কাছে যেতেই বাবুরাওজি রিটার পেছনে চাপড় মেরে বললেন, যাও কাগজ পেন্সিল নিয়ে এসো।
রিটা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই বাবুরাওজি হেসে বললেন, এমন ঠাসা নিতম্ব আগে দেখিনি, মান্টো।
-খুব চাপড় মারেন বুঝি?
-মারিই তো। আর হাত বুলিয়ে কী যে সুখ। যেন পলসন মাখনে হাত বোলাচ্ছি। রিটা শর্ট হ্যান্ড-এর খাতা-পেন্সিল নিয়ে ফিরে এল। আমার নিয়োগপত্রের বয়ান বলতে বলতে বাবুরাওজি মুখ তুলে তাকালেন। জিজ্ঞেস করলেন মান্টো কত হলে চলবে? একটু থেমে নিজেই বললেন, একশো টাকায় চলবে তো?
-না।
-মান্টো, এর বেশী তো আমি দিতে পারব না।
-আমি মাত্র ষাট টাকা নেব। তার বেশীও নয় কমও নয়।
বাবুরাওজি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, তুমি দেখছি একটা আস্ত গাধা।
-ঠিক তাই।
-তার মানে?
-আমি ষাট টাকার বেশী নেব না। কিন্তু কোন টাইমটেবিল আমি মানতে পারব না। যখন খুশি আসব, যাব। পত্রিকা ঠিকমত বেরলেই তো হবে?
চাকরি পেলাম ঠিকই, তবে সাত মাসের বেশী টিকল না। এদিকে বম্বেতেও কোনও কাজ নেই। ১৯৪১-এ রেডিওতে কাজ নিয়ে দিল্লি চলে গেলাম। মাইনে মাসে দেড়শো টাকা। রেডিও-র জন্য অনেক নাটক লিখেছিলাম। কিন্তু দেড় বছরের বেশী টিকতে পারলাম না রেডিওতে। সরকারি দপ্তরের চাকরি আমার জন্য নয়, মির্জাসাব। সে যে কী বিরক্তিকর সব লোক চারপাশে। আর বম্বের ফিল্মি দুনিয়ার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম আমি। আপনি আমির হলেন, কী ফকির কেউ যেমন ফিরে দেখবে না, তেমনই আপনার কোনটা ভাল, কোনটা খারাপ তা নিয়েও প্রশ্ন তুলবে না কেউ। শুধু বাঁচো, বেঁচে থাকো, হাড়েমজ্জায় বেঁচে থাকার আনন্দ উপভোগ করো। যেমন আমার বন্ধু শ্যাম বলত, মান্টো, এই জীবনটাই আমার আশিক। বলো মান্টো, তুমি কী চাও? শুধু জীবনটা বেঁচে থাকুক, আর সব জাহান্নামে যাক। তুমি চাও না, বলল, চাও না?
শ্যামের কথাও একদিন আপনাদের বলতে হবে ভাইজানেরা। পাকিস্থানে মদ ছাড়ানোর জন্য মানসিক হাসপাতালে ভর্তি থাকার সময় শ্যামের মৃত্যুর খবর পেয়েছিলাম। শ্যাম যেন আমার কানে কানে এসে বলেছিল, মান্টো, মৃত্যুর স্বাদ সত্যিই অন্যরকমের। কোনও দিন কল্পনাই করতে পারি নি। দিল্লির চাকরি একদিন ছেড়ে দিলাম, ভাইজানেরা। তখন আদবানি বলে কে যেন একজন দিল্লি রেডিও-র অধিকর্তা ছিল। সে একদিন আমার একটা নাটক পড়ে বলল, কয়েকটা শব্দ বদলাতে হবে। রেডিও -র ডিরেক্টর জেনারেল তখন বোখারিসাব; আদবানি তাঁর খুবই প্রিয় মানুষ। কেউ আদবানির বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারত না। আমি সরাসরি জানিয়ে দিলাম, আদবানিজি