আমি হেসে বলেছিলুম, আপনার দিল কঠিন হয়ে যায়নি তো?
-মানে?
আমি উত্তর দিইনি। মোমিনসাবের একটা শের বলেছিলুম :
রোয়া করেঙ্গে আপ ভি পহ্রোঁ ইসি তরহ্
অটকা কহিঁ যো আপ কা দিল ভি মেরী তরহ্।
(কাঁদবেন আপনিও প্রহরে প্রহরে আমার মতো
হৃদয় যদি বাঁধা পড়ে কোথাও, আমারই মতো।)
মান্টোভাই, দিল্লি দরবারের সঙ্গে যত জড়িয়েছি, ততই বুঝতে পেরেছি, রাজনীতির সঙ্গে কবিতার কখনও দোস্তি হতে পারে না। আমাদের বাদশা বাহাদুর শাহ এত-এত শের লিখতেন, সব কিচর, জঞ্জাল, আর আমি তাঁর চাকর বলে সেইসব শের সংশোধন করে দিতে হত। কিছুদিন পর্যন্ত গোরাদের ওপর আমার ভরসা ছিল, হয়তো ওরা নতুন কিছু করবে, কিন্তু ১৮৫৭-র পর বুঝতে পারলুম, সবই ক্ষমতার খেলা। আর কবিকে এই ক্ষমতার খেলা থেকে দূরে থাকতে হয়, মান্টোভাই, নইলে, আমি বলছি, লিখে রাখুন, কবিতা তাঁকে ছেড়ে চলে যাবে। সে দরবারে গিয়ে অনেক বড় বড় কথা বলতে পারে, অনেক বিষয় মতামত দিতে পারে, সব -সব ফালতু; আমরা তো আসলে তার কাছে কবিতাই চেয়েছিলুম। তার বদলে তিনি আমাদের কী দিলেন? বাদশা বাহাদুর শাহের জন্য লেখা প্রশস্তি। এছাড়া আর কীই বা দিতে পারেন জওকসাবদের মতো কবি, যারা কোনও না কোন ক্ষমতার কাছে বিক্রি হয়ে গেছেন? তাঁদের বাজারদর তো বাঁধা হয়ে গেছে। সত্যি বলছি মান্টোভাই, পারলে ওই জওকের পেছনে আমি লাথি মারতুম; গজলের সঙ্গে এত দূর বেইমানি? একবার রাজনীতির ভেতরে গিয়ে ঢুকলে, বেইমানি আপনার রক্তে কখন ছড়িয়ে যাবে, বুঝতেও পারবেন না। রাজনীতি তো আসলে মুখোশ -বদলের খেলা। বাহাদুর শাহের সময় তো দরবারের কোনও রোশনাই ছিল না, সবই বিকিয়ে গেছে, তবু কত যে ষড়যন্ত্র আর পিছন থেকে এর পিঠে ওর ছুরি মারা দেখেছি।
বাদশা আকবর শাহ, মানে দুনম্বর আকবর শাহ, তখন তন্তে। হ্যাঁ, ১৮৩৪ সালই হবে। প্রথম বার আমি দরবারে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলুম। জাফর, মানে বাহাদুর শাহ তার পরে। বাদশা হবেন। কিন্তু আমি জানতুম, আকবর শাহ তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে অন্য এক ছেলে সেলিমকেই দেখতে চান। এ বিষয়ে বাদশা ইংরেজদের সঙ্গে কথাবার্তাও চালাচ্ছিলেন। ভাবলুম, আমাকে সেলিমের দিকেই থাকতে হবে, কেননা জাফর ততদিনে জওককে উস্তাদ হিসেবে বরণ করেছেন। আকবর শাহের জন্য লেখা একটা কসীদায় সেলিমের খুব গুণগান করলুম, রাজা-বাদশাদের কাছে পৌঁছবার সেটাই তরিকা। কিন্তু বাস্তবে ঘটল উল্টোটা। ইংরেজরা সেলিমকে মেনে নিল না; তিন বছর পরে আকবার শাহের মৃত্যু হল, আর বাহাদুর শাহ নাম নিয়ে বাদশা হয়ে গেলেন জাফর। আমার অবস্থাটা তাহলে বুঝতেই পারছেন। বাহাদুর শাহের কাছে একেবারে নামঞ্জুর হয়ে গেলুম। তাঁকে উদ্দেশ্য করেও অনেক কসীদা লিখেছিলুম, কিন্তু তার মন পেলুম না, দরবারেও যাওয়া হল না। কালে সাহেব আর আক্সানউল্লা খান সাহেবের সুপারিশে অনেক পরে আমাকে দরবারে জায়গা দিলেন ঠিকই, কিন্তু আমি যেন তার গলার কাঁটা হয়েই ছিলুম।
