-অদ্ভুত ইচ্ছে।
-হ্যাঁ।
ব্রিজমোহন ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। অনেকক্ষণ পর ফিরে আসে। আমি জিগ্যেস করি, কোথায় গিয়েছিলে?
-আকাশ দেখতে। মান্টোভাই, রাত্তিরবেলা আমি বেশিক্ষণ শুয়ে থাকতে পারি না। খোলিতে দম বন্ধ হয়ে আসে। তাই আকাশ দেখতে যাই।
-কী দেখ, ব্রিজমোহন?
-কিছু না।
-তারা দেখ?
-অন্ধকার নীল দেখি শুধু, মান্টোভাই, তার ভেতরে আমার অদ্ভুত ইচ্ছেরা ফুটে আছে। আগের রোববারেই পেরিনের একটা ফটো তুলেছি। ফটোটা ওর লাভার নিজের নামে একটা কম্পিটিশনে পাঠাবে। আমি শিওর ছবিটা প্রাইজ পাবেই।
-লোকটাকে তুমি চেনো?
-না। এর আগেও কতবার আমার তোলা পেরিনের ছবি পাঠিয়ে লোকটা প্রাইজ পেয়েছে।
-পেরিন তোমাকে কিছু বলেনি?
-না।
এক রবিবার বান্দ্রা থেকে ফিরে এসে ব্রিজমোহন বলল, এবার সত্যিই সব শেষ করে এলাম, মান্টোভাই। কয়েকদিনের মধ্যে চাকরি জোগাড় করব। শেঠ নিয়াজ আলি নতুন সিনেমা তৈরি করছে। শেঠের ঠিকানাটা জোগাড় করে দিতে পারো?
-দেখি।
এক বন্ধুকে ফোন করে শেঠ নিয়াজ আলির ঠিকানা পাওয়া গেল। পরদিন ব্রিজমোহন শেঠের সঙ্গে দেখা করতে গেল। ফিরে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল। কাজটা পেয়ে গেলাম, মান্টোভাই। মাসে দুশো টাকা দেবে। তবে খুব তাড়াতাড়ি মাইনে বাড়াবে বলেছে। খুশি তো?
-তুমি খুশ হলে আমিও খুশ।
-ওঃ বাঁচা গেল। ব্রিজমোহন বিছানায় ঝাঁপ দিল।
পরদিন ওকে জিজ্ঞেস করলাম, পেরিনের সঙ্গে দেখা করতে যাবে না?
ব্রিজমোহন মিটিমিটি হেসে বলল, ইচ্ছে তো করছে। কিন্তু না, মান্টোভাই, এবার আর তাড়াহুড়ো নয়। কয়েকটা নতুন জামা প্যান্ট কিনতে হবে। এই যে -এই যে -পঞ্চাশ টাকা অ্যাডভান্স পেয়েছি। তুমি পঁচিশ টাকা রাখো।
-কেন?
-ধার শোধ।
এরপর দিনগুলো খারাপ কাটছিল না, মির্জাসাব। আমি শখানেক টাকা রোজগার করি। ব্রিজমোহন অবশ্য আমার দ্বিগুন পায়। টাকার খুব একটা অভাব ছিল না। খোলির জীবনে বেশ যথেষ্টই বলা যায়।
মাস পাঁচেক পরে ব্রিজমোহনের নামে একটা চিঠি এল। খামের ওপর চোখ বুলিয়ে সে বলল, মওত কা রানি। আমি বুঝলাম, পেরিনের চিঠি।
ব্রিজমোহন হাসতে হাসতে চিঠি খুলল। চিঠি পড়ে সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, রোববার দেখা করতে বলেছে। জরুরি দরকার।
-তুমি যাবে?
ব্রিজমোহন লাফিয়ে উঠল। -যাব না? মান্টোভাই, তুমি কী করে ভাবলে, পেরিন ডাকলে আমি যাব না?
