মনে মনে নিজেকে তৈরি করে নিচ্ছিলুম। নিজের ঘরেই তো বছরের পর বছর বন্দি হয়ে থেকেছি, কয়েদখানায় আর নতুন কী শাস্তি পাব? আমার মন অন্য দিক থেকে ভেঙে যাচ্ছিল। আমাকে কয়েদখানায় যেতে হবে শুনে আত্মীয়বন্ধুরা এভাবে দূরে সরে যেতে পারল? পারবেই-ই বা কেন? মীরসাবকে তো তাঁর পরিজনরাই অন্ধ কুঠুরিতে বন্দি করে রেখেছিল। সবচেয়ে অবাক হয়েছিলুম লোহারুর নবাব আমিনুদ্দিন সাবের ব্যবহারে। কী দোস্তি ছিল তাঁর সঙ্গে। আর তিনি আমাকে একেবারে অস্বীকার করে বসলেন। তার ভাই জিয়াউদ্দিনও সরে দাঁড়ালেন।
রোনে সে অয় নদীম সলামাৎ নহ্ কর মুঝে,
আখির কভী তো উক্লাহ্-এ দিল বা করে কোঈ।
(একটু কেঁদে নিতে দাও, ভৎসনা কোরো না বন্ধু,
কোনও এক সময় তো হৃদয়ের ভার হালকা করবে মানুষ।)
সে-সময় আমার হাত ধরেছিলেন শুধু শইফতা সাব। ফরিস্তার মতো আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। মামলার সব খরচ, জরিমানার টাকা তিনিই দিয়েছিলেন। প্রায় রোজই কয়েদখানায় আমার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন।
একদিন তাঁকে জিজ্ঞেস করলুম, আপনি হজ করে এসেছেন। দারুও আর খান না। আমার মতো কাফেরের কাছে আসেন কেন?
-তওবা, তওবা। এ কী বলছে মির্জাসাব?
-সবাই তো আমাকে ছেড়ে গেছে। আপনি এখনও কেন আসেন?
-মির্জাসাব আপনি কতটা শরিফ, কতটা শরিয়তি পথে চলেন, এসব নিয়ে আমি কখনও ভাবিনি। আমার কাছে আপনি একমাত্র কবি, যাঁকে আমি আমির খসরুর পাশে বসাতে পারি। মিঞা তানসেনের সুরসঞ্চার আর আপনার গজল, আমার কাছে একাকার হয়ে যায়।
-এ কী বলছেন আপনি? মিঞা তানসেন খোদার নূর। আমি তার পাশে কে? আপনার মনে আছে, সে যেবার মল্লার গেয়ে মিঞা বর্ষা নামিয়েছিলেন? আমি রাতে আমার শয়তানের কামরায় শুয়ে শুয়ে সেই দৃশ্য দেখি। কবেকার সেইসব দিন। আর কি কখনও এই দুনিয়াতে ফিরে আসবে?
-আসে তো।
-কোথায়?
-ওই যে আপনার শের—
হৈ খবর গর্ম উন-কে আনে কী,
আজ-হী ঘর-মেঁ বোরিয়া নহ হুয়া।
আমি তো দেখতে পাই মির্জাসাব, জোর খবর তিনি আসছেন। আল মুসব্বির। আর তাকিয়ে দেখি, আজকেই আমার ঘরে একটা মাদুরও নেই।
-আমাকে এভাবে লজ্জা দেবেন না শইফতা সাব।
-আপনি মদ খান, জুয়া খেলেন, এসব কী আমরা জানি না, মির্জাসাব! কয়েদখানায় বন্দি আছেন বলে আমি আপনার পাশ থেকে সরে যাব? আপনি কবি-শব্দ নিয়ে আপনি এখনও যা খুশি করতে পারেন -এর চেয়ে বড় কথা তো আমার কাছে কিছু নেই।
আমি হেসে বলি, আপনি হজ করে এসেছেন। আপনার এসব কথা শুনলে শরিয়তিরা পাথর ছুঁড়ে আপনাকে মেরে ফেলবে।
