খালেদের স্বাস্থ্য বেশ ভালো। গালের রং দেখে মনে হয় যেন রুজ মাখানো হয়েছে। অফিস যাওয়ার আগে রোজ মমতাজ ছেলেকে এক গামলা জলে বসিয়ে স্নান করায়। কিন্তু ইদানিং স্নান করাতে করাতে খালেদের দিকে তাকিয়ে তার মনে কলো মেঘ জমে। নিজেকে সে বলে, আমার বিবির কথাই ঠিক। খালেদের মৃত্যুর ভয় কোথা থেকে আমার ভেতরে এল? কেন মরবে ও? অনেক বাচ্চার চেয়েই ওর স্বাস্থ্য বেশ ভাল। খালেদকে খুব ভালবাসি বলেই কি এই ভয়?
রোজ সকালে ঘর ঝাঁট দেবার পর মেঝেতে মাদুর পেতে শুয়ে থাকতে ভাল লাগত মমতাজের। আর একদিন পরেই খালেদের জন্মদিন। হটাৎ বুকের ওপর ভার অনুভব করতেই সে চোখ খুলে দেখল, খালেদ তার বুকে শুয়ে আছে। পাশে তার বিবি দাঁড়িয়ে। খালেদ নাকি সারারাত ছটফট করেছে, কী এক ভয়ে কেঁপে-কেঁপে উঠেছে। মমতাজ ছেলের শরীরে হাত বুলোতে- বুলোতে বলে উঠল, আল্লা, মেরে বেটে কো-।
-এত ভয় কীসের মমতাজ সাব! সামান্য জ্বর, আল্লার দয়াতেই চলে যাবে। বলে তার বিবি চলে গেল। মমতাজ ছেলেকে যে কতভাবে আদর করতে লাগল।
খালেদের প্রথম জন্মদিনের জন্য মমতাজের বিবি বিরাট ব্যবস্থা করেছিল। সব আত্মীয় বন্ধুবান্ধবদের নেমন্তন্ন করা হয়েছে। খালেদের জন্য নতুন পোশাক তৈরি করতে দিয়েছে। এত জাঁকজমক মমতাজের ভাল লাগছিল না। সে চাইছিল, নীরবে এক বছর পার হয়ে যাক। তা হলে আর কোনও ভয় থাকবে না।
খালেদ একসময় তার বুক থেকে উঠে টলোমলো পায়ে অন্য ঘরে চলে গেল। মমতাজ একই ভাবে শুয়ে ছিল। হঠাৎ ভেতর থেকে বিবির আর্তনাদ ভেসে এল, মমতাজ সাব, তাড়াতাড়ি আসুন, মমতাজ সাব।
মমতাজ দৌড়ে ভেতরে গিয়ে দেখল, বাথরুমের সামনে খালেদকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার বিবি। খালেদ হাত-পা ছুড়ছে। সে বিবির কাছ থেকে খালেদকে কোলে তুলে নিল।
জল নিয়ে খেলতে খেলতে হঠাত্র খালেদের ফিট শুরু হয়ে যায়। মমতাজের কোলে খালেদ দুমড়ে মুচরে যাচ্ছিল। মমতাজ তাকে বিছানায় শুইয়ে দেয়। আরো কিছুক্ষণ হাত-পা ছোঁড়ার পর খালেদ অজ্ঞান হয়ে যায়। একেবারে নিস্পন্দ। মমতাজ ডুকরে ওঠে, খালেদ আর নেই। তার বিবি ঝাঁঝিয়ে ওঠে। ইয়া আল্লা, এ কী কথা! একটু তড়কা হয়েছে, দেখবেন এক্ষুনি ঠিক হয়ে যাবে।
কিছুক্ষন পর খালেদ চোখ মেলে। মমতাজ তার ওপর ঝুঁকে পড়ে বলে, খালেদ বেটা আমার, কী হয়েছে, কী কষ্ট হচ্ছে?
