-বাবা- কাল্লু ফকিরসাবের পা চেপে ধরে।
-বোলো বেটা।
-আউর এক কিস্সা শুনাইয়ে বাবা।
কাল্লু ফকিরসাবের সঙ্গে কিস্সায় মজে গেল; আমি গিয়ে ঢুকলুম আমার কুঠুরিতে, শয়তানের সেই কামরা। তবে কি জানেন, মান্টোভাই, স্বেচ্ছাবন্দিত্বের দিনগুলিতে নিজের জন্যই কিছু কাজও করে উঠতে পারলুম। উর্দু দিবানকে নতুন করে গুছিয়ে তুললুম। কত গজলই যে বাদ দিয়েছি। নতুন করে পড়তে গিয়ে দেখলুম, অনেক গজলই দিবানে রাখা যায় না। ফজল-ই হক সাহেব ঠিকই বলেছিলেন, অনেক গজলেই ফারসি প্রভাব ছিল, সহজে বোঝা যায় না। আর আমি এতদিনে বুঝতে পেরেছি, যে গজল হিসাবে তার শিল্প মূল্য নেই। আসলে কী জানেন মান্টোভাই, কম বয়েসে গয়না, সাজপোশাকের দিকে বড় ঝোঁক থাকে মানুষের; নিজেকে দেখানোর জন্য সে অনেক জবরজং করে সাজে। কিন্তু সৌন্দর্য যতদিন না ভিতর থেকে ফুটছে, ততদিন শান্তি কোথায় বলুন? আমার ফারসি রচনা সংকলনের কাজও করে উঠতে পারলুম এই সময়েই। পাঁচ খণ্ডের সংকলন তৈরি হল। পাঁচ নম্বর খণ্ডে রেখেছিলুম বন্ধুদের কাছে লেখা আমার চিঠিপত্র। নাম দিয়েছিলুম পৰ্জ আহঙ্গ। সে সব চিঠি পড়লে খুবই মজা পেতেন। আর একটা ব্যাপার কি জানেন? নিজের লেখা ফারসি গদ্য পড়ে আমিই চমকে উঠতুম; নিজের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলতুম, মাশাল্লা, কেয়া লিখা মিঞা, বহুৎ খুব। হাসছেন কেন মান্টোভাই? আপনি কখনও এভাবে নিজের পিঠ চাপড়াননি? কোনও কোনও গল্প লিখে মনে হয় নি, আর ভাই, এ চিজ আমার ভিতরে কোথায় ছিল? ভিতরে ভিতরে এতদিন ধরে একে আমি বহন। করেছি? এতে দোষের কী আছে, মান্টোভাই? শিল্পী নিজেকে এইটুকু দিতে পারবে না? নিজের প্রতি এই সামান্য মুগ্ধতা তো সারাজীবন বাঁচিয়ে রাখতে হয়।
আলিফ বেগকে লেখা আমার লেখা খ-এর কথা বলি, ভাইজানেরা, শুনে মজা পাবেন। বেশি বয়েসে আলিফ সাবের এক ছেলে হয়েছিল। আমাকে চিঠি লিখে অনুরোধ করলেন, মিঞা, আমার ছেলের জন্য একটা নাম বেছে দিন। তো আমি তাঁকে লিখে পাঠালুম, আপনার ছেলের নামের জন্য আমাকে একটুও ভাবতে হল না, এক ফোঁটা সময় খরচ হল না। নামটা মাথায় খেলে যেতেই আমি একটা কবিতাও লিখে ফেললুম।
বৃদ্ধ বয়েসে আলিফের এক
অপরূপ পুত্র জন্মেছে।
তার নাম দিলাম হজ্জা
এ তো সকলেই জানে।
বয়সকালে সব আলিফ হাই হয়।
তাই হয় না কি না, বলুন ভাইজানেরা? আলিফ একটা সোজা দাগ আর হজ্জা কুঁকড়ে যাওয়া দাগ। বয়স হলে সব মানুষই কুঁকড়ে হমজা হয়ে যায়।