উর্দু জানেন না, বোঝেন না, পড়তেও পারেন না। আমার নাটকের ভুল ধরার ক্ষমতা তাঁর নেই। চাকরি থেকে ইস্তাফাই দিতে হল আমাকে। আর ওই বোখারিসাব? তিনি আমাকে আর কোনদিন সহ্য করতে পারেন নি। দেশত্যাগের পর রেডিও পাকিস্থানের ডিরেক্টর জেনারেল হয়েছিলেন, কিন্তু আমাকে কোনও দিন রেডিওর অনুষ্ঠানে ডাকেন নি। তো বয়ে গেছে মির্জাসাব। আমার মৃত্যুর পর তো আধ ঘন্টার অনুষ্ঠান করতে হয়েছিল রেডিও পাকিস্থানে। বোখারিসাবই তখন রেডিওর হর্তাকর্তা। এরা ভুলে যায় মির্জাসাব, তুমি সরকারের নোকর মাত্র, সে তুমি যত উঁচু পদেই থাকো, চেয়ার সরে গেলেই কেউ তোমার দিকে ফিরেও তাকাবে না।
দেড় বছর দিল্লিতে কাটিয়ে আবার বম্বেতে ফিরে এলাম, মির্জাসাব। মুসাওয়ার থেকে আবার ডাক এল, তার ওপর বম্বের হাতছানি ছিল বড় মারাত্মক। টাকা তো সেখানে উড়ছে, শুধু ধরতে পারলেই হল। আমি, কৃষণ চন্দর, রাজিন্দর সিং বেদি, উপেন্দ্রনাথ অশক, ইসমত আমরা যে ফিল্মের দুনিয়ায় ভিড়ে গিয়েছিলাম, তা শুধু টাকার জন্য। ভাল ভাবে খেয়ে পরে বাঁচব বলে। রোজ যেন জনি ওয়াকার পাই, ক্যাভার্ন সিগারেটের প্যাকেট যেন পকেটে রাখতে পারি। ফিল্মের গল্প লেখার সঙ্গে সাহিত্যের তো কোনও সম্পর্ক নেই। কৃষণ একটু সরল ছিল, প্রথম ব্যাপারটা বুঝত না। ভাবত, সিনেমার জন্য গল্প লিখে মহৎ কাজ করছে। একবার আমরা দুজনে বানজারা নামে একটা গল্প লিখলাম সিনেমার জন্য। গল্প বিক্রির জন্য জগৎ টকিজ-এর মালিক শেঠ জগৎ নারায়নের কাছে যাওয়া হল। গল্পটা শুনে শেঠ বলল, বহৎ খুব। আমি স্টোরিটা কিনব। কিন্তু মান্টোসাব। আপনি কারখানার ম্যানেজারকে বড় বুরা আদমি বানিয়েছেন। ওকে একটু ভাল করা যায় না? কারখানার ওয়ার্কাররা তো ব্যাপারটা ভালো চোখে দেখবে না। বুঝতে পারছেন, কি বলছি।
-নিশ্চয়ই, আমি বললাম।-কারখানার ম্যানেজারকে ভাল করতে বেশি সময় লাগবে না শেঠজি
-মতলব?
-একটু কাগজ-কলম নিয়ে বসা আর কী।
-সহি বাত। শেঠ হাসতে লাগল।
কৃষণ তো আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আস্তে ও কী যেন বলতে চাইছিল, আমি থামিয়ে দিলাম।
-আর একটা কথা বলি মান্টোসাব?
-জি।
-ম্যানেজারের বউকে আনলেন কেন? ওকে ম্যানেজারের বহিন বানিয়ে দিন।
-কেন?
-অনেক সুবিধা আছে তাতে।
-কী সুবিধে? কৃষণ প্রায় গর্জে ওঠে।
-কৃষণ, তুমি চুপ করো। শেঠজি তো গল্পটা কিনছেন। উনি যা চাইবেন—
-সহি বাত। আমার কথা তো ভাববেন। শুনুন মান্টোসাব, বোনটার যদি শাদি না হয়, একটু ভ্যাম্প টাইপ বানিয়ে দেবেন। হিরোর সাথে নখরা করবে। ব্যাপারটা জমে যাবে কি না বলুন?
-ইনশাল্লা। এর চেয়ে ভাল আর কিছু হয় না শেঠজি।
