-মানে?
-মান্টোভাই, আগে তোমাকে কখনও বলিনি। আসলে পেরিন আমার জীবনের কুফা। ওর সঙ্গে যখনই রেগুলার দেখা করি, আমার কোনও কাজ থাকে না। ওই কথাটাই আজ পেরিনকে বলেছি।
-শুনে কী বলল?
-বলল, তা হলে আর দেখা কোরো না। দ্যাখো কোনও চাকরি পাও কি না। তুমি ভাবো, আমার জন্য কাজ পাও না, আসলে দোষ তোমারই। তুমি কাজ করতে চাও না।
-তুমি কী বললে?
-ওসব কথা বাদ দাও, মান্টোভাই। কাল আমি একটা কাজ জোগাড় করবই। তুমি শুধু কাল সকালে আমাকে চার আনা দিও। আমি শেঠ নানুভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে যাব।
শেঠ নানুভাই ছিলেন সিনেমা পরিচালক। আগেও অনেকবার তিনি ব্রিজমোহনকে কাজ দেননি। তবু পরদিন সকালে আমি ব্রিজমোহনকে বাসভাড়া দিলাম। রাতে ফিরে শুনলাম, নানুভাই ব্রিজমোহন কে কাজ দিয়েছেন।মাসে আড়াইশো টাকা মাইনে। ব্রিজমোহন পকেট থেকে একশো টাকা বার করে বলল, এই যে অ্যাডভান্স। খুব ইচ্ছে করছিল বান্দ্রায় গিয়ে পেরিনকে জানিয়ে আসি। তারপরেই মনে হল, ওর কাছে গেলেই পরদিন কাজটা চলে যাবে। এমনটাই সবসময় হয়েছে, মান্টোভাই। কাজ পেয়েছি, পেরিনকে জানাতে গেছি, তারপরেই বরখাস্ত হয়েছি। ভগবানই জানে, কোন গ্রহনক্ষত্রে ওর জন্ম। তবে গ্রহটা যে অশুভ, তা আমি জানি। শোনো মান্টোভাই, অন্তত এক বছর আমি ওর থেকে দূরে থাকব। থাকতেই হবে। জামাকাপড়ের অবস্থা দেখেছ? একবছর ঠিকঠাক কাজ করতে পারলে, কয়েকটা জামাপ্যান্ট তো বানানো যাবে।
ছমাসের মধ্যে ব্রিজমোহন পেরিনের কাছে গেল না, মির্জাসাব। মজাসে চাকরি করছে, নতুন জামাকাপড় হয়েছে। ওর ছিল খুব রুমালের শখ। সুন্দর সুন্দর সুতোর কাজ করা অনেক রুমাল কিনেছে। হঠাৎ একদিন ওর নামে একটা চিঠি এল। চিঠিটা হাতে নিয়েই ব্রিজমোহন বলে উঠল, সব খতম হয়ে গেল, মান্টোভাই।
-কেন?
-পেরিনের চিঠি।
কী লিখেছে?
রোববার যেতে লিখেছে। আমাকে নাকি অনেক কথা বলার আছে। আজ শনিবার তো?
-হ্যাঁ। তাতে কী?
-তার মানে পর
মাকে লাথ মারবে।
-তা হলে পেরিনের কাছে যেও না।
-তা হয় না, মান্টোভাই। ও চাইলে আমাকে যেতেই হবে।
-কেন?
ব্রিজমোহন কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর সে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, আমিও কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, মান্টোভাই। ছমাস তো হয়ে গেল।
পরদিন বান্দ্রায় গেল ব্রিজমোহন। ফিরে এসে আমাকে পেরিনের কথা কিছুই বলল না। হাজির হোটেলে খেতে বসে একবার শুধু বলল, দেখা যাক কাল কী হয়!
সোমবার ব্রিজমোহন ফিরে এসে হা-হা করে হাসতে শুরু করল।-আমি জানতাম মান্টোভাই, আমি জানতাম। পেরিন ওর কাজ ঠিক করেছে।
-কী হল?
