আমাকে মিনমিন করে বলতে হয়, আর একটু সময় দিন। কিছু একটা হয়ে যাবেই। আমার কেসটা তো উঁচু আদালতে গেছে।
কিন্তু আমি জানতুম, কিছুতেই কিছু হবে না। উঁচু আদালতে পাঠানো রিপোর্ট তো নিগ্রোর কোঁকড়ানো চুলের মতো, আশিকের রক্তঝরা হৃদয়ের মতো, বধ্যভূমিতে উচ্চারিত হত্যার ঘোষণার মতো।
একদিকে পাওনাদার, অন্যদিকে শামসউদ্দিনের পা চাটা লোকজনেরা। চোখ নাচিয়ে, হেসে আমাকে জিগ্যেস করত, কী মিঞা, কলকাতায় কী হল বলুন? ওরা সবাই জানত। কিন্তু মানুষ তো অন্য মানুষের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিয়েই আনন্দ পায়। আমি ওদের কাছে হাসির খোরাক হয়ে উঠলুম। বাইরে আর বেরুতে ইচ্ছে করত না। একা দিবানখানায় বসে একের পর এক চিঠি লিখতুম নাসিখসাবকে, মীর আজম আলি, হাকিরকে। খৎ লিখতে লিখতে যেন তাঁদের সঙ্গে কথা বলতুম। আর তো কেউ কথা বলার ছিল না; মহলে নয়, শাহজাহানাবাদেও নয়; দূরের মানুষের সঙ্গেই সারা জীবন আমার যত কথাবার্তা। তারা কেউ এই মাটি-পৃথিবীতে থাকে, কেউ আকাশে আকাশে উড়ে বেড়ায়। মান্টোভাই, আমি ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলাম। এই দুনিয়ায় আমার কোন দেশ নেই, আমি এখানে নির্বাসনে এসেছি।
এক দুপুরে হঠাৎই উমরাও বেগম দিবানখানায় এল। আমি তখন মনে মনে একটা নতুন। গজল ভাঁজছি, আর কাপড়ে একটা করে গিঁট দিচ্ছি। কাপড়ে গিঁট দেওয়ার ব্যাপারটা জানেন তো? ওটা আমার অভ্যেস ছিল। একটা গজল কখন, কোথা থেকে ভেসে আসবে, কেই বা। জানে। কাগজ-কলম নিয়ে বসার অভ্যেস আমার ছিল না। এক -একটা শের মনে মনে ভাঁজছি, আর কাপড়ে একটা করে গিঁট দিচ্ছি। একটা গিঁটে বাঁধা রইল একটা শের। তারপর কাউকে একসময় বলতুম লিখে নিতে। কাপড়ের এক -একটা গিঁট খুলতেই এক -একটা শের বেরিয়ে আসত। আমার বেশী কিছু প্রয়োজন ছিল না, মান্টোভাই। কখনও নিজের হাভেলি করার কথা মনেও আসেনি, সঞ্চয় নেই বলে দুঃখ হয়নি, শুধু চেয়েছিলুম, কয়েকটা মানুষ যেন একটু ভাল ভাবে খেয়ে পড়ে থাকতে পারি, রোজ সন্ধেবেলা যেন পছন্দের পানীয়টুকু পাই। একটা কিতাব পর্যন্ত কখনও কিনিনি। ধার করে পড়েছি। আমার বাড়িতে কোন কিতাব ছিল না, মান্টোভাই। কী হবে কিতাব দিয়ে? খোদা তবে দিলকেতাব দিয়েছেন কেন?
