মদ আর ভাঙা গ্লাসের দাম চুকিয়ে মমতাজ হোটেলের বাইরে এসে দাঁড়াল। তার মনে হল,। এই কণ্ঠস্বর ছাড়া পৃথিবী থেকে সব শব্দ হারিয়ে যাচ্ছে। সে হাসপাতালে ফিরে এল, খালেদের ওয়ার্ডে যাওয়ার সময় কণ্ঠস্বর আবার বলল, ওখানে যেও না মমতাজ। খালেদ তাহলে মারা যাবে।
হাসপাতালের মধ্যেই একটা পার্কের বেঞ্চে সে শুয়ে পড়ল। তখন রাত প্রায় দশটা। অন্ধকারে হাসপাতালের বাইরের ঘড়িটা শুধু দেখা যাচ্ছিল। সে বিড় বিড় করে বলছিল, খালেদ বাঁচবে তো? মরে যাওয়ার জন্য বাচ্চারা কেন এই দুনিয়াতে আসে? জন্মের পরেই কেন মৃত্যু এভাবে
ওদের গ্রাস করে নেয়? খালেদ নিশ্চয়ই…
সেই কণ্ঠস্বর তাঁকে বলল, মমতাজ এভাবেই শুয়ে থাকো। একটুও নড়ো না খালেদ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত।
মমতাজ একসময় নিজের ভেতরে চিৎকার করে উঠল, আল্ল মেহরবান, আমাকে বাঁচাও। খালেদকে মারতে চাইলে মারো। আমাকে এত কষ্ট দিচ্ছ কেন?
তার কাছেই দুজন লোক বসে কথা বলছিল।
-কী সুন্দর বাচ্চা।
-ওর মায়ের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। ডাক্তারের পায়ে পড়ে শুধু কাঁদছে।
-ছেলেটাকে বাঁচানো যাবে না।
হঠাৎ তারা মমতাজকে দেখতে পেল।-আপনি এখানে কী করছেন?
মমতাজ তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
-কে আপনি? একজন জিজ্ঞেস করল।
মমতাজের গলা শুকিয়ে কাঠ। ফ্যাসফেসে গলায় সে বলল, আমি পেশেন্ট ডাক্তারবাবু।
-পেশেন্ট তো বাইরে কেন? ভেতরে যান। এখানে কেন?
-স্যার আমার ছেলে…ওপরের ওয়ার্ডে…
-আপনার ছেলে
-আপনারা বোধহয় ওর কথাই বলছিলেন। আমার ছেলে খালেদ।
-আপনি তার আব্বা?
মমতাজ শুধু তার মাথা নাড়ে।
-এখানে শুয়ে আছেন? ওপরে যান তাড়াতাড়ি।
মমতাজ দৌড়তে থাকে। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই ওয়ার্ডের সামনে জামশেদকে দেখতে পায়। জামশেদ তার হাত ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে, সাব, খালেদ মিঞা চলে গেল।
ওয়ার্ডে ঢুকে মমতাজ দেখল, বিছানার ওপরেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে তার বিবি। ডাক্তার নার্সরা তাকে ঘিরে আছে। মমতাজ বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। চোখ বুজে শুয়ে আছে খালেদ। মৃত্যুর শান্তি ছড়িয়ে আছে তার মুখে। মমতাজ তার রেশমের মতো চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বলে, লজেন্স খাবি খালেদ? খালেদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মমতাজ বিড়বিড় করে বলে, খালেদ মিঞা, তুমি আমার ভয়টাকে নিয়ে যাবে না?
মমতাজের মনে হল, খালেদ যেন মথা নেড়ে বলল, জি আব্বা।
গল্প শুনতে শুনতে শফিয়া কখন যেন আমার হাত চেপে ধরেছিল। আমি আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, তার চোখ মরুভূমির মত উজ্জল। একসময় উঠে দাঁড়িয়ে সে ডাক দেয়, জুজিয়া জি-জুজিয়া জি-।
শফিয়া তো কখনও নসরতকে ওই নামে ডাকেনি।
২৭. নসিবের কী লিখন দেখুন
কুছ খুব নহীঁ ইতনা সতানা ভী কিসূকা
হ্যয় মীর ফকীর, উসকো নহ্ আজার দিয়া কর।
(এমন করে কাউকে যন্ত্রণা দেওয়াটা কি খুব ভালো কাজ?
