তবে আর একজন মানুষ আমার জীবনে এলেন। খোদা কি আমাকে একবারে পথে বসিয়ে দিতে পারেন? নবাব মুস্তাফা খান শইফতাকে বন্ধু হিসেবে পেলুম। আমার চেয়ে ন বছরের ছোট। শাহজাহানাবাদের মানুষ। তার পূর্বপুরুষরা এসেছিল আফগানিস্থান থেকে। আরবি ফারসিতে চৌকস। গজলও খুব ভাল লিখতেন। এক সময় সুরা আর নারীই ছিল শইফতা সাবের জীবনের দুই বাহার। রামজু তবায়েফের সঙ্গে খুবই আশনাই ছিল তাঁর। রামজু কিন্তু যে সে তবায়েফ ছিল না। যেমন টাকাপয়সা ছিল, তেমনই পড়াশোনা।
শইফতা সাব যে কত ভাবে আমাকে সাহায্য করেছেন, তা হিসাব করে বলা যাবে না, ভাইজানেরা। আর আমার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়ে একমাত্র তিনিই আমার পাশে ছিলেন। খোদা কসম, তাঁকে আমার সত্যিই কবিতার আত্মা মনে হত, যার গায়ে এই দুনিয়ার কোনও কলঙ্কদাগ লাগেনি। এরই মধ্যে আগ্রায় আম্মিজান মারা গেলেন, ভাই ইউসুফ একেবারে উন্মাদ। আমি আর পেরে উঠছিলুম না। তাই আবারও নিজেকে নিয়ে বাজি ধরলুম। জুয়ার আড্ডা খুললুম আমার শয়তানের কামরায়। জুয়া তো আগেও খেলেছি, একবার সে জন্য একশো টাকা জরিমানাও দিতে হয়েছিল, কিন্তু এবার আমি স্থির নিশ্চিত, জুয়া থেকেই নসিব ফেরাতে হবে আমাকে। তখন অবশ্য দিল্লিতে জুয়া খেলা বন্ধ করার জন্য খুব কড়াকড়ি। আমি ভাবলুম, বড় বড় ইংরেজরা আমার দোস্ত, আমাকে ধরবে কে? এই ভাবনাই আমার কাল হয়েছিল, মান্টোভাই। দিনে দিনে জুয়ার আসর সরগরম হয়ে উঠল। হাতেও মাঝে মাঝে টাকা। আসছে। আমি নিজেকে মনে মনে বলি : হম্ কো মালুম হ্যয় জন্নৎ কী হকীকৎ লেকিন
দিল কে খুশ রখনে কো গালিব য়ে খয়াল আচ্ছা হ্যায়
(স্বর্গের খবরাখবর আমার জানা আছে, কিন্তু
মনকে আনন্দে রাখতে গালিব, এমন খেয়াল মন্দ নয়।)
৩০. রোজগার কম ছিল
তমাশা-এ গুলশন, তমান্না-এ চীদন্–
বহার-আফ্রীনা, গুনঙ্গার হৈঁ হম।
(ফুলবাগিচার রূপ দেখতে চাই, আবার ফুল তুলতেও চাই–
হে বসন্তের স্রষ্টা, আমার মন পাপী।)
রোজগার কম ছিল ঠিকই, তবে শফিয়ার সঙ্গে সংসারে বেশ মন বসে গেল আমার, মির্জাসাব। শফিয়া তো জান দিয়ে ভালবাসত আমাকে। সবচেয়ে বড় কথা, ও আমাকে বুঝতে চেয়েছিল। তাই প্রথম প্রথম আমার মদ খাওয়া নিয়ে আপত্তি থাকলেও, পরে মেনে নিয়েছিল। তবে সবসময় নজর, যাতে আমি বেশী না খেয়ে ফেলি। আমি যে কী সংসারী হয়ে গিয়েছিলাম। ভাইজানেরা, আপনারা কল্পনাও করতে পারবেন না। নিজে হাতে ঘর ঝাঁট দিতাম, জিনিসপত্র পুঁছে পুঁছে পরিষ্কার করতাম। এক-একদিন রান্নাতেও হাত লাগিয়েছি। রান্না করতে খুব মজা পেতাম, বিশেষ করে কাবাব বানাতে। মশলা আর মাংস পোড়ার গন্ধে নেশা ধরে যেত আমার। বাইরে তো বম্বের সিনেমা জগতের সঙ্গে আস্তে আস্তে জড়িয়ে পড়ছিলাম; সেই দুনিয়ায় ঢুকে পড়লে মনে হত আমি যেন আমির হামজা, কত যে অ্যাডভেঞ্চার আমার সামনে অপেক্ষা করে আছে। পাকিস্থান যাওয়ার পর বম্বের ফিল্মি দুনিয়ার এইসব রংবাহার মানুষদের নিয়ে লিখেছিলাম গাঞ্জে ফেরে। কোনও রকম সাজপোশাক না পরিয়ে, স্নো-পাউডার না-মাখিয়েই আমি এই মানুষগুলোর আসলি চেহারা দেখতে চেয়েছিলাম।তাতে কেউ কেউ আপত্তি করেছিল। কিন্তু যে-সমাজে কেউ মারা যাওয়ার পর তার কাজকর্মকে লন্ড্রিতে পাঠিয়ে খুব করে সাফাই করে দেখানো হয়, আহা কত শরিফই না ছিলেন মানুষটা, সে সমাজ গোল্লায় যাক। আমার মনে আছে, সাকী-তে ইসমতের দোজখি গল্প ছাপা হয়েছিল। এই গল্পে ইসমত ওর মৃত দাদা আজিম বেগ চুঘতাইকে একেবারে নগ্ন করে ছেড়েছিল। গল্পটা পড়ে আমার বোন ইকবাল বলেছিল, এ তো আজিব মেয়ে সাদাত। নিজের মরা ভাইকে পর্যন্ত রেহাই দেয়নি। গল্পে এ-সব কথা লেখা কি ঠিক?
