পরে ব্যাপারটা নিয়ে অনেক ভেবেছিলাম, মির্জাসাব। যদি ইসমত আর আমার সত্যি নিকাহ্ হত, তা হলে ব্যাপারটা কেমন দাঁড়াত? এই যদির মানে খুঁজে পেতে হিমসিম খেতে হবে। যেমন ধরুন, এই প্রশ্নের আপনি কী উত্তর দেবেন, ক্লিওপেট্রা-র নাক যদি এক ইঞ্চির আঠারো ভাগের এক ভাগ বড় হত, তা হলে নীল নদের অবস্থা কী দাঁড়াত? মান্টো আর ইসমতের বিয়ে নিয়ে প্রশ্নটাও এমনই আজগুবি। শুধু এটুকু বলা যায়, বিয়েটা হলে উর্দু সাহিত্যের ইতিহাসে। একটা আনবিক বিস্ফোরণ ঘটে যেত। হয়তো নিকাহনামার সাক্ষরই হত দুজনের শেষ লেখা। আর আমি কল্পনা করতাম সেই বিয়ের মজলিসে কাজি সাহেবের সামনে আমার ও ইসমতের কথাবার্তা :
-কাজি সাহেবের কপালটা বেশ চওড়া, স্লেটের মতো নয় ইসমত?
-কী বললে?
-কানের মাথা খেয়েছ নাকি?
-আমার কান ঠিকই আছে। তোমার গলায় কি ইঁদুর ঢুকেছে?
-তওবা,তওবা, বলছিলাম, কাজি সাহেবের কপাল একেবারে স্লেটের মতো।
-তবে বেশ মসৃণ।
-মসৃণ কাকে বলে তুমি জানো থোড়াই।
-না, আমি জানি না। তুমি যেন খুব জানো।
-তুমি জানো তোমার মাথা।
-কাজী সাহেবের মাথা খুব সুন্দর। তুমি বড় বকবক করছ মান্টো।
-বকবক তো তুমিই করছ।
-না। আমি না, তুমি।
-তুমি-তুমি-কথার তুবড়ি ছোটাচ্ছ।
-ও বাবা, এখন থেকেই দেখছি আমার শওহর বনে গেছ।
আমি কাজি সাহেবের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বললাম, এ মেয়েকে আমি কিছুতেই নিকে করব না। যদি আপনার মেয়ের মাথা ঠিক আপনার মাথার মতো হয়, তবে তার সঙ্গেই আমার নিকাহ পড়িয়ে দিন।
ইসমতও চেঁচিয়ে উঠল, আমিও এই লোকটাকে নিকে করব না কাজি সাহেব। আপনি যদি এখনও চার বিবি নিয়ে থাকেন, তবে আমাকেই নিকে করুন। আমি আপনাকেই পছন্দ করি কাজি সাহেব।
বম্বের জীবন এমন কিস্সার মতোই মির্জাসাব, সত্যি-মিথ্যে সেখানে একাকার হয়ে যায়। আমি পাকিস্থানে চলে যাওয়ার পর ইসমত যে আমার একটা চিঠিরও উত্তর দেয়নি, সেই নীরবতায় কি কোনও সত্য লেখা ছিল না, মির্জাসাব? ইসমত একবার আমার হাত ধরে বলেছিল, মান্টোভাই, জীবনে একটা কথাও তুমি মুখ ফুটে বলতে পারলে না? মির্জাসাব, আমি ইসমতকে আপনার একটা শের শুনিয়েছিলাম :
আ-হী জাতা বোহ রাহ-পর, গালিব
কোঈ দিন অওর-ভী জীয়ে হোতে।।
৩১. শয়তানের কামরায় জুয়ার আসর
খরাবী দিল কী ইস হদ্ হ্যয় কেহ্ য়হ্ সমঝা নহীঁ জাতা,
কেহ্ আবাদী ভী য়াঁ থী য়া-কে বীরানহ্ থা মুদ্দৎকা
(হৃদয় আমার এমন উজাড় হয়েছে যে বোঝাই যায় না—
এখানে কোনও বসতি ছিল, না কি যুগ যুগ ধরে উজাড় হয়েই আছে।।)
সেদিন আমার শয়তানের কামরায় জুয়ার আসর বেশ জমে উঠেছে। আমরা চৌসরের জুয়া খেলতুম। বেশ কয়েকজন ধনী ব্যবসায়ী এসেছেন। আমার নসিব সেদিন বেশ ভালই ছিল, মান্টোভাই। কয়েকটা খেলায় জিতেছি। মনের মধ্যে মীরসাবের একটা শের ভোমরার মত গুনগুন করে যাচ্ছিল :
ইশক মাশুক, ইশক আশিক হ্যয়
ইয়ানি আপনা হি মুবতলা হয় ইশক্।
এমন সময় কাল্লু এসে জানাল, একটা পালকি এসেছে বাড়ির সামনে। পালকিতে কয়েকজন জেনানা। আমি ধমক দিয়ে বললুম, তা আমাকে বলতে এসেছিস কেন? বেগম সাহেবার কাছে হয়তো এসেছে। মহলসরায় নিয়ে যা।
কাল্লু চলে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েকজন বোরখাপরা মহিলা কুঠুরিতে এসে হাজির। আমরা সবাই তো অবাক। কারা এরা? সঙ্গে সঙ্গে সবার বোরখা খুলে গেল। দেখি কোতোয়াল ফয়জুল হাসান, আর তার সিপাইরা। ফজলুল হাসান গর্জে উঠল, সব কো হাথকড়ি লাগাও।
আমি শান্ত হয়ে বললাম, বসুন কোতোয়ালসাব। আমি মির্জা গালিব। আমাকে তো আপনি চেনেন। এঁরা আমার দোস্ত, শাহজাহানাবাদের ইমানদার আদমি।
-তাই জুয়া খেলেন?
