-তা হলে আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেন কেন, মির্জাসাব?
-ঠাট্টা করি না বেগম। তবে তোমার আমার পথ আলাদা। তোমার আল্লা থাকেন মসজিদে, তার জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করো তুমি। মৌলবি-মোল্লারা তোমাকে পথ দেখান। আর আমার খোদা থাকেন দরগায়, সেখানে মওলা রুমি গান করেন, শেমা নাচেন। তোমার পথটা আমার জন্য নয় বেগম; আমি আনন্দ উৎসবের ভেতরে খোদাকে পেতে চাই।
-আমিও তাই চাই মির্জাসাব। কিন্তু আপনি তো আমার সঙ্গে কথাই বলেন না। বলতে-বলতে উমরাও কেঁদে ফেলেছিল। মান্টোভাই, সেই প্রথম আমার মনে হল, কত দীর্ঘ দিন ধরে উমরাও বেগমও জেলখানায় বন্দি হয়ে আছে। আমি যদি তার দিকে একবার হাত বাড়িয়ে দিতে পারতুম! পারিনি। একবার নির্দেশের ভুল হয়ে গেলে আবার বিশুদ্ধ হতে কতদিন লাগে, মান্টোভাই?
উমরাও বেগম মহলসরায় চলে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে আমি কাপড়ে গিঁট দিলুম :
দিখাউঙ্গা তমাশা দী অগর ফুরসত জমানে নে
মেরা হর দাগ-এ দিল এক তুখমা হ্যায় সর্ব -এ চিরাগাঁ কা।
শোনো, শোনো বেগম, আমি তোমাকে বলছি, যদি সময় পাই তবে আমিও দেখিয়ে দেব, আমার হৃদয়ের ক্ষতগুলো এক একটা অঙ্কুরিত বীজ।
বন্দিত্বের দিনগুলোতে আমার একজন বন্ধু তো সঙ্গেই ছিল আমার গজল। মান্টোভাই, আমি সেই গভীর-গোপন সুরকে জিগ্যেস করলুম, বলো তো, আমার নসিবে কেন সারা জীবনের বন্দিত্ব? সে কী বলল জানেন? আরে তুমি কি কাক যে জাল পেতে তোমাকে ধরা হবে ছেড়ে দেওয়ার জন্য? তুমি বুলবুল বলেই তো খাঁচায় বন্দি করা হয়েছে, কত অনাগত যুগকে গান শোনাবে তুমি। মানুষ এভাবেই নিজের সামনে কত মরীচিকা যে তৈরি করে রাখে! গালিবের ব্যর্থতার কথা কোনও শব্দে প্রকাশ করা যায় না, মান্টোভাই। অন্ধকারে ডুবে আছে আমার ঘর। আমি নিভে যাওয়া মোমবাতি ছাড়া কিছু নই। লজ্জায় নিজের কালো মুখের দিকে নিজেই তাকাতে পারি না।
এভাবেই দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল। সময়ের কোন হিসেবই করতে পারতুম না। মনে হত, জন্ম থেকেই যেন এই ঘরে বন্দি হয়ে আছি। শুধু কাল্লুর সঙ্গে মাঝেমধ্যে যা কথাবার্তা। সন্ধেবেলা। কাল্লু শরাব দিতে এসে কাল্লু কিছুক্ষণ আমার সামনে বসে থাকত। আর ওর তো একটাই নেশা, কিস্সা শোনা। কিছু বলত না, শুধু চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকত। আমি কখন কথা বলব, সে অপেক্ষায়। তারপরেই একটা কিস্সর জন্য আবদার করবে কাল্লু। এমন আজিব আদমি আমি দেখিনি ভাইজানেরা। কিস্সার পর একটা কথা বলবে না। রোজ রোজ কি আর কিস্সা বলতে ভালো লাগে? তবে একেকদিন বলতুম। নইলে কান্নুই বা বাঁচবে কী করে? একটা মজার কিস্সা, ইশকের কিস্সা শুনিয়েছিলাম একদিন কাল্লুকে। শুনুন, আপনাদেরও ভাল লাগবে, ভাইজানেরা; গালিবের কফন-ঢাকা জীবনের কথা কতই বা আর শুনবেন?