কথায় কথায় আবার খেই হারিয়ে ফেলেছি। হ্যাঁ, তো এক দুপুরে উমরাও বেগম এল আমার কাছে। তখন একটা শের মনের ভেতরে পাক খাচ্ছে :
মওত কা একদিন মুআইন হ্যায়
নিদঁ কিয়োঁ রাত ভর নহীঁ আতী
সত্যিই তখন আমার মনের অবস্থা ওইরকম। সবসময় মনে হয়, একমাত্র মৃত্যুই আমাকে এত অপমান, নিগ্রহ থেকে মুক্তি দিতে পারে। মৃত্যু তো আমি ডাকলেই আসবে না। যখন আসবার সে আসবে। কিন্তু সারা রাত আমার চোখে ঘুম আসে না কেন? মনে হত, নিজের কবরের। সামনেই বসে আছি। গৃহবন্দি হওয়া ছাড়া আমার সামনে আর কোনও রাস্তা ছিল না। বাইরে বেরুলেই পাওনাদাররা ঘিরে ধরে। মাঝে মাঝে বাড়িতেও হানা দেয়। তারপর দুজন পাওনাদার গিয়ে আদালতে নালিশ করল। রায় বেরুল, হয় আমাকে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হবে, না হলে জেলে যেতে হবে। পাঁচ হাজার টাকা আমি কোথায় পাব? তাই বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দিলুম। শাহজাহানাবাদে রইস আদমিদের জন্য একটা নিয়ম ছিল। কারও নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলে, সে রাস্তায় না বেরুলে বাড়িতে এসে গ্রেফতার করা হত না। তাই নিজের ঘরেই কারাবাস মেনে নিতে হল আমাকে। দোস্তরাও কেউ আসে না। মান্টোভাই, একেই বোধহয় বলে কাফেরের জীবন। তবে একশো বছর দোজখে থেকে কাফের যে যন্ত্রণা ভোগ করে আমি তার দ্বিগুণ যন্ত্রণা ভোগ করেছি। উরফির কবিতা মনে পড়ত বারেবারেই। ভাগ্য আমার পেয়ালায় যে বিষ ঢেলে দিয়েছে, তার তিক্ত বাস আমার হৃদয়কে পুড়িয়ে খাক করে দিয়েছে, আশা নিরাশার দোলায় দুলত আমার হৃদয়।
বেগম বলল, আপনি ঘর থেকে একদমই বেরোন না শুনলাম, মির্জাসাব?
আমি হেসে বললুম, আমার খবর তুমি রাখো না কি, বেগম?
-আপনি কি খোঁচা না দিয়ে কথা বলতে পারেন না?
-খোঁচা দেব কেন? তুমি থাকো মসজিদে, সেখানে কাফেরের খবর পৌঁছয় কী করে?
-আমি বোধহয় আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় দুশমন, তাই না?
-তা কেন? তা কেন? মজাও বোঝ না? বসো বেগম। আমি তাকে সব কথা খুলে বললুম।
-কিন্তু এভাবে আপনি থাকবেন কী করে মির্জাসাব?।
-পারছি তো বেগম।
-না, না। মানুষ এইরকম থাকলে পাগল হয়ে যায়। দোস্তরা কেউ আসে না কেন?
-কে আমার দোস্ত? হ্যাঁ, একজনই আছে -মওত -সে কবে আসবে তা তো জানি না।
-ইয়া আল্লা। মওতের কথা কেন বলেন আপনি?
-এছাড়া আর কী চাইবার আছে আমার জীবনে? উদ্দেশ্যহীন একটা জীবন কেটে যাচ্ছে আমার। কোথাও কোন নকশা দেখতে পাই না। নকশা তো একটা থাকার কথা ছিল। মওলা রুমির মুর্শিদ শামসউদ্দিন তাবরিজির কথা কদিন ধরেই মনে পড়ছে, বেগম। শামসউদ্দিনসাব তখন যুবক। দিনের পর দিন রাতে ঘুমাতে পারেন না, খিদে পায় না তাঁর। বাড়ির লোকেরা বারবার জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে মুহম্মদ -হ্যাঁ তার আসল নাম ছিল মুহম্মদ মালেকদাদ -কেন ঘুমোতে পারো না, কেন কিছু খাও না? শামসউদ্দিন বলেছিলেন, আল্লা আমাকে ধুলো থেকে তৈরি করেছেন। তিনি কেন আমার সঙ্গে কথা বলছেন না? তা হলে আমি কেন খাব, কেন ঘুমোব? আমি তাঁর কাছে জানতে চাই, কেন আমাকে সৃষ্টি করলেন, কবে আমি এসেছি, কোথায় যাব? তিনি যদি আমকে উত্তর দেন, তবেই আমি আবার খেতে পারব, ঘুমোতে পারব। আমার জীবনের নকশাটা যদি দেখতে পেতুম, বেগম।
