মেঘের পর মেঘ জমছে। রাতের পৃথিবী মসিমাখা, তিমির বর্ণের। অদূরে শত্রুর ছাউনি। শিয়াল ডাক ছেড়ে রাতের প্রহর ঘোষণা করছে। প্যাচা অমঙ্গলের সংকেত জানাচ্ছে গাছের মগডাল থেকে। ছয়জন পাহারাদার যেন পলাশীর অন্ধকার প্রান্তরে দণ্ডায়মান। হাতে তাদের টেটা-বল্লম, রামদা। মুখে আমরণের অভিযানের দীপ্ত শপথ। বুকের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে বিদেশি শত্রুর হাত থেকে দেশটাকে রক্ষা করবে। তারা হচ্ছে দেশপ্রেমিক, অতীতের নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিশ্বস্ত অনুচর-মিরমর্দান আর মোহনলাল।
রমিজ শেখ দেশপ্রেমের গাম্ভীর্য ও শহিদি উদ্দীপনার মাঝখানে উশখুশ করে। অদ্ভুত তো এই নতুনগাঁওয়ের মানুষগুলো! সিরাজউদ্দৌলা ভর করেছে ওদের। সেই কোনকালের অদেখা অচেনা এক নবাবের শোকে সবাই যেন পাথর বনে গেছে। আগের গোয়ার্তুমি ভাবটা নেই। কেমন শান্ত মেজাজের ফেরেশতা একেকজন। কিন্তু মনে মনে তাদের এক পণ, দেশের জন্য জান দেবে, বিদেশি শত্রু তাড়াবে আর হত্যা করবে মিরজাফরদের। রমিজ শেখের ভয় ভয় লাগে। এই খুন আর পাল্টা খুনের শেষ কোথায়? এসব ঠান্ডা না গরম মাথার খুন? যুদ্ধ থামার পর আদালত যদি বসে কোন আইনে বিচার হবে তাদের!
দুনিয়াটা এক আজব জায়গা। বিদেশিরা আসবেই লোভ করে। দেশের মধ্যে একজন দেশপ্রেমিক থাকবেনই। আর মিরজাফররাও হাঁটাচলা করবে তাদের কাছাকাছি ছায়ার মতন। যেন একটা সাজানো নাটক। চরিত্রগুলোও গাধা। এর বাইরে কেউ থাকতে নেই–যে মারতে বা মরতে চায় না। কত শত বছর ধরে একই নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে আর মানুষগুলো অভিনয় করছে তাদের বাধা ভূমিকায়! রমিজ শেখ নিজে কার দলে–হাজি সাহেব, না এই ছয় পাহারাদারের? দেশপ্রেমিক যে হাজি সাহেব নন, এখন তা স্পষ্ট। তিনি মিরজাফর। কিন্তু যুদ্ধে তো সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় হয়েছিল, বাংলার মসনদে বসেছিল মিরজাফর, যে দেশপ্রেমিক নয়। রমিজ শেখ মরতে চায় না। কপালগুণে ফাঁসির দড়ি ফসকে বেরিয়ে আসা খুনের আসামি সে। জীবনটা যে হেলাফেলার জিনিস নয়, বিচারের রায় পাওয়ার আগের কয়েক মাস হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। রোজ রাতে বউয়ের বেশ ধরে আজরাইল এসে বসত তার গরাদের পৈঠায়। বিয়ের গীত গাইত কুনকুনিয়ে। তারপর ধীরে ধীরে উঠে চলে যেত রাতের শেষ প্রহরে প্রহরীর হুঁশিয়ার ডাক শোনার পর। তার যাবজ্জীবন হওয়ার পর বউ আর আসেনি, অভিমানেই হয়তো!