-স্টুডিও বন্ধ হয়ে গেল, মান্টোভাই। শুধু আমার জন্য। আমি কাল পেরিনের কাছে না গেলে বলতে বলতে গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে বেরিয়ে গেল ব্রিজমোহন। এত রাতে ক্যামেরা নিয়ে ও কোথায় যাবে?
ব্রিজমোহন আবার বেকার হয়ে গেল। জমানো যা টাকা ছিল, ফুরিয়ে গেল। আবার সেই
পুরনো নিয়ম চালু হল। প্রত্যেক রবিবার নাস্তার পর সে আমার কাছে এসে আট আনা নিয়ে বান্দ্রায় যায়, কয়েক ঘণ্টা পেরিনের সঙ্গে কাটিয়ে খোলিতে ফিরে আসে। একদিন ব্রিজমোহনকে জিজ্ঞেস করলাম, পেরিন তোমাকে ভালবাসে?
-না।
-তা হলে, প্রতি রবিবার যাও কেন?
-না গিয়ে পারি না, মান্টোভাই।
-পেরিন কি—
-ব্রিজমোহন ঝাঝিয়ে ওঠে, হ্যাঁ, হ্যাঁ। পেরিন অন্য একজনকে ভালবাসে। কিন্তু তাতে দোষ কোথায়?
-দোষ কিছু নেই। তোমাকে ডেকে পাঠায় কেন?
-পেরিনের খুব একা লাগে।
-কেন?
-জানি না। ও কখনও বলেনি।
ব্রিজমোহন তার বিছানায় শুয়ে পড়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে, হয়তো আমাকে দেখে মজা পায়। মান্টোভাই, জীবনে এমন মানুষও তো দরকার, যাকে দেখে মজা পাওয়া যায়। হয়তো আমি ওর ছবি তুলি বলে। ছবিতে ওকে অনেক সুন্দর দেখায় তো, কে জানে, হয়তো শব্দজব্দ সমাধান করে দিই বলে। মান্টোভাই, এই মেয়েদের তুমি বুঝতে পারবে না।
-কেন?
-তুমি ভালবাসা চাও।
-আর তুমি?
-জানি না। তবে পেরিনের মতো মেয়েদের জানি।
-কীরকম ওরা?
-ওরা অন্য কাউকে ভালবাসে, তার ভেতরে যা পায় না, অন্যের মধ্যে তা খুঁজে পায়, তখন তাকে শঙ্খলাগা সাপের মতো জড়িয়ে ধরে মনে মনে। শরীরের কাছে কিছুতেই পৌঁছতেই দেয় না।
-তা হলে তুমি যাও কেন?
-ভাল লাগে।
-কী ভাল লাগে? পেরিন তো তোমাকে কিছু দেয় না।
ব্রিজমোহন হাসে। -দেয় তো। ওর নক্ষত্রের দোষ আমার ওপর চাপিয়ে দেয়, মান্টোভাই। আমি তো একটা খেলাই খেলে যাচ্ছি। কত কালো মেঘ ও আমার জীবনে নিয়ে আসতে পারে। পেরিনের তুলনা নেই। যতবার ওর কাছে গেছি, আমি কাজ থেকে বরখাস্ত হয়েছি। আমার শুধু একটাই ইচ্ছে।
কী?
-পেরিনকে আমি একবার ঠকাব।
-কী করে?
ব্রিজমোহন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। শুনতে পাই, একটা ইঁদুর ঘরের ভিতরে কটকট করে কিছু কেটে যাচ্ছে। ব্রিজমোহন বিছানা থেকে নেমে পায়চারি করতে থাকে। আমি আবার বলি, পেরিনকে ঠকানোর প্ল্যানটা ঠিক করেছ?
-হুঁ।
-কীরকম?
-চাকরি থেকে তাড়ানোর আগে আমি ইস্তাফা দিয়ে দেব। মালিককে সরাসরি বলে দেব, আমি জানি, আপনি আমাকে তাড়াবেন, কিন্তু এমন খারাপ কাজ করতে না দেওয়ার জন্য আমিই। ইস্তাফা দিচ্ছি। আমি তাঁকে আর একটা কথাও বলব। আসলে আপনি নন, পেরিন আমাকে বরখাস্ত করছে। এটুকুই আমার ইচ্ছে, মান্টোভাই।