খেয়াল বড় মারত্মক জিনিস; খেয়ালের পাল্লায় যে পড়েছে তার জীবন সতরঞ্চের খোপ ছেড়ে বেরিয়ে যাবেই। আর ওই যে, অন্ধের মতো ভাবতুম, আমার শরীরে মোঘল রক্ত, আমির খসরুর পর আমার মতো ফারসি গজল কে লিখতে পারে, বুঝতেই চাইনি, রুপেয়া না থাকলে রক্তের কোন মূল্য নেই, তোমার গজল লোকে পা দিয়ে মাড়িয়ে চলে যাবে। দিল্লি কলেজে তো পড়ানোর চাকরি হয়ে যেত আমার। ফারসি পড়ানোর জন্য কলেজের একজন শিক্ষক দরকার ছিল। ভারত সরকারের সচিব থমসন সাহেব এসেছিলেন সাক্ষাঙ্কার নিতে। কবি মোমিন খান, মৌলবি ইমাম বশ আর আমার নাম সুপারিশ করা হয়েছিল ফারসি শিক্ষক-পদের জন্য। থমসন সাহেব আমাকেই প্রথম ডেকে পাঠিয়েছিলেন। আমি তো পাল্কিতে চড়ে সাহেবের। বাড়িতে গেলুম; বাড়িতে পৌঁছে সাহেবকে খবর পাঠিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে রইলুম। সাহেব এসে আমাকে না নিয়ে গেলে ভিতরে যাব কেন? তোমার দরজায় যদি একজন মির্জা আসেন, তাঁকে নিজে এসে আপ্যায়ন করে নিয়ে যাওয়াই তো তারিকা। অনেকক্ষণ চলে যাওয়ার পর সাহেব এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার আপনি এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? মির্জাকে আপ্যায়নের তারিকার কথা সাহেবকে বললুম। সাহেব হেসে বললেন, আপনি যখন গভর্নরের দরবারে আসবেন তখন নিশ্চয়ই আপনাকে আপ্যায়ন করা হবে। কিন্তু এখন তো আপনি চাকরির জন্য এসেছেন মির্জা।
আমি বললুম, একটু বেশী সম্মান পাওয়ার জন্যই তো সরকারি চাকরি করব বলে ভেবেছি। এ তো দেখছি, যেটুকু সম্মান আমার আছে, তাও আর থাকবে না।
-এ ব্যাপারে আমার কিছু করার নেই মির্জা।
-তা হলে আপনিও আমাকে মার্জনা করুন। চাকরিটা আমি নিচ্ছি না।
কথাটা বলে সাহেবের দিকে আর ফিরেও তাকাইনি। পাল্কিতে উঠে বসলুম। চাকরিটা পেলে আমার একটু সুরাহা হত, উমরাও বেগমের মুখে হাসি দেখতে পেতুম, কিন্তু খোদা যে আমার জীবনের জন্য অন্য খেলা ছকে রেখেছেন।
কলকাতা থেকে ফেরার পর শাহজাহানাবাদ আমার কাছে জেলখানা হয়ে উঠল। মাথায় চল্লিশ হাজার টাকার ওপরে দেনার বোঝা। কীভাবে শোধ করব জানি না। মান্টোভাই, একা একা ঘরে বসে একটা একটা করে মাথার চুল ছিড়ি। রাস্তায় বেরোলেই পাওনাদাররা চেপে ধরে, কী হল মিঞা, কলকাতায় যাওয়ার আগে কত বড় বড় কথা বলে গেলেন।