খালেদের ঠোঁটে হাসি ফুটে ওঠে। মমতাজ তাকে কোলে নিয়ে পাশের ঘরে যেতেই আবার শুরু হয় খালেদের শারীরিক উন্মাদনা। মৃগীরোগীর মত কাঁপতে থাকে খালেদ। মমতাজ তাকে সামলাতে পারে না। তারপর আবার খালেদ শান্ত যায়। মমতাজ ডাক্তার ডাকতে বেরিয়ে যায়। ডাক্তার এসে খালেদকে দেখে বলে, বাচ্চাদের এমন তড়কা হয় মাঝে মাঝে। কৃমির জন্যও হতে পারে। ওষুধ লিখে দিচ্ছি। চিন্তার কিছু নেই।
কিন্তু খালেদের অবস্থা খারাপ হতে থাকে, জ্বর বেড়ে চলে। পরদিন সকালে আবার ডাক্তার। আসে। বলে, ভয় পাবেন না মিঞা। মনে হচ্ছে ব্রঙ্কাইটিস। তিন চারদিনেই ভালো হয়ে যাবে
খালেদের জ্বর বাড়তেই থাকে। ডাক্তারের দেওয়া ওষুধ ছাড়াও বাড়ির চাকর জামশেদের কথায় তাকে জলপড়া খাওয়ানো হয়। দুপুরে অন্য এক ডাক্তার আসে। ম্যালেরিয়া সন্দেহ করে। কুইনাইন ইঞ্জেকশন দেয়। খালেদের জ্বর ১০৬ ডিগ্রিতে গিয়ে পৌঁছয়। মমতাজ ঠিক করে, হাসপাতালেই নিয়ে যেতে হবে খালেদকে। ঘোড়ার গাড়ি ডেকে খালেদকে কোলে নিয়ে বিবির সঙ্গে সে বেরিয়ে পড়ে। সারাদিন শুধু জলতেষ্টা পেয়েছে মমতাজের। কত যে জল খেয়েছে। ঘোড়ার গাড়িতে যেতে যেতে মনে হয়, কোথাও দাঁড়িয়ে একটু জল খেয়ে নেবে। আর তখনই কে যেন বলে ওঠে, মিঞা, মনে রেখো, জল খেলেই তোমার খালেদ মারা যাবে। গলা শুকিয়ে কাঠ তবু সে জল খায় না।
হাসপাতালের কাছাকাছি পৌঁছে সে একটা সিগারেট ধরায়। দুটান দিয়েই সিগারেট ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কে যেন বলে উঠেছে, মমতাজ, সিগারেট খেও না, তা হলে তোমার ছেলে মারা যাবে। কে, কে তার কানে এসে এইসব কথা বলছে? যতসব বাখোয়াস। সে আবার নতুন করে সিগারেট ধরাতে যায়, কিন্তু পারে না।
হাসপাতালে খালেদকে ভর্তি করার পর ডাক্তার জানায়, ওর ব্রঙ্কিয়াল নিউমোনিয়া হয়েছে।
অবস্থা ভাল নয়। খালেদের জ্ঞান ছিল না। ওর মা বিছানায় মাথার পাশে বসে আছে। মমতাজের আবার জলতেষ্টা পেল। ওয়ার্ডের কাছে কল খুলে জল খেতে গিয়ে মমতাজ আবার শুনতে পেল সে। কণ্ঠস্বর, কী করছ মমতাজ? জল খেয়ো না। তোমার খালেদ তা হলে মারা যাবে। তবু মমতাজ জল খেতেই লাগল; তার মনে হল, একটা সমুদ্র খেয়ে ফেললেও সেই তৃষ্ণা মিটবে না। জল খেয়ে এসে সে দেখল, খালেদ আরো বিবর্ণ গেছে। মমতাজের মনে হল, আমি জল না। খেলে খালেদ হয়ত এত তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যেত না। কিন্তু সেই কণ্ঠস্বর তার ভিতরে বারবার বলে চলেছে, একবছর বয়স হওয়ার আগেই খালেদ মারা যাবে।
তখন সন্ধ্যা নামছে। কত ডাক্তার এসে দেখে গেল খালেদকে। কত ওষুধ, ইঞ্জেকশন দেওয়া হল। খালেদের তবু জ্ঞান ফেরেনি। হঠাৎ সেই কণ্ঠস্বর বলে উঠল, এখনই হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যাও মমতাজ, নইলে খালেদ মারা যাবে। মমতাজ হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে পড়ল। সেই কণ্ঠস্বর তার মাথার ভেতরে ভেতরে কত কথা বলে যাচ্ছিল। কণ্ঠস্বরের নির্দেশে সে একটা হোটেলে গিয়ে বসল, মদের অর্ডার দিল, মদ এল, কণ্ঠস্বর তাঁকে বলল, ছুঁড়ে ফেলে দাও মদ। মমতাজ মদ ছুঁড়ে ফেলে দিতেই আবার নির্দেশ এল, মদের অর্ডার দাও; আবার মদ এল; কণ্ঠস্বর বলল, ছুঁড়ে ফেলে দাও।
