কী বললেন, হ্যাঁ ঠিক বলেছেন, আমি জানতাম আপনি বলতে পারবেন। ফকির-যুবক জাহানারাকে জীবন দিয়েছে, এর নাম মানবিকতা। তৃতীয় যুবক একেবারে সন্তানের মত নবাবকে সান্তনা দিয়েছে। প্রথম যুবকই, হ্যাঁ, একমাত্র সেই আশিক, যে এতদিন ধরে সুন্দরীর সমাধির পাশে বসে থেকেছে। মৃত্যুও তাঁকে দূরে সরিয়ে দিতে পারেনি।
এভাবেই কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো। হঠাৎ একদিন শুনতে পেলাম, দিল্লির রেসিডেন্ট ফ্রেজারসাহেব খুন হয়ে গেছেন। ইয়া আল্লা!
২৮. বম্বে শহরটা আমার সঙ্গে কথা বলত
তুম -সে বেজা হৈ মুঝে অপনী তবাহী-কা গিলা,
ইস-মেঁ কুছ শাইবা -এ খুবী -এ তকদির-ভী থা।
(কেমন করে তোমাকে বলি তুমিই করেছ আমার সর্বনাশ,
এতে ভাগ্যের দশ হাতের খেলাও ছিল কিছু।।)
বম্বে শহরটা আমার সঙ্গে কথা বলত, মির্জাসাব। বলবে না -ই বা কেন বলুন? বম্বে আর আমার জীবনের এত মিল, মাঝে মাঝে মনে হত, আমি একদিন আসব বলে শহরটা অপেক্ষা করে ছিল। দেশভাগের পর লাহোরে গিয়েও মনে হত, আমি যেন বম্বেতেই আছি, ভাইজানেরা। বারো বছর ধরে বম্বের সঙ্গে আমার ভাব-ভালবাসা; শহরটা ছেড়ে যাওয়ার সময় মনে হয়েছিল, দুটো ডানা হারিয়ে একটা পঙ্গু সিন্ধুসারস পাকিস্থানে চলেছি। আমার মতো একটা লাথখোরকে তো আশ্রয় দিয়েছিল বম্বেই। আমার কানে ফিসফিস করে বলেছিল, দিনে দুপয়সা বা দশ হাজার টাকা যাই রোজগার করো না কেন, ইচ্ছে করলেই তুমি এখানে মস্তিতে থাকতে পারো, মান্টো। পৃথিবীর সবচেয়ে অসুখী মানুষ হিসেবেও এখানে জীবনটা কাটিয়ে দিত পারো তুমি। যা খুশি তা-ই করতে পারো। কেউ তোমার খুঁত ধরতে আসবে না। কেউ তোমার কানের কাছে এসে ভাল হওয়ার কথা বলবে না। একা তোমাকেই সবচেয়ে কঠিন কাজ করতে হবে, হ্যাঁ, একা তোমাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তুমি ফুটপাথে থাকতে পারো, প্রাসাদেও থাকতে পারো; তাতে আমার কিছু যায় আসে না। তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেলেও কিছু যাবে আসবে না। আমি যেখানে আছি, সেখানেই থেকে যাব। সে আমার হাত ধরে তার সব গলিঘুজি, রইস এলাকা, সমুদ্র, তার দিন-রাত্রি, তার উল্লাস-শিহরন-পাপ-পতন চিনিয়েছিল। মাঝে মাঝে মনে হয়, যদি আমি কাউকে কখনও ভালবেসে থাকি, তবে এই শহরটাকে, আর কাউকে নয়।
মির্জাসাবের তুলনায় আমার জীবন খুব ছোট, ভাইজানেরা। তাই আমার জীবনের কিস্সা বলতে হলে, কত যে মানুষের কথা বলতে হবে। বম্বেই আমাকে এইসব মানুষকে চিনিয়েছিল। আমি যেসব গল্প লিখেছি, তার চরিত্ররা সবাই আমার চেনা, চেনা বলছি কেন, তাদের সঙ্গেই তো আমি জীবন কাটিয়েছি, তারা আমার আত্মার আত্মীয়। আমি যা লিখেছি, সব-সব ব্যাক্তিগত, আমার নিজের দেখা-শোনা-জানা-অনুভবের কথা। কোনও বিশেষ রাজনীতি আমার অনুপ্রেরণা ছিল না। তাই কখনও আমাকে প্রগতিশীল, কখনও প্রতিক্রিয়াশীল বলে দেগে দেওয়া হয়েছে। প্রগতিশীল সাহিত্যের নামে টন-টন কাগজ খরচ করে সোভিয়েত