মীর এমনিতেও সর্বহারা, তাঁকে আর কষ্ট দিও না।)
নসিবের কী লিখন দেখুন, কলকাতায় গিয়েছিলুম টাকার ঝোলা নিয়ে ফিরব বলে, আর ফিরে এলুম ফকিরের তাঞ্জিমারা ঝুলি নিয়ে। একটা সুফি কিস্সা মনে পড়ে গেল, মান্টোভাই। এইসব কিস্সই তো আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, নইলে কবেই ফৌত হয়ে যেতুম। এক সুফি গুরু একদিন তাঁর শিষ্যদের বললেন, মানুষকে যতই সাহায্য করার চেষ্টা করো না কেন, দেখবে মানুষের ভিতরে এমন কিছু থাকবে, যাতে কিছুতেই সে লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে না। শিষ্যরা অনেকাই তাঁর কথা মেনে নেয় নি। এর কিছুদিন পরে তিনি এক শিষ্যকে বললেন, নদীর ওপর যে সেতুটা আছে, তার মাঝখানে এক বস্তা স্বর্ণমুদ্রা রেখে এসো তো। অন্য শিষ্যকে বললেন, শহর ঘুরে দেখো কোন মানুষটা ঋণে একেবারে জর্জরিত। তাকে সেতুর একদিকে নিয়ে এসে বলল সেতুটা পার হতে। তারপর দেখো কী হয়। গুরুর কথামতো শিষ্যরা কাজ করল। যে লোকটিকে সেতু পার হওয়ার জন্য আনা হয়েছিল, সে সেতুর ওপারে আসতেই গুরু তাকে জিজ্ঞেস করলেন, সেতুর মাঝখানে কী দেখতে পেলে?
-কই, কিছু না।
-কিছু দেখতে পাও নি?
-না।
-তা কী করে হয়? একজন শিষ্য বলল।
-সেতু পেরোনোর সময় হঠাৎ মনে হল, আচ্ছা চোখ বন্ধ করে যদি যাই, তবে কেমন হয়? দেখাই যাক না, যেতে পারি কি না। তা দেখছি, চোখ বন্ধ করে ঠিক চলে এসেছি।
গুরু তার শিষ্যদের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
কলকাতা থেকে ফেরার সময় ওই কিস্সাটাই বার বার মনে পড়ছে। নিজেকে বুঝিয়েছি, গালিব তোমার পথের মাঝে অনেক স্বর্ণমুদ্রা ছড়ানো ছিল, কিন্তু খেয়ালের বশে তুমি চোখ বুজে এলে, তাই কিছুই পেলে না। অনেক পরে ভেবে দেখেছি, আমার জীবনে এছাড়া আর কীই বা হতে পারত? কত ভুলই না করেছি। দুনিয়াদারির হালহকিকৎ মাথায় ঠিকমত ঢুকত না। আমি ভাবতুম একরকম, আর হয়ে যেত উল্টো। কেন বলুন তো, মান্টোভাই? এমনিতে তো আমি এমন কিছু ভোলাভালা মানুষ ছিলুম না, পেনশনের টাকা আদায় করতে কলকাতা অবধি ছুটেছিলুম তো, যাকে খুশি করার দরকার খুশি করতুম, যার পেছনে চিমটি মারলে মজা, তার পেছনে চিমটিও দিতুম, তবু ওই লোকটার মতো আমার অবস্থা দাঁড়াল, খেয়ালের বশে চোখ বুজেই সেতু পার হলুম।
আরে, সেই জন্যেই তো দিল্লি দরবারে জায়গা পেতে এত দেরী হল। তাকেও অবশ্য জায়গা বলে না, কোনও মতে টিকে থাকতে পারলুম। দরবারের রাজনীতি বুঝতুম না, তারপর গোরাদের জমানা শুরু হতে চলেছে, সব মিলেমিশে, বুঝলেন মান্টোভাই, একেবারে ঘোটালা অবস্থা। রাজনীতি বোঝা আমার মতো বুরবাকের কম্মো না। চেষ্টা করলে কি আর বুঝতে পারতুম না? চেষ্টাই তো করিনি। জওকসাব এসব খুব ভালো বুঝতেন। তাই জাঁহাপনা বাহাদুর শাহও তাঁকে চোখে হারাতেন। কিন্তু জওকসাবের কটা শের আপনার মনে আছে? মান্টোভাই, একটা মানুষ দুটো কাজ পারে না। রাজনীতি আর কবিতা-এ হল দুই মহলের। ব্যাপারস্যাপার। এক মহলে জিততে চাইলে, অন্য মহলে তোমাকে হারতেই হবে। রাজনীতির মহলে আমি জিততে পারিনি। জওকসাব আমাকে দেখলে মিটিমিটি হাসতেন। আমি মনে-মনে বলতুম, ঠিক হ্যায় মিঞা, হাসো, বহুৎ খুব, আওর হাসো, কিন্তু দরবারের খিদমতগারি করতে করতে কবিতা তোমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে, তুমি বুঝতেও পারছ না। জওকসাব একদিন মজা করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মির্জা, আপনার শের সহজে বোঝা যায় না কেন? এত কঠিন করে লেখেন কেন?
