কৃষন আমার কথা যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। আমি তার চেনা সেই মান্টো, যে রেডিও-র নাটকে একটাও শব্দ বদলাতে চায়নি। দেখলাম অবিশ্বাস আর ঘৃণায় তার চোখ ছলছল করছে।
শেঠের বাড়ি থেকে বেড়িয়ে কৃষণ তো চিৎকার-চেঁচামেচি জুড়ে দিল।-তুমি লেখক মান্টো? এইভাবে নিজেকে বেঁচে দিলে? আর আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম।
-আমি কী তোমার বিশ্বাস ভেঙে দিয়েছি?
-তোমার লেখার একটা শব্দ বদলাতে বললে, তুমি ছাপতে দেবে?
-না।
-শেঠজির কথা তুমি মেনে নিলে?
-নিলাম কৃষণভাই। শেঠের কাছে আমরা সাহিত্যের জন্য আসিনি। তুমি কি মনে করো, গল্পটার কোন সাহিত্যমূল্য আছে? ওটা আমরা সিনেমার জন্য ভেবেছিলাম। মা সেখানে বোন হয়ে যেতে পারে, বোন ভ্যাম্প হয়ে যেতে পারে, হিরোর সঙ্গে যা খুশি তাই করতে পারে। তাতে তোমার আমার কী আসে যায়? সিনেমার গল্প লিখতে এসেছি টাকার জন্য। সাহিত্যের কথা এখানে ভেবো না কৃষণ। বুঝলে আমার কথা?
–হুঁ।
-তাহলে গল্পটা বদলানো যায়, তাই তো?
কৃষণ মাথা নেড়েছিল।
আমি জানতাম মির্জাসাব, কার জন্য জীবন দেব, আর কার জন্য নখরা করব। ফিল্মি দুনিয়া সেই নখরার জায়গা। কত লোক গল্প লিখে অপেক্ষা করে থাকত, কবে তার গল্প থেকে সিনেমা হবে। এদের আপনি লেখক বলবেন, মির্জাসাব? আমি কাগজ-কলম নিয়ে বসে ভাবতাম, আমি যে গল্প লিখতে যাচ্ছি দুনিয়ার কেউ এই গল্পটাকে সিনেমা বানাতে পারবে না। সাহিত্যের সব সত্য লুকিয়ে থাকে তার শব্দ-বাক্যে-অনুচ্ছেদে, কোনও ছবি তাকে প্রকাশ করতে পারে না; যেমন কোনও ছবিকে আমরা শব্দ দিয়ে বোঝাতে পারি না। আর বম্বের ফিল্মি দুনিয়া কখনও ছুঁতে পারবে মান্টো, কৃষণ চন্দর, ইসমত চুঘতাইয়ের গল্পকে? একদিন বম্বে টকিজ থেকে ট্রামে বাড়ি ফিরতে ফিরতে ইসমতকে বলেছিলাম, কৃষণের লেখায় আজকাল দুটো জিনিস আমি প্রায়ই লক্ষ্য করি।
-কী?
-ধর্ষণ আর রামধনু।
-একদম ঠিক মান্টোভাই।
-ভাবছি ওই নামেই একটা প্রবন্ধ লিখব কৃষণকে নিয়ে। জিনা বিলজবর আউর কাওস ও কাজা। কিন্তু আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না, ওর লেখায় ধর্ষণ আর রামধনুর সম্পর্কটা কী?
ইসমত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, রামধনুর অতগুলো রং কী সুন্দর। কিন্তু তুমি তো অন্য দিক থেকে বিষয়টাকে ভাবছ, মান্টোভাই।
-হ্যাঁ, আগুন আর রক্তের রং লাল। মঙ্গলগ্রহের সঙ্গে এই রঙের গভীর যোগ আছে ইসমত। আর একই রং দেখা যায় ধর্ষণ ও রামধনুতে।
-হতে পারে। লেখাটা তবে লিখেই ফেলল।
-আরও একটু ভাবো ইসমত। খ্রিস্টান চিত্রকলায় লাল ঈশ্বরীয় প্রেমের প্রতীক। এই রং জড়িয়ে আছে খ্রিস্টকে ক্রুশে চড়ানোর সঙ্গে। কুমারী মেরিও পরেন লাল পোশাক। পবিত্রতার রং। বলতে বলতেই দেখলাম, ইসমতের পোশাক সেদিন সম্পূর্ণ সাদা।
ইসমত হেসে বলল, লিখে ফেললা মান্টোভাই। তবে লেখার নামে বিলজবর-জোর করে শব্দটা দিও না।
-কিন্তু কৃষণ আপত্তি করবে। বিলজবর বলেই তো কৃষণ ধর্ষণকে ঘৃণা করে।
-ও আপত্তি টিকবে না মান্টোভাই।
-কেন?
