হ্যাঁ, মান্টোভাই, ফুলেরা বড় নিষ্ঠুর, ওরা কারুর খোঁজ রাখে না, নিজের খুশবুতেই মাতাল হয়ে থাকে। কেন বলুন তো? দু-একদিনের জন্ম বলে? বড় তাড়াতাড়ি ঝরে যায় বলে? আমরাও তো ঝরে যাই, হয়তো ফুলের চেয়ে কিছু বেশীদিন দুনিয়াতে থাকি, তবু আমরা তো ফুলের কাছে গিয়ে দাঁড়াই, তাকে আদর করি, ফুল কিন্তু আমাদের দিকে ফিরেও তাকায় না। ফুলজন্ম পেতে ইচ্ছে করে না আপনার, মান্টোভাই? সারা রাত একা একা নিজের সৌরভ নিয়ে ফুটে থাকা, তারপর ভোরবেলা ঝরে যাও। আহা, খোদার কী অপূর্ব সৃষ্টি-এই ফুলজন্ম-যেন একটা স্বর জেগে উঠেই অন্য স্বরের ভিতর হারিয়ে গেল। কেমন জানেন এই ফুলজন্ম? যেন মিঞা তানসেনের গলা থেকে সুরের একটা দানা গড়িয়ে পড়ল -জন্ম-মৃত্যু সব একাকার ওই দানার। ভিতরে, কিন্তু সারা জীবনেও তাঁকে আপনি ভুলতে পারবেন না। বুড়ো হয়ে যখন পিছন দিকে তাকিয়ে দেখছি, চহরবাগের সে বেগম ফলক আরাকে সুরের একটা দানা বলেই মনে হত আমার, হয়তো কোনও তবায়েফের গলা থেকে গড়িয়ে পড়েছিল, তারপর হারিয়ে গেছে, শুধু মৃত নক্ষত্রের মতো তার আলো জেগে আছে। আর সেই ফুলজন্মের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমি জরাগ্রস্থ হয়ে গেলুম।
হোশ ও সব্র্ ও খয়র ও দীন ও হবাস ও দিল ও তাব
উসকে এক আনেমেঁ কেয়া কেয়া নহ্ গয়া মৎ পুছো।
সে এসেছিল শুধু একবার, মান্টোভাই। তার এই আসাতেই আমার কী কী চলে গেল জানতে চাইবেন না। আমার শান্তি ও ধৈর্য, শক্তি ও স্বাস্থ্য, যৌবন ও উদ্যম, আরও কত কীই যে চলে গেল। সে আমাকে কী দিয়ে গেল? জুনুন। মধ্যরাত্রি চিরে হারিয়ে যাওয়া পুকার। ওই দেখুন, সেই পুকার বয়ে নিয়ে যাচ্ছে মির্জা গালিবের একটা এতিম শেরকে :
ইশক সে তবিয়ৎ নে জিস্ত কা মজা পায়া
দর্দ কি দাবা পায়ি, দর্দ-ই লাদওয়া পায়া।
হ্যাঁ, ভাইজানেরা, জীবনের কত আনন্দকেই তো নিয়ে এসেছিল ভালবাসা, কত যন্ত্রণার দাওয়াই পেয়েছিলুম, কিন্তু এমন এক যন্ত্রণা সে রেখে গেল, হায় খোদা, তার কোন দাওয়াই তোমার কাছেও নেই। কেন নেই? খোদা খুদ এক দর্দ হয়। যত বয়স বেড়েছে, মান্টোভাই, আমার মনে হয়েছে, আল্লাই আসলে আদিম বেদনা। আশ শহিদ। বেদনা ছাড়া কেই বা আমাদের জীবনের সাক্ষী হতে পারে বলুন?