এ এক সুন্দরীর গল্প। তার নাম জাহানারা। কেমন তার রূপ? মীরসাব যেমন একটা শের -এ লিখে গেছেন :
উসকে ফরোগ-এ হুসে চুকে হ্যাঁয় সবনে
শমা-এ হিরম হো য়া দীয়া সোমনাথ কা।।
(তার রূপের ঔজ্জ্বল্যের কাছে সবাই ঋণী
কাবার বাতিই হোক অথবা সোমনাথের প্রদীপ।।)
তিনজন যুবক জাহানারাকে নিকে করার জন্য নবাবের দরবারে এল। কেউ কারও চেয়ে কম নয়; নবাব ঠিকই করতে পারেন না, কার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেবেন। শেষে তিনি মেয়ের হাতেই পছন্দের ভার ছেড়ে দিলেন। মাসের পর মাস চলে যায়। জাহানারা তবু মন ঠিক করতে পারে না। খোদার কী খেয়াল। নিকে আর হল না সুন্দরীর; হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা গেল আমাদের গল্পের জাহানারা। তিন যুবক তাকে একসঙ্গে মিলে কবরে শুইয়ে দিয়ে এল। প্রথম যুবক রয়ে গেল সেই সমাধিক্ষেত্রেই। সে শুধু ভাবত, নসিবের এ-কোন খেলা তার আশিককে দুনিয়া থেকে এত তাড়াতাড়ি নিয়ে চলে গেল। দ্বিতীয় যুবক ফকির হয়ে বেরিয়ে পড়ল পথে। যাকে সে ভালবেসেছে, তার মৃত্যুর কারণ সে জানতে চায়। আর তৃতীয় যুবকটি রয়ে গেল নবাবের কাছে, তাঁকে সান্তনা দেওয়ার জন্য।
যে ফকির হয়েছিল, সে অনেক জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে এল এক নতুন দেশে। শুনতে পেল, সেখানে নাকি একজন মানুষ থাকেন, যিনি আশ্চর্য সব ঘটনা ঘটাতে পারেন। ফকির যুবক তার বাড়িতে গিয়ে হাজির হল। রাতে যখন তারা দুজনে খেতে বসেছে, তখন সেই জ্ঞানী মানুষটার নাতী কেঁদে উঠল। মানুষটি সঙ্গে সঙ্গে উঠে গিয়ে বাচ্চা ছেলেটিকে আগুনে ফেলে দিলেন।
ফকির যুবক চিৎকার করে উঠল, এ কী করলেন আপনি? দুনিয়ায় অনেক পাপ-দুঃখ দেখেছি আমি, কিন্তু এমন অপরাধ কেউ করতে পারে?
মানুষটি হেসে বললেন, এত ভাববেন না। যথার্থ জ্ঞান না থাকলে সাধারণ বিষয়কেও। অন্যরকম মনে হয়। বলেই তিনি একটা মন্ত্র উচ্চারণ করলেন। আগুনের ভেতর থেকে ছেলেটি তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে এল।
ফকির -যুবক মন্ত্রটি স্মরণ রেখেছিল। সে বেশ কিছুদিন পর ফিরে এল নিজের দেশে। প্রেমিকার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করতেই জাহানারা তার সামনে এসে দাঁড়াল। নবাব তো মেয়েকে পেয়ে দেশ জুড়ে উৎসব শুরু করে দিলেন। তিন যুবক জাহানারাকে নিকে করার জন্য আবার এল। জাহানারা কাকে বেছে নিয়েছিল জানেন? তার আশিককে। কে তার আশিক, বলতে পারেন মান্টোভাই?
হাঁ করে তাকিয়ে আছেন কেন? এটুকু না বলতে পারলে, আপনাকে তো লেখক হিসেবে মেনে নেব না।