-আমি তাদের বলব, মহম্মদ মিরাজে গিয়েছিলেন। জন্নত-জাহান্নাম-দুই-ই দেখে এসেছেন। ভাইসব, তোমরা তাঁর পিছনে পিছনে যাও।
-এই লোকজনদের নিয়ে যাওয়ার জন্য আপনাকেই বুরাক হতে হবে শইফতা সাব।
-তাই সই। আল্লার পথেই তো যাব।
মান্টোভাই, আমি দেখলুম, সংসারের যে জেলখানা, তার চেয়ে কয়েদখানা তো খুব খারাপ নয়। চোর, ডাকাত, খুনি, পাগল-কতরকম মানুষের সঙ্গে যে আমি মিশে যেতে পারলুম। তাদের নানা কিস্সা, কতরকম কথা বলার ধরন। সাহেবদের বাড়িতে পিয়ানোয়-বেহালায় কতরকম সুরের ওঠাপড়া শুনেছিলুম, কয়েদখানার জীবন ঠিক সেইরকম। হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে, হারমনি-ফ্রেজারসাবের মুখেই শব্দটা প্রথম শুনেছিলুম-সেই হারমনি-ই শুনতে পেলুম জেলখানায় এসে। হাবসিয়া নামে তখন একটা না লিখেছিলুম কয়েদখানায় বসেই। হারমনি-টা ওখানে শুনতে পাবেন, মান্টোভাই।
এখানে বন্দি আমি, কবিতায় বীণায় তুলি ঝঙ্কার,
হৃদয়ের দুঃখস্রোত সুর হয়ে যায়
রক্ত থেকে ছেনে তুলি গান-বন্দি আমি
খুলে ফেলি অদৃশ্য জানলা,
গড়ে তুলি পাখিদের সরাইখানা।
কত কাজ দেবে দাও,
তোমার এই বন্দিত্বের উপহার,
শিকলে বাঁধতে পারবে কি কণ্ঠস্বর
বিলাপ যখন হয়ে ওঠে ঝরণা?
পুরনো বন্ধুরা, এখানে এসো না,
কখনও আমার দরজায় ধাক্কাও দিও না,
আমি তো আগের মতো সহজ হব না।
এখন চোরেরা আমার সঙ্গী,
আমাকেই প্রভু মেনে নেয়,
আমি বলি, বাইরে যেও না ভাই,
ওখানে কিছুমাত্র বিশ্বস্ততা নেই।
ওরা আসে, জেলের রক্ষক ও প্রহরী
যেহেতু আমি তো এসেছি।
খুলে দেয় দরজা,
জানে, আমিই এসেছি।
জেলকুঠুরির বন্ধুরা, উল্লাস করো,
আমি এসে গেছি।
কবির শব্দে তুমি খুঁজে পাবে ঘর,
দ্যাখো, আমিই এসেছি।
বন্ধুরা ফিরিয়েছে মুখ,
আত্মীয়েরা সরে গেছে দূরে,
ওগো, অচেনা মানুষ, বন্দি হৃদয়,
তোমার দিকেই বাড়িয়েছি হাত।
তিন মাস কয়েদখানায় ছিলুম, ভাইজানেরা, আমার সবার সঙ্গেই ভাব-ভালবাসা হয়ে গিয়েছিল। কতজন যে এসে শের শুনতে চাইত। জেলখানায় এসে বুঝলুম, গজল শুনতে প্রায় সকলেই ভালবাসে। কিন্তু এমন-এমন কাজ করতে হয় তাদের, শোনার সময়টুকুও পায় না। সন্ধের পর সবাই আমাকে ঘিরে বসত; সে যেন এক মুশায়েরা। শের বলার লোক তো একা আমিই। একদিন নতুন একটা শের তৈরি করে ওদের শোনালুম :
দায়েমুল-হবস ইস্-চেঁ হৈ লাখোঁ তমন্নায়ে, অসদ;
জানতে হৈঁ সীহ্-এ পুর-কো জিন্দাখানহ্ হম।
(এখানে যাবজ্জীবন বন্দি হয়ে আছে লক্ষ কামনা-বাসনা, আসাদ,
আমার রক্তাক্ত বক্ষকে কারাগার বলেই জানি।)
-মিঞা- একটা মৃদু কণ্ঠস্বর ভেসে উঠল। দেখি, যে লোকটা বেশির ভাগ সময় কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে, সে উঠে বসেছে।