না, না, উশখুশ করবেন না, ভাইজানেরা, আমার মনে আছে ফ্রেজারসাবের খুনের বৃত্তান্তটা আপনাদের বলতে হবে। আসলে কী জানেন, নিজের জীবনের কথা আর বলতে ইচ্ছে করে না, নিজেকে যত মুছে দেওয়া যায়, ততই শান্তি। একসময় যে গজল লেখা ছেড়ে দিয়েছিলুম, তা দুঃখ দারিদ্রের চাপে নয়, কে আমার লেখা পড়বে, তা ভেবেও নয়; মনে হয়েছিল, এবার নিজের সঙ্গেই কথা বলার সময়; হ্যাঁ মান্টোভাই, বিশ্বাস করুন, আমি নিজের হাতে আমার শিল্পকে হত্যা করেছিলুম শুধু বেদনার পায়ে কদমবুশি করার জন্য। আমি বিশ্বাস করি, মান্টোভাই, শিল্পিকে তার জীবনের সেই মুহূর্তটি খুঁজে নিতে হবে, যখন সে তার শিল্পকে হত্যা করবে। আসলে এই দুনিয়াতে সে কেন এসেছে? না, কিছু সৃষ্টি করার জন্য নয়। আল্লার পর আর কারুর কিছু সৃষ্টি করার নেই। আমরা তার সৃষ্টিকে নকল করতে পারি মাত্র। আমরা শুধু পারি, জীবনকে ছুঁয়ে থাকতে। খোদার এই দানের তুলনা নেই, মান্টোভাই। কলকাতা থেকে ফেরার পথে এক বৃষ্টির দিনে আমি একটা নিঃসঙ্গ টিলা দেখেছিলুম। সবুজ প্রান্তরের মাঝে দাঁড়িয়েছিল টিলাটি, আর তার পায়ের কাছে ছড়িয়ে আছে শ্যাওলা-ঢাকা অনেক সমাধি। আমি কেঁদে ফেলেছিলুম। জীবন এত নিঃসঙ্গ, এত সুন্দর, এত বর্ষার আদরে স্নাত। গভীর রাতে এক সুফি সাধক কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, এই দুনিয়ার বন্ধ কফিনের ভিতরে কত ভুল আর অজ্ঞানতা নিয়েই না আমরা বেঁচে আছি, শুনতে পাচ্ছ তোমরা? মৃত্যু এসে যখন কফিনের ডালা খুলবে, ডানাওয়ালা উড়ে যাবে অনন্তের পথে, আর যাদের ডানা নেই, তারা কফিনেই আটকে থাকবে। দোস্ত, কফিনের ডালা খোলার আগেই এমন কিছু করো যাতে পাখি হতে পারো, ডানা গজাও, হাত দুটোকে যত তাড়াতাড়ি পারো ডানা বানিয়ে ফ্যালো। সব শুনেছি মান্টোভাই, তবু আমার ডানা গজাল না, একদিন মুখ থুবড়ে মরে পড়ে রইলুম শাহজাহানাবাদের খণ্ডহরে।
উতলা হবেন না, ভাইজানেরা এই বুড়োকে একটু নিজের মতো করে কথা বলেতে দিন। কথা দিচ্ছি, কোনও কিস্সাই বাদ পড়বে না। তো এক রাতে ফ্রেজারসাব খুন হয়ে গেলেন। কাশ্মীরি গেটের কাছে গুলি করে মারা হল হয়েছিল তাঁকে। খবরটা শুনে আমি পাথর হয়ে। গিয়েছিলুম। ফ্রেজারসাব দিল্লির রেসিডেন্ট ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে আমার দোস্তিরই সম্পর্ক ছিল বলতে পারেন। গোরাদের মধ্যে আলাদা ধাতের মানুষ ছিলেন। যাদের সঙ্গে চাকরি করতেন, তাদের একেবারেই পছন্দ করতেন না। আমাদের দেশটাকে জানতে চেয়েছিলেন, নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করতেন না। তাঁর কিতাবখানা থেকে কত বই এনে পড়েছি। সেখানে বসে কত যে গল্প হয়েছে ফ্রেজারসাবের সঙ্গে। তিনিই আমাকে প্রথম সুফি সাধক জামি-র এক আশ্চর্য কথা শুনিয়েছিলেন মান্টোভাই। কথাটা বলি, ভাইজানেরা? জামি বলেছিলেন, মানুষ কে? সেই নূরের প্রতিফলন। আর এই দুনিয়া? অনন্ত সমুদ্রের একটা ঢেউ। নূর থেকে কি প্রতিফলন আলাদা করা যায়? সমুদ্র থেকে ঢেউকে আলাদা করা যায়? শুনে রাখো, এই প্রতিফলন ও ঢেউই নূর আর সমুন্দর। ফ্রেজারসাবের সঙ্গে দোস্তির আর একটা কারণও ছিল। সম্পত্তির ব্যাপারের মামলায় শামসউদ্দিনের বৈমাত্রেয় ভাই আমিনুদ্দিন ও জিয়াউদ্দিনকে সাহায্য করতেন তিনি। আর আমি তো শামসউদ্দিনের চোখের বিষ ছিলুম।
