তারা তখনো পালার একাগ্র নট। যে অংশটি অভিনীত হওয়ার আগে ভোর হয়ে যেত, বারবার টিকিট কেটেও কোনোদিন দেখতে পায়নি, সেই অদেখা দৃশ্যে তারা নিজেরা এখন অভিনয় করছে। কাহিনিতে আছে, পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের পর নবাব মুর্শিদাবাদে ফিরে গিয়েছিলেন। দেশপ্রেমিক মোহনলাল রণাঙ্গনে থেকে যায়। বুকের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে ইংরেজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সে। ইতিহাসের নির্ভুল পুনরাবৃত্তি এবারও ঘটে। আর এর সাক্ষী হয় একাত্তরের এক মেঘমেদুর রাত।
দু’দিন আগে নতুনগাঁওয়ের পার্শ্ববর্তী থানা শহর মল্লিকপুরে মিলিটারি ক্যাম্প করেছে। এলাকার মানুষ গা-ছাড়া। মিলিটারিরা বউ-ঝিদের ধর্ষণ করে জোয়ান ছেলেদের ধরে নিয়ে যায়। দেশপ্রেমিকদের রিপোর্ট অনুযায়ী আশপাশের গায়ে আর কোনো যুবক নেই। যুবতীরা মুমূর্ষ। তাতে সৈন্যরা স্বস্তি বোধ করে এবং পাহারায়। সেন্ট্রি বসিয়ে সকাল সকাল ঘুমোতে যায়। কিন্তু দেশপ্রেমিকদের চোখে ঘুম নেই। আর ঘুমাবেই-বা কোথায়। নামেই দেশপ্রেমিক, আসলে তো তাদের দেশ নেই। ঘরে ফিরলে মুক্তিফৌজ ধরবে। ক্যাম্প থেকেও আজ রাতের মতো ছুটি দেওয়া হয়েছে। তাই গাঁয়ের পথে বন্যপ্রাণী-শিকারির মতো তারা গা-ঢাকা দিয়ে চলে এবং একসময় পেয়েও যায় শিকার। বন্দুকসহ পনেরো-ষোলো বছরের একটি ছেলেকে পিছমোড়া করে বেঁধে সেন্ট্রির সম্মুখে এনে বলে, ইয়ে মুক্তি হ্যায়। বহুৎ কোশিশ করূকে ইসকো পাকড়া। ক্যাম্পের ভেতর রইরই ফুর্তির রব–-মুক্তি মিলা, মুক্তি মিলা। কিশোর বালক কিছুই বুঝতে পারে না। সন্ধ্যা রাতে সে এই বন্দুকটি হাতিয়েছে। ট্রিগার কোথায়, গুলি ছুঁড়তে হয় কীভাবে, এসব জানার জন্য রাতারাতি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজে। লোকগুলো তাকে ভুল করে ধরেছে। সে নিজেও তো এদের মতো খুঁজছে মুক্তিদের। কিন্তু এ কথাগুলো বলার আগেই সান্ত্রির প্রহারে সে জ্ঞান হারায়। তারা তাকে চ্যাংদোলা করে লকআপে ফেলে দ্রুত পজিশন নেয়। কারণ সৈন্যরা ভেবেছে, এই কিশোর নিশ্চয়ই অগ্রবর্তী যোদ্ধা, পেছনে রয়েছে মূল বাহিনী। ওরা ক্যাম্প আক্রমণ করতে এগিয়ে আসছে। মূল বাহিনীর জন্য সৈন্যদের বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয় না। রমিজ শেখ রক্তাক্ত দেহে দৌড়ে এলে তারা তাকে বন্দি করে। পেছনে খোদ নবাব সিরাজউদ্দৌলার ফৌজ। তাদের হাতের বল্লম, তেঁটা, রামদা অন্ধকারে বিদ্যুতের মতো ঝলকায়। দূর আকাশে গুড়গুঁড়িয়ে মেঘ ডেকে ওঠে। সৈন্যরা বিলম্ব করে না। যারা মোহনলালের মতো বুকের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে বিদেশি শত্রুর বিরুদ্ধে লড়বে ভেবেছিল, কিছু বুঝে ওঠার আগেই মেশিনগানের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায়। নবরত্ন অপেরার পালার মতো তাদের যুদ্ধটাও থাকে অসমাপ্ত–আগামী দিনের অপেক্ষায়।
