ফ্রেজারসাবকে হত্যার অপরাধে সহিস করিম খানকে গ্রেফতার করা হল। করিম খান ছিল। শামসউদ্দিনের কর্মচারী। দিল্লির ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে আমার দোস্তি ছিল। মাথায় ঋণের দায়, দিনের বেলা হাভেলি থেকে বেরুতে পারতুম না। ফ্রেফতারের ভয়ে, রাতে প্যাঁচার মত উড়ে যেতুম ম্যাজিস্ট্রেটসাবের বাড়িতে। ফ্রেজারসাবের খুনের বিষয় নিয়েও কথাবার্তা হত। শামসউদ্দিনের সম্পর্কে আমি কখনও কিছু বলিনি। কিন্তু তদন্তে জানা গেল, শামসউদ্দিনই ফ্রেজারসাবকে খুন করার জন্য করিম খানকে কাজে লাগিয়েছিল। শাহজাহানাবাদের রাস্তায় প্রকাশ্যে দুজনের ফাঁসি হয়েছিল। আমি ফাঁসি দেখতে যাইনি; শুনেছি ফাঁসি দেখার জন্য ভিড় উপচে পড়েছিল। মানুষের নিষ্ঠুরতার সীমা নেই, মান্টোভাই। সেই প্রথম বুঝলাম, ইংরেজও একইরকম বর্বর। কী জানি, হয়তো সভ্যতার ইতিহাসই আরেকরকম ভাবে বর্বরতার ইতিহাস।
এরপরই শাহজাহানাবাদে শুরু হল আমার সম্পর্কে গালিগালাজ। আমিই নাকি শামসউদ্দিনকে ফাঁসিতে চড়ানোর জন্য দায়ী। কেউ বুঝল না, যে বীজ তুমি জমিতে বুনবে, তার ফসলই তো তোমাকে তুলতেই হবে। এমনকী উমরাও বেগমও একদিন এসে আমাকে জিজ্ঞেস করল, মির্জাসাব, আপনিই শামসউদ্দিনের ভাইয়ের কথা ম্যাজিস্ট্রেটকে বলেছেন?
-তুমি বিশ্বাস করো বেগম?
-মহল্লার পর মহল্লা সবাই এক কথা বলছে।
-সবাই বললেই সত্যি?
-আমি জানি
-কী?
-আপনি এ-কাজ করতে পারেন না।
-তবু আমাকে জিজ্ঞেস করতে এলে?
-গোস্তাকি মাফ করবেন।
-শামসউদ্দিন আমার যতবড় শত্রু হোক, আমি তার মওত চাইতে পারি?
-আমি ভুল করেছি মির্জাসাব।
-বেগম, অনেক মানুষের কথার মধ্যে সত্যি থাকে না। সত্য শুধু একজনের, একা মানুষের। অনেক মানুষের মতামত মানেই তা মিথ্যে।
-আমাকে মাফ করুন, মির্জাসাব।
আমি উমরাও বেগমের হাত ধরে বসে রইলুম। এ যেন নতুন করে ভালবাসা। তার ভিতরে মরে যাও আসাদ। তোমার পথ অন্য দিকে। আকাশ হও, কুঠার দিয়ে কারাগারের দেওয়াল ভাঙো। পালাও। রং-রঙের ভিতরে জন্ম নাও, এখনই। মরো, আর চুপ করে থাকো। নীরবতা মানেই তুমি মরে গেছ। পুরনো জীবনে তুমি শুধু নীরবতা থেকে দৌড়ে পালিয়েছ। দেখো, নির্বাক চাঁদ এবার আকাশে ফুটে উঠেছে।
ভাইজানেরা, আমিই শামসউদ্দিনের খুনি, এই ছাপ্পা লেগে গেল আমার গায়ে। বেশ কয়েক বছর শামসউদ্দিনের সমাধি হয়ে উঠেছিল দিল্লির মানুষদের তীর্থযাত্রার জায়গা। আর সিপাহি বিদ্রোহের সময় অনেক ব্রিটিশের সমাধি অটুট থাকলেও ফ্রেজারসাবের সমাধি খুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। মানুষ আসলে ব্যাক্তিকে তার নিজস্বতাকে দেখে না -কোনও না কোন জাত দিয়ে বিচার করে।