নতুন একটা হিন্দি সিনেমার গান শিস দিতে দিতে ব্রিজমোহন বিছানায় বসে পা নাচাতে থাকল। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, পেরিনের কাছে আর গিয়ে কাজ নেই ব্রিজমোহন। ওর সঙ্গে দেখা করে আসার পর কত কষ্ট করে তোমাকে প্রতি রোববার আট আনা দিই, তুমি ভাবতে পারবে না।
ব্রিজমোহন হা- হা করে হেসে উঠল। আমি জানি। মান্টোভাই, সেইসব দিন আবার ফিরে আসছে, তবে তুমি কোথা থেকে প্রতি রোববার আমাকে আটা আনা দেবে, কে জানে!
পরদিন সকালেই পেরিনের কাছে চলে গেল ব্রিজমোহন। রাতে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কী বলল পেরিন?
-কিছুই না।
-জরুরি দরকার লিখেছিল।
-ওইরকম লেখা ওর অভ্যেস। সবসময় বোধহয় ভয় পায়।
-কেন?
-কে জানে। তবে আমি ওকে বলে এসেছি, এই নিয়ে বারো বার তোমার জন্য আমি ছাটাই হব। জরাথুস্ট্র তোমাকে বাঁচিয়ে রাখুন।
-পেরিন কী বলল?
-তুমি একটা বুরবাক।
-ঠিক। আমি হেসে বললাম।
-একশোবার ঠিক। ব্রিজমোহন হেসে উঠল। -কাল অফিসে গিয়েই আমি ইস্তাফা দেব।
-কেন?
-ওরা যাতে বরখাস্ত করতে না পারে। পেরিনের ঘরে বসেই ইস্তাফার চিঠি লিখে এনেছি।
সে আমার হাতে চিঠিটা ধরিয়ে দিল।
পরদিন সকাল-সকাল ব্রিজমোহন বেরিয়ে গেল। রাতে ফিরে দেখি, সে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এবার কার কাছে চাকরি চাইতে যাবে?
-কেন? ব্রিজমোহন উঠে বসল।
-পেরিনের দয়া পাওনি?
ব্রিজমোহন কথা না বলে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি দেখলাম তার দুচোখে জলের পর্দা দুলছে। ফ্যাসফেসে গলায় সে বলল, শেঠ নিয়াজ আলির হাতে ইস্তাফার চিঠি দিয়েছিলাম, মান্টোভাই। কিছুক্ষণ পরে শেঠ আমাকে একটা চিঠি দিলেন। আমার মাইনে দুশো থেকে বাড়িয়ে তিনশো করা হয়েছে। মির্জাসাব, সেইদিনের পর থেকে পেরিনের প্রতি আর কোনও আগ্রহ ছিল না ব্রিজমোহনের।
একদিন সে আমাকে বলেছিল, পেরিনের অভিশাপ যখন নেই, মান্টোভাই, পেরিনও আর নেই। আমার জীবনের সব রং হারিয়ে গেল। এখন আমি কার জন্য কাজ ছেড়ে দেব বলতে পারো?
সেদিন প্রথম আমি পেরিনকে দেখতে পেলাম। আরবসাগরের বেলাভূমিতে ঘুমিয়ে পড়েছে পেরিন। অদূরে সমুদ্রের ঢেউয়ে ভাসছে একটা অন্ধকার জাহাজ। মির্জাসাব, বম্বে এমনই এক অলীক মানুষদের শহর।
২৯. কলকাতা থেকে ফেরার পর
রাহগুজর সৈল-এ হদিস হ্যয় বেবুনিয়াদ দহর্।
ইস খাবেবেমেঁ নহ করনা ফি তুম্ তামীরকা।
(ভিত্তিহীন এই জগতে তো কেবল এলোমেলো ঘটনার পরম্পরা,
এই ভাঙনের মধ্যে কিছু গড়ে তুলবার ভাবনা রেখো না মনে।)
কলকাতা থেকে ফেরার পর সতেরোটা বছর আমার কোনও না কোনওভাবে কয়েদখানাতেই কেটে গেল, মান্টোভাই। সব সময় মীরসাবের কথা মনে পড়ত। একটা অন্ধকার কুঠুরিতে তাঁকে হাত -পা বেঁধে বন্দি করে রাখা হয়েছে। আর মীরসাব বিড়বিড় করে বলে চলেছেন :
পত্তা পত্তা বুতা বুতা হাল হামারা জানে হ্যায়
জানে না জানে, গুল্ হি না জানে, বাগ তো সারে জানে হ্যায়।