-কৃষণ কী করে জানবে, ওর নায়িকা ভায়োলেন্সটাকেই ভালবেসেছিল কি না। হ্যাঁ, ইসমত ছিল এইরকম, বেপরোয়া, না হলে লিহাফ-এর মতো গল্প তো ও লিখতে পারত না। মির্জাসাব, উর্দু সাহিত্যে সে এক বিস্ফোরণ, তাও এক মেয়ের কলমে। ইসমতের সঙ্গে প্রথম আলাপের দিনই গল্পটা নিয়ে কথা তুলেছিলাম। সেটা বোধহয় ১৯৪২-এর আগস্টের কথা। ক্লেয়ার রোডে অ্যাডলেফি চেম্বার্সে মুসাওয়ার-এর অফিসে কাজ করছিলাম। মহাত্মা গান্ধী ও অন্যান্য কংগ্রেস নেতাকে তখন গ্রেফতার করা হয়েছে। সারা শহর জুড়ে গোলমাল। তখন একদিন শহিদ লতিফ ওর বেগম ইসমতকে নিয়ে এল। আলিগড় ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় থেকে শহিদের সঙ্গে পরিচয়। লক্ষ করলাম, ইসমত একই সঙ্গে লাজুক এবং কথা বলার সময় স্পষ্ট চোখের দিকে তাকাতে পারে। কিছুক্ষণ স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে কথা বলার পর গল্প-কবিতার দিকে আমাদের আলোচনার মোড় ঘুরে গেল। আমি ইসমতকে বললাম, আদাব-ই-লতিফ-এ আপনার লিহাফ গল্পটা পড়েছিলাম।
-তখন দিল্লিতে ছিলেন বুঝি?
-হ্যাঁ। ভাল বেশ ভাল। তবে শেষ বাক্যটা-আহমদ নাদিম কাসিমি-র জায়গায় আমি সম্পাদক হলে শেষ বাক্যটা কেটে দিতাম।
-কেন?
-আপনি কী লিখেছিলেন, মনে আছে?
-হুঁ।
-লেপটা এক ইঞ্চি ওঠার পর আমি কী দেখতে পেয়েছিলাম, তা কেউ এক লক্ষ টাকা দিলেও বলব না। লাইনটা তো এমনই ছিল, তাই না?
-হ্যাঁ।
-বলার দরকার ছিল?
-কেন, অসুবিধে কোথায়?
আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু ইসমতের মুখের দিকে তাকিয়ে আর কথা বলতে পারলাম না। যেন এমন কিছু তাকে বলেছি, যা শোনা তার পক্ষে পাপ। ইসমত ছিল এমনই; হঠাৎ এমন কথা বলবে, মির্জাসাব, আপনি সহ্য করতে পারবেন না, পরক্ষণেই যেন লজ্জাবতী লতাটি।
ইসমতের কথা তো সহজে ফুরোবে না, ভাইজানেরা। হায়দরাবাদ থেকে একজন আমাকে চিঠি লিখেছিল, কী ব্যাপার, এখনও ইসমত চুঘতাইয়ের সঙ্গে আপনার বিয়ে হল না? মান্টো আর ইসমত যদি এক হয়ে যেত, তা হলে কত ভাল হত। বড় আফশোস মান্টোসাব, ইসমত আপনাকে বিয়ে না করে শহিদ লতিফকে বিয়ে করল।
তখন হায়দরাবাদে প্রগতিশীল লেখকদের একটা সম্মেলন চলছিল। সেখানে নাকি অনেক মেয়ে ইসমতকে জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি মান্টোসাবকে বিয়ে করলেন না কেন? এসব কতদূর সত্যি আমি জানি না। তবে ইসমত বম্বেতে ফিরে শফিয়াকে বলেছিল হায়দরাবাদের এক মেয়ে নাকি তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, মান্টোসাব কি অবিবাহিত? জি না, ইসমতের উত্তর শুনে মেয়েটি চুপসে গিয়েছিল।