ইংরেজরাও এভাবেই আমাদের মুসলমানদের সবসময় সন্দেহের চোখে দেখেছে, আর হিন্দুদের দেখেছে অন্য চোখে। কেন জানেন? রেনেসাঁসের ধ্বজা তো তুলে ধরেছিল হিন্দুরা কলকাতার বাঙালি হিন্দুরা। মান্টোভাই এরা বেশির ভাগ সব সুদখোর মহাজন ছাড়া আর কিছু নয়। সিরাজউদ্দিনসাব তো কলকাতা থেকে আমাকে অনেক চিঠি লিখেছে, আমিও উত্তর দিতুম, তো তাঁর চিঠি পড়তে পড়তে আমি বুঝেছিলুম, কলকাতা আসলে একটা দো-আঁশলা শহর; রাজধানী বলে কথা, শিক্ষা-সংস্কৃতি, সবকিছুরই জোয়ার বয়ে যাচ্ছে, কিন্তু নিধুবাবুর গানের প্রাণ আর সেখানে নেই।
প্রাণ শাহজাহানাবাদেও ছিল না। কোনক্রমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা দরবার। ইংরেজরা সব গ্রাস করে নিচ্ছে। মান্টোভাই, ওরা তো হাঙরের মতো খায়। কালু একদিন এক ফকিরকে নিয়ে। হাজির হল দিবানখানায়। ফকিরসাব অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
-কী দেখছেন? আমি জিজ্ঞেস করলুম।
-সামনে খুব খারাপ সময়, মিঞা।
-আর কত খারাপ সময় আমার জীবনে আসবে?
-আপনার কথা বলছি না।
-তা হলে।
শাহজাহানাবাদ কারবালা হয়ে যাবে, মিঞা।
আমি হেসে বললুম, আমার ভেতরে সেই কারবালা দেখতে পেলেন না কি?
-ঠিক তাই। আমি আপনার ভিতরে পুরো শাহজাহানাবাদকে দেখতে পেলাম মিঞা। এ শহরের সব পুরোনো হাভেলি, মসজিদ ভেঙে পড়ছে। রাস্তায় রাস্তায় ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে লোকদের। বেগমরা সব ছেঁড়া কাপড় পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছাগলের পেট থেকে জন্ম হচ্ছে সাপের বাচ্চার। আমি হা-হা করে হেসে উঠি। – এসব কবে হবে ফকিরসাব?
-হবে, হবে। আপনি তা দেখেও যাবেন, মিঞা।
-আর আমার কী হবে?
-আপনি তখন ইনসানে কামিল হয়ে যাবেন।
-হাসালেন ফকিরসাব। আমার মধ্যে ইনসানিয়াতই নেই।
ইনসানিয়াত নিয়ে কেউ পয়দা হয় না, মিঞা। আগুনে পুড়তে পুড়তে তবেই না হকিকায় পৌঁছবেন। আসুন একটা কিস্সা বলি।
কাল্লু যেন লাফিয়ে ওঠে। -হ্যাঁ, হ্যাঁ কিস্যা হোক বাবা। কালু ফকিরের গা ঘেঁসে বসে।
-শিষ্যদের দীনের কথা বলতে বলতে শাল আবদুল্লা একদিন ভরে পড়লেন। তার চোখ লাল, ঘন ঘন মাথা নাড়ছেন, তার সঙ্গে খিচুনি,। পরদিন ইবন সালিম জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছিল আপনার মুর্শিদসাব? আবদুল্লা হেসে বললেন, তুমি যা ভাবছ তা নয়। কোনও শক্তি আমার। মধ্যে প্রবেশ করছিল না। বরং ওটা আমার দুর্বলতা। অন্য এক শিষ্য জিজ্ঞেস করলেন, এটা যদি দুর্বলতা হয়, তা হলে শক্তি কী? আবদুল্লা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, শক্তি যখন ভেতরে প্রবেশ করে, শরীর মন তখন একেবারে শান্ত হয়ে যায়। কিছু বুঝলেন, মিঞা? সেই মানুষই হচ্ছে ইনসানে কামিল।