দেখতে দেখতে জায়গাটা পলাশী হয়ে ওঠে আর সময়টাও দুই শ’ চৌদ্দ বছর পিছিয়ে চলে যায় ১৭৫৭ সালে। নতুনগাঁওয়ের পাহারাদাররা শুধু পাহারাদার থাকে না, হয়ে ওঠে নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিশ্বস্ত অনুচর। কথা বলে, চলাফেরা করে ঘোরের ভেতর, যাত্রার ঢঙে। তাদের হাতের তেঁটা-বল্লম আর রামদাগুলো যেন তলোয়ার, উত্তেজনার মুহূর্তে এক টানে কোষমুক্ত করে মাথার ওপর উঁচিয়ে ধরে। গা ছমছম করে রমিজ শেখের। সে যদিও নিজের পক্ষ এখনো ঠিক করে উঠতে পারেনি, তবু মনে হয়, মানুষগুলো তাকে জোর করে মিরজাফরের দলে ঠেলে দিয়েছে। রাইফেলটা সঙ্গে থাকলে এত অসহায় লাগত না। অস্ত্রটা হাতিয়ে নিয়ে গেল কোথায় ছোকরা? এরপর তো তাকে আর দেখা গেল না। পদে পদে এত বিপদ, সে হাজি সাহেবের কাছে থেকে গেলেই পারত! লোকে যতই গালমন্দ করুক, যুদ্ধে জয়লাভ করে তো মিরজাফর, হেরে ভূত হয় সিরাজউদ্দৌলার দল। একটা মেয়েমানুষের জন্য, বিজয়ী পক্ষ ছেড়ে সে জীবন নিয়ে জুয়া খেলতে নেমেছে–দশ বছর জেল খেটে তো কোনো শিক্ষাই হলো না। অনাহারে, বিনা চিকিৎসায় মা-বাপ মরল তার কয়েদবাসের সময়। জীবনের শেষ। ক’টা দিন সর্বস্বান্ত বুড়ো-বুড়ি একমুঠো ভাতের জন্য মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষা করে ফিরেছে। কেউ ভিক্ষা দেয়নি। খুনি পুত্রের বাপ-মায়ের না-খেয়ে মৃত্যু, তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেছে গাঁয়ের ধনী-গরিব সবাই। রমিজ শেখ জানে না, হাজি সাহেব জায়গা না-দিলে কয়েদির পোশাকে সে কোথায় দাঁড়াত। কে তাকে আশ্রয় দিত। যে দুনিয়ায় নির্দোষ বাবা-মায়ের ঠাই হলো না, তার হতো? দূর সম্পর্কের বড়লোক আত্মীয়, যার চৌকাঠে হাফ প্যান্ট, ছেঁড়া শার্ট আর খালি পায়ে সেই কবে মায়ের হাত ধরে ভয়ে ভয়ে একদিন দাঁড়িয়েছিল, আশ্চর্য যে, এক মুখ দাড়ি-গোঁফ আর কয়েদির পোশাক সত্ত্বেও লহমায় চিনে ফেললেন! বিমুখ করলেন না। সব জানার পর আরো আপন করে নিলেন। রেগে গিয়ে একবার অণ্ডকোষ মুচড়ে দেওয়া ছাড়া হাজির ব্যাটা তার কী ক্ষতি করেছে যে, না বলে-কয়ে সে চলে এল! এই দেশে বেইমান-বিশ্বাসঘাতক যদি কেউ থাকে, সে রমিজ শেখ।
হালে রমিজ শেখ মরিয়মের ভাবগতিকও বুঝতে পারে না। শিক্ষিত মেয়ে, স্বর্গধাম থেকে বেরিয়ে এল তার হাত ধরে, জাতকুল ছেড়ে আসার মতন। টানা দুই দিন ঘুরল পথে পথে। তারপর একটা আশ্রয় যখন পেয়ে গেল, তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিল ময়লা কাপড়ের মতো দলা পাকিয়ে। দুনিয়ার এই বিচার? নতুনগাঁওয়ের লোকদের একবার সে বললে পারত, মানুষটা দুই দিন না-খাওয়া, নিধুম, তোমরা তাকে পাহারায় নিয়ো না, আজকের রাতটা অন্তত সে বিশ্রাম করুক। তা তো বললই না, মনে হলো রমিজ শেখকে চেনেই না–এমন ভাব করে মেয়েদের হাত ধরে অন্দরমহলে চলে গেল । সিরাজউদৌল্লা যাত্রার এই চৌহদ্দি থেকে জান নিয়ে ফিরতে পারলে, লাট সাহেবের বেটিকে সে দেখিয়ে ছাড়বে কত ধানে কত চাল।