আমি হেসে বলি, জুয়া কোথায়? চৌসর খেলা কি অপরাধ?
-চৌসরের পেছনে জুয়া আছে আমি জানি, মির্জা। এর আগেও একবার আপনাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। আগে তো থানায় চলুন।
মালিক রাম ফয়জুল হাসানের হাত ধরে বললেন, মির্জার মতো শায়র জুয়া খেলবেন, আপনার বিশ্বাস হয়?
ফয়জুল হাসান হো-হো করে হেসে ওঠে, মির্জা জুয়া খেলেন না, এ-কথা শুনলে কেউ বিশ্বাস করবে ভেবেছেন?
-খেলি তো কোতোয়ালসাব। আমি হেসে বললুম।
-দেখুন নিজের কানেই শুনুন।
-লেকিন জিন্দেগি কে সাথ।
-মির্জা, বড় বড় কথা বলে আপনি পার পাবেন না। তারপর ফয়জুল হাসান সিপাইদের দিকে তাকিয়ে বলল, সব কো হাথকড়ি লাগাও।
এবার আমার ভেতরে আগুন জ্বলে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে বললুম, সাহেবরা কিন্তু আমার দোস্ত, মনে রাখবেন কোতোয়াল সাব।
-ওসব কথা আদালতে গিয়ে বলবেন।
আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না, মান্টোভাই। সত্যি সত্যিই হাথকড়ি পরিয়ে শাহজাহানাবাদের রাস্তা দিয়ে আমাদের থানায় নিয়ে যাওয়া হল। এই অপমানও প্রাপ্য ছিল এ-জীবনে? আমার সঙ্গে যাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছিল, কেউ টাকা দিয়ে, কেউ মুরুব্বি দেখিয়ে ছাড়া পেয়ে গেল। আমি সারারাত রয়ে গেলুম থানার হাজতে।
খবর পেয়ে পরদিন শইফতা সাব হাজতে আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। আমার দুহাত চেপে ধরে বললেন, চিন্তা করবেন না মির্জাসাব। আমি আপনাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবই।
-কী করে?
-দেখি, কী করা যায়। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব।
শইফতা সাবের কোন চেষ্টাই কাজে লাগল না। আমাকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হল। কোতোয়াল ফয়জুল হাসান আমার ওপর কেন যে এমন নারাজ হল, কিছুই বুঝতে পারলুম না। নতুন ম্যাজিস্ট্রেটও আমার সম্পর্কে না -ওয়াকিফ। ম্যাজিস্ট্রেট সাব তো কোতোয়ালের ওপরে, তবু বিচারের সময় এমন ভাব দেখালেন যেন কোতোয়ালই শেষ কথা। সেশন জজ আমার। দোস্ত ছিলেন, আমার সঙ্গে খোলামেলা ভাবে মিশতেন, এবার তিনিও আমাকে চিনতে পারলেন না। বিচারে সাব্যস্ত হল, আমাকে দুশো টাকা জরিমানা দিতে হবে আর সঙ্গে ছমাস সশ্রম কারাদণ্ড। জরিমানা না দিতে পারলে কয়েদখানার থাকার মেয়াদ আরও বাড়াবে আর দুশো টাকার ওপর আরও পঞ্চাশ টাকা দিলে কারাবাসের সময় আমাকে কাজ করতে হবে না। দিল্লির কাগজে এ-নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছিল। শইফতা সাব উঁচু আদালতে শাস্তি পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন জানালেন। কিন্তু সেখানেও একই রায় বহাল রইল শইফতা সাবের কাছে শুনেছিলাম, এই রায় শুনে নাকি শাহজাহানাবাদে নাকি তোলপাড় শুরু হয়েছিল। আখবারেও লেখা হয়েছিল, আমার মত অভিজাত, প্রতিভাবান মানুষকে এমন সাধারণ অপরাধের জন্য শাস্তি দেওয়া ঠিক হয় নি। সবচেয়ে বড় কথা, জাঁহাপনা বাহাদুর শাহ-আমাকে তো তিনি পছন্দ করতেন না-সাহেবদের লিখিত অনুরোধ জানিয়েছিলেন আমাকে মুক্তি দেবার জন্য। তাঁর আবেদনও নাকচ করে দেওয়া হয়েছিল, মান্টোভাই।
