ইকবাল ভাই, নিন্দ টুট গিয়া ক্যায়া? একজন বলে ওঠে।
-ঘুম তো আসে না, ভাইজান। কম্বলের ভেতরে অন্ধকারে শুয়ে থাকি, তবু ঘুম আসে না। কিন্তু মিঞা-সে আমার দিকে সোজাসুজি তাকায়-আপনি কয়েদ হয়ে আছেন বলে, আপনার দিলও কয়েদখানা হয়ে যাবে?
ইকবালের কয়েদখানায় আসার কিস্সাটা আজিব, ভাইজানেরা। বিয়ের পর অনেকদিন ওর সন্তান হচ্ছিল না। তারপরই ওর বিবি গর্ভধারণ করে। ইকবালের ছেলে হয়। ছেলের জন্মের দুবছর পর ইকবাল জানতে পারে, সে নয়, তার খানদানের অন্য কেউ ছেলেটির জন্মদাতা। ইকবাল ছেলেটিকে হত্যা করে কবর দিয়ে আসে। এরপর থেকে সে আর ঘুমোতে পারত না। একদিন নিজেই থানায় গিয়ে হাজির হয়। সব কথা কবুল করে, তারপর কয়েদখানায় চলে আসে।
এই প্রথম ইকবালের মুখ দেখলুম। যেন একটা ঝরে যাওয়া ফুল। এখনও কয়েকটা শুকনো পাপড়ি শরীরে লেগে আছে। সে হঠাৎ বলতে শুরু করল :
ভালা গর্দিশ ফলক কী চ্যয়ন দেতি হয় কিসে, ইনশা
ঘানিমৎ হ্যয় কে হম সুরত ইহাঁ দো চার বৈঠে হৈ।
আহা, কতদিন পরে ইনশা আল্লা খান ইনশার শের শুনলাম। অওধে ইনশার মতো শায়র আর কেই বা ছিলেন? কথাগুলো ভাবুন মান্টোভাই, সময়ের ঘূর্ণি, কাউকেই রেয়াত করে না, খোদা। হাফিজ, কয়েকজন দোস্ত তো এখনও বসে কথা বলতে পারছি। এর চেয়ে বড় আর কী পাওয়া যায় এই জীবনে?
আমি বললুম, ইকবাল ভাই, এইরকম কয়েকজন বন্ধুদের আমি বিশ্বাস করেছিলুম। কিন্তু আমার কয়েদখানায় আসার খবর শুনেই তারা দূরে সরে গেল।
-কেন বিশ্বাস করেছিলেন? খোদা ছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস করা যায়? তা হলে একটা কিস্সা শুনুন মিঞা।
সঙ্গে সঙ্গে আমার কাল্পর কথা মনে পড়ল। সবাই হই হই করে উঠল, শুনাও ইকবাল-আজ মশহুর কিস্সাকা রাত-। আর ছড়িয়ে পড়ল হাসির উথালপাথাল ঢেউ।
-সিকন্দরের জীবনে একটা ভারী গোপন কথা ছিল। কাউকে তা সিকন্দর বলতেন না।
-সিকন্দর? সমস্বরে চিৎকার ওঠে, কেয়া বাত ইকবাল ভাই।
কেউ একজন বলে ওঠে, কয়েদখানায় সিকন্দরের কিস্সা! লা জবাব ইকবাল মিঞা।
আমি হেসে বলি, সিকন্দর ছাড়া কয়েদখানায় আর কেউ আসতে পারে?