এভাবেই আমার শয়তানের কামরায় বসে চিঠি লিখে, মজা করে দিনগুলোকে কোনওমতে পার করে দিচ্ছিলুম। এরই মধ্যে আবার এই ইংরেজ পাওনাদার, লোকটার নাম ম্যাকফারসন, কোর্ট থেকে অর্ডার বার করল, আমাকে আড়াইশো টাকা ফেরত দিতে হবে। এমন নসিব আমার, সেইসময় একদিন হঠাৎ বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলুম আর সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজের সেপাই এসে আমাকে গ্রেফতার করল। জেলেই যেতে হত; লোহারুর নবাব, আমার দোস্ত আমিনুদ্দিন ভাই এসে বাঁচালেন। আমার হয়ে চারশো টাকা দিয়ে তিনি ব্যাপারটা ফয়সালা করলেন। একে কি মানুষের মতো বাঁচা বলে, ভাইজানেরা? কতদিন একটা কুঠুরিতে নিজেকে আটকে রাখা যায়? আর বাইরে এলেই আপনার জন্য অপেক্ষা করে আছে কয়েদখানা। তবু হাসতে হাসতে নিজেকে বলেছি:
রঞ্জ সে খু গর হুয়া ইনসাঁ তো মিট যাতা হ্যয় রঞ্জ
মুশকিলেঁ ইতনি পড়ীঁ মুঝ পর কে আসাঁ হো গঁয়ে
(দুঃখে অভ্যেস হয়ে গেলে দুঃখ ঘুচে যায়
কষ্ট এত পেলাম যে সহজ হয়ে গেল।)
.
শামসউদ্দিনের ফাঁসির পর ফিরোজপুর-ঝিরকার নবাবি বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। আমি পেনশন পেতাম ইংরেজ বাহাদুরের কাছ থেকে। বাষট্টি টাকা আট আনা-ই। ওই আট আনা আমার আর পেছন ছাড়লো না, মান্টোভাই। আমার নসিবে সব কিছু আট আনাতে ধার্য; ষোলো আনা কোনও দিন পেলাম না। এত দুর্দশার মধ্যেও কিছু কিছু মানুষের সান্নিধ্য আমাকে বাঁচিয়ে। রেখেছিল। ফজল-ই-হক সাব দিল্লি থেকে চলে যাওয়ার পর আমার বুকের ভেতর যেন একটা ইমারতই ভেঙে পড়ল। তাঁর মতো বুজুর্গ আদমি সারা শাহজাহানাবাদে আর কজন ছিল বলুন? যেমন তার পাণ্ডিত্য, তেমনই মানুষকে অনুভব করতে জানতেন। যে-পদে তিনি চাকরি করতেন, তাঁর মতো যোগ্যতার মানুষের জন্য সে পদ নয়। তবু চাকরি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ইংরেজরা অপমান করার সুযোগ পেলে তো ছাড়ে না। সুযোগেরও দরকার হয় না, ওরা সবসময় আমাদের দিকে অনেক ওপর থেকে তাকায়; ভাবে পিঁপড়ে বা পোকামাকড় দেখছে। তাই পায়ে দলে যেতে এক মুহূর্ত ভাবে না। সেভাবেই অপমান করা হল ফজল-ই-হক সাহেবকে। তিনি তো ইমানদার মানুষ; ইস্তাফা দিলেন। তবে বসে থাকার মানুষ তো আর নন। নবাব ফৈজ মহম্মদ খান পাঁচশ টাকা মাসোহারা দিয়ে তাঁকে নিজের রাজ্যে নিয়ে গেলেন। আমি পড়ে রইলুম ভগ্নহৃদয় নিয়ে। এও জানি, ফজল-ই-হক সাহেবও অনেক কান্না বুকে। নিয়েই দিল্লিকে বিদায় জানিয়েছিলেন। এমনকী জাঁহাপনা বাহাদুর শাহ নিজের গায়ের শাল খুলে তাঁকে পরিয়ে দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলেছিলেন, আপনি যখন আলবিদা বলবেন, আমি জানি, আমার কিছু করার নেই। কিন্তু আমাকে যখন খুদা হাফিজ বলতে হবে, তখন খোদাই শুধু জানবেন, এই শব্দ দুটো উচ্চারণ করতে আমি কত যন্ত্রণা পেয়েছি। মান্টোভাই, আমার প্রিয় দোস্ত, আমার গজলের সমঝদার অপমান মাথায় নিয়ে শাহজাহানবাদ ছেড়ে চলে গেলেন।