ইউনিয়নে যা ছাপা হয়েছে। তার মতো কদর্য, অসৎ সাহিত্য আর কখনো দেখা যায় নি। তাকে সাহিত্য বলা যায় না। কোনও রাজনীতি বা তত্ত্বের চশমা চোখে লাগিয়ে আমি দুনিয়াটাকে দেখিনি, ভাইজানেরা। নিজের মতো করে বুঝতে চেয়েছি একটাই কথা-জীবন আমাদের জন্য কী নিয়ে এসেছে? তা হলে পেরিন-এর কিস্সাটাই শোনাই আপনাদের। পেরিনকে আমি কখনও দেখিনি। শুধু তার কথা শুনেছি ব্রিজমোহনের কাছে, তবু এই গল্পের প্রধান চরিত্র পেরিন। পেরিন যেন বম্বের আত্মা।
আমি তখন সেই খোলিতেই থাকি, যার কথা আগেই আপনাদের বলেছি। বম্বের খোলি মানে দোজখের চেয়েও নোংরা। ছারপোকা, উকুন, ইঁদুর, মানুষ-একসঙ্গে থাকে। সে বাড়িটায়। একটাই গোসলখানা, তার দরজা বন্ধ করা যায় না। ভোর থেকে মেয়েরা সেখানে ভিড় করে খাবার জল নেবার জন্য। তারপর চান করার জন্য লাইন পড়ে যেত। ব্রিজমোহন থাকত আমার পাশেরই একটা খোলিতে। প্রতি রবিবার ব্রিজমোহন তার বান্ধবি পেরিনের সাথে দেখা করতে যেত বান্দ্রায়। পেরিন পারসি মেয়ে। ওর সঙ্গে ব্রিজমোহনের সম্পর্কটা যে আসলে কী, তা কিছুতেই বুঝতে পারতাম না। ব্রিজমোহন কেন প্রতি রবিবার বান্দ্রায় যায়? পেরিন যেন তার জীবনের তীব্র এক নেশা। যাওয়ার জন্য প্রত্যেকবার আমাকে আট আনা ধার দিতে হত তাকে। বান্দ্রায় গিয়ে পেরিনের সঙ্গে কয়েকটা ঘন্টা কাটিয়ে সে ফিরে আসত। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কী করো তোমরা? বেড়াতে যাও, না ঘরে বসে আদর-টাদর করো?
-না, না। ব্রিজমোহন হেসে বলে, পেরিনের জন্য শব্দজব্দ সমাধান করে দিই।
-শব্দজব্দ?
ইলাসট্রেটেড উইকলিতে বেরোয় তো। পেরিন ওগুলো পাঠায়। অনেকগুলো প্রাইজও পেয়েছে।
ব্রিজমোহনের কোন কাজ ছিল না। খোলিতে বসে ও পেরিনের শব্দজব্দের সমাধান করত।
আমি একদিন জিজ্ঞেস করলাম, পেরিন তো প্রাইজ পায়। তুমি কী পাও?
-কিছু না।
-প্রাইজের এক পয়সাও তোমাকে দেয়নি?
-না।
-কেন? তুমিই তো ওর শব্দজব্দ করে দাও।
-তাতে কী? পেরিন তো ওর নামেই পাঠায়। ও প্রাইজ জেতে। আমাকে পয়সা দেবে কেন?
-আচ্ছা বুরবাক তুমি।
ব্রিজমোহন ওর হলদেটে দাঁত বার করে হাসত।
ছবি তুলত ব্রিজমোহন। পেরিনের অনেক ছবি আমাকে দেখিয়েছিল। কত ভঙ্গিমা, কত পোশাক। শালওয়ার-কামিজে, শাড়িতে, প্যান্ট-শার্টে, এমনকী সাঁতারের পোশাক পরেও। ছবি দেখে পেরিনকে একেবারেই সুন্দরী মনে হয় নি। কিন্তু ব্রিজমোহনকে কখনও সে কথা বলিনি, মির্জাসাব। কে কাকে সুন্দর দেখবে, সে তার চোখের ব্যাপার। ওই যে বলে না, আমারই চেতনার রঙে পান্না হয়ে উঠল সবুজ। পেরিন সম্পর্কে ব্রিজমোহনের কাছে আমি কিছুই জানতে চাইনি। ব্রিজমোহনও আমাকে যেচে কিছু বলেনি। শুধু আমি জানতাম, প্রতি রবিবার নাস্তা করে ব্রিজমোহন বান্দ্রা যাওয়ার জন্য আমার কাছে এসে আট আনা চাইবে, আর আমাকে ওই পয়সাটুকু দিয়ে দিতে হবে। দুপুরের মধ্যেই ব্রিজমোহন ফিরে আসত। এক রবিবার ফিরে এসে ব্রিজমোহন বলল, সব খতম করে দিলাম।