-বহুৎ খুব।
-তা, গোপন কথাটা কী, ইকবাল ভাই? আমি জিজ্ঞেস করলুম।
-সিকন্দরের কান দুটো ছিল বিরাট, যেন হাতির মতো। কেউ সে কথা জানত না। লোকে দেখে হাসবে বলে বড় টুপিতে কান ঢেকে রাখতেন। কানের কথা জানত শুধু তাঁর বুড়ো নাপিত। একদিন নাপিত এমন অসুস্থ হয়ে পড়ল, তার আর কাজ কার ক্ষমতা রইল না। কিন্তু সম্রাটের জন্য তো এমন লোক খুঁজে দিতে হবে, যে কখনও গোপন কথাটা কারুর কাছে ফাঁস করবে না। সম্রাটের দরবারে বিলাল নামে একটি ছেলে কাজ করত। বুড়ো নাপিত তাকে জানত; বিলালকেই সে সিকন্দরের নাপিত হিসেবে বেছে নিল। সিকন্দর প্রথমে রাজি হননি, কিন্তু বুড়ো নাপিতের কথা শেষ পর্যন্ত মেনে নিলেন। বিলাল কাজে বহাল হল।
-তারপর? অনেকে ইকবালকে ঘিরে ধরল।
-প্রথমবার সিকন্দরের চুল কাটতে গিয়ে তো বিলালের অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার দশা। মানুষের এত বড় কান? ভয়ে বিস্ময়ে তার হাত থেকে কাঁচি পড়ে গেল। সিকন্দর বুঝতে পেরে গম্ভীর হয়ে বললেন, যা দেখেছ, তা নিজের মনেই রেখো। ও কথা আর কেউ জানতে পারলে তোমার জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব, আর গর্দান তো যাবেই, মনে রেখো। এই কথা শোনার পর থেকে বিলাল ভয়ে একেবারে কাঁটা হয়ে গেল। সব সময়ই সে দেখতে পায়, তার কাটা মুণ্ডু এখানে-ওখানে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ভয়ে কারো সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দিল সে। যদি কোনভাবে সম্রাটের কানের কথা মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ে। সে এ-ও বুঝতে পারছিল, কথাটা কাউকে না বলা অব্দি সে শান্তি পাবে না। গোপন কথাটা তার মাথা থেকে বেরিয়ে গেলেই সে মুক্তি পাবে। কিন্তু চেনাজানা কাউকে বললেও, সে জানত, কথাটা সঙ্গে সঙ্গে সারা শহরে রটে যাবে, আর অমনি তার কাটা মুণ্ডু রাস্তায় গড়াগড়ি খাবে।
-বিলাল কী করল?
-একদিন লুকিয়ে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে সে কিছুটা দূরে একটা বনে গিয়ে ঢুকল। সেখানে একটা পুকুর ছিল। রাখালেরা সেই পুকুরে ভেড়াদের এনে জল খাওয়াত, পুকুরপাড়ে নিজেরাও একটু জিরিয়ে নিত।আশেপাশে কাউকে দেখতে না পেয়ে বিলাল পুকুরের উদ্দেশ্যে বলল, উরিব্বাশ, সে কী ইয়া বড় বড় সম্রাট সিকন্দরের কান। কথাটা বলেই নিজেকে হালকা লাগল তার, যেন অনেকদিন ধরে বুকের ভেতরে আটকে থাকা একটা পাথর বেরিয়ে গেল।
-গুল,গুল। সব গুলগাপ্পা। একজন চেঁচিয়ে উঠল।
-বেওকুফ। ইকবাল বলে ওঠে।-গুলগাপ্পা ছাড়া কোথায়, কবে কিস্সা জন্মেছে শুনি? মানুষের জীবনই গুলগাপ্পায় ভরা, আর কিস্সা-সে তো মানুষেরই তৈরি করা।
-শালা হারামখোরের কথা না শুনে কিস্সাটা তো বলো ইকবাল ভাই। আরেকজন গলা চড়িয়ে বলে।
-বেশ কয়েকমাস চলে গেল। বিলালের ভয়ডর তখন কেটে গেছে; সিকন্দরও নতুন নাপিতকে নিয়ে খোশমেজাজে। কিন্তু এক আশ্চর্য ব্যাপার ততদিনে ঘটে গেছে। সেই পুকুরে কিছু নললতা জন্মেছিল। এক রাখাল একদিন একটা নললতা তুলে তার গায়ে ফুটো করে বাঁশির মতো বাজাতে শুরু করল। বাঁশির আওয়াজ শুনে তার তো চক্ষু চড়কগাছ। সেই আওয়াজের মধ্যে কে যেন বলে চলেছে, উরিব্বাশ, সে কী ইয়া বড় বড় সম্রাট সিকন্দরের কান।