আমি বলেছিলাম, ইকবাল, আমার মৃত্যুর পর তুমি যদি এমন একটা গল্প লিখতে পারো, খোদা কসম, আমি আজই মরতে প্রস্তুত।
-আমি তোমাকে নিয়ে লিখব? কী লিখব?
-তোমার সাদাত নরকের সবচেয়ে জঘন্য কীট।
-তুমি পাগল সাদাত। প্রিয় মানুষকে কেউ ওভাবে দেখতে চায়?
-প্রিয় মানুষকেই তো ওভাবে দেখানো যায় ইকবাল। তুমি তার পাপ-পূণ্য সব জানো। তুমি তার প্রতি কখনও অবিচার করতে পারো না। মানুষ কি শুধু ভাল-ভাল গুণের একটা পিণ্ড? তার ভেতর কোন ফাটল নেই?
-তুমি লেখক, তুমি এভাবে ভাবতে পারো।
-না ইকবাল। তুমিও এভাবেই ভাবো। শুধু সত্যিটা দেখতে ভয় পাও। একদিন তোমাকে সিতারার গল্প বলব। আমি মনে করি, পৃথিবীতে একশো বছরে ওইরকম এক মেয়ে জন্মায়। অথচ চারদিকে ওর কত বদনাম। সবাই মনে করে, সেক্স ছাড়া ওর জীবনে আর কিছু নেই।
না, না, ভাইজানেরা অমন চনমনে হয়ে উঠবেন না, সিতারার কিস্সা আমার হাতের একটা। লুকোন তাস, পরে দেখাব। সেই বাঘিনীর গল্প কী এত তাড়াতাড়ি বলতে হয়? দোজখে আরও কতদিন পচতে হবে আমাদের, হাতে কত সময়। তখন সিতারা আসবে, নাসিম বানু আসবে, নার্গিস, নূরজাহান-রা আসবে। শুধু একটু ধৈর্য ধরতে হবে ভাইজানেরা। এ-সব কতদিন আগের কথা, সাল তারিখ সব ভুলে গিয়েছি, মনে হয় যেন, দীর্ঘদিন ধরে এক লম্বা স্বপ্নে ওদের দেখেছিলাম আমি। কিন্তু এখন ক্ষমাঘেন্না করে এই মান্টো হারামির জীবনের দুএকটা কথা শুনুন।
মুসাওয়ার কাগজে কাজ করতে করতেই বাবুরাও প্যাটেল আমাকে একটা সিনেমার চিত্রনাট্য উর্দুতে অনুবাদ করতে দিয়েছিলেন। প্রভাত স্টুডিও সিনেমাটা তৈরি করবে। বম্বের সিনামা দুনিয়ায় এভাবেই আমি পা রেখেছিলাম। একদিন নাজির লুধিয়ানভিসাব-মুসাওয়ার-এর মালিক-ইমপেরিয়াল ফিল্ম কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিলেন। সিনামার জন্য সংলাপ লিখে দিতে হবে; মাসে চল্লিশ টাকা করে পাব। ভাবলাম, এবার তাহলে কপাল খুলল। কিন্তু লুধিয়ানভিসাব আমার মাইনে কমিয়ে চল্লিশ থেকে কুড়ি টাকা করে দিলেন। ব্যাপারটা বুঝলেন? একদিক থেকে পাইয়ে দিলেন, অন্য দিক থেকে কেড়ে নিলেন। আমার মাসে রোজগার দাঁড়াল ষাট টাকা। তবে ইমপেরিয়াল ফিল্ম কোম্পানির তখন যা অবস্থা, প্রতি মাসে ঠিক মত টাকা দিতে পারত না। আমি মাঝে মাঝে আগাম টাকা নিয়ে নিতাম। বেশীদিন। কাজটা টিকল না। লুধিয়ানভিসাবের চেষ্টাতেই ফিল্ম সিটিতে মাসে একশো টাকা মাইনের চাকরি পেয়ে গেলাম। কত যে ফিল্ম কোম্পানিতে তখন কাজ করেছি, যা টাকা হাতে আসে। কিন্তু মুসাওয়ার-এর চাকরি ছাড়িনি। মুসাওয়ার-ই তো আমকে বম্বেতে নিয়ে এসেছিল। শেষ পর্যন্ত লাথিটা মারলেন লুধিয়ানভিসাবই। কোনও কারন না জানিয়েই আমাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হল। পায়ের তলার মাটি সরে গেল ভাইজানরা। ফিল্ম কোম্পানিতে তো আজ আছি, কাল নেই। বরখাস্তের চিঠি নিয়ে সরাসরি দেখা করলাম বাবুরাও প্যাটেলের সঙ্গে। বাবুরাওজি তার কারবা পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে আমাকে চাকরি দিতেও রাজি হয়ে গেলেন। বাবুরাওজি তাঁর সেক্রেটারি রিটা কারালাইলকে ডেকে পাঠালেন। শুনেছিলাম, রিটা তার সেক্রেটারি, স্টেনো, প্রেমিকা-সবকিছুই। রিটা ঘরে ঢুকতেই বাবুরাওজি বললেন, কাছে এসো।
