গতকাল আবার হাসপাতাল থেকে ফিরেছি। মদ ছাড়ানোর জন্য শফিয়া কত চেষ্টাই না চালিয়ে যাচ্ছে। এরা বোঝে না মদ এখন আমাকে গিলে খাচ্ছে। মদ খাওয়ার জন্যই কত বন্ধুর বাড়িতে পড়ে থাকি। লেখালেখির সঙ্গে তাদের কোনও সম্পর্কই নেই। তারা জানেই না,। মান্টো কে? আমিও জানাতে চাইনি। শুধু দিনে দিনে নিজের শরীর আর মনকে ক্ষয়ে যেতে দেখেছি আমি। নিজের দিকে তাকালে মাঝে মাঝে সত্যিই ঘেন্না হয়। আমি সবসময় সবকিছু সাফসুরত রাখতে চেয়েছি, শফিয়া একা পারবে না বলে একসময় ঘরদোরও পরিস্কার করতাম, এক কণা ধুলো পড়ে থাকলেও তা সরিয়ে না ফেলা পর্যন্ত আমার স্বস্তি ছিল না। শফিয়া বলত, এসব নাকি আমার বাতিক। কিন্তু চারপাশটাকে সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখতে না পারলে, মানুষের ভেতরটাও সুন্দর থাকে না। মদ্যপান আমার কাছে শুধু নেশা করার ব্যাপার ছিল না; পানের আসরে তরিকা আমি নিখুঁতভাবে মেনে চলতাম। বম্বেতে থাকার সময় পছন্দ করে কতরকম যে গ্লাস কিনছিলাম। এখন আমি মদের বোতল বাথরুমে কমোডের পেছনে লুকিয়ে রাখি। শফিয়াকে লুকিয়ে বাথরুমে ঢুকে মদ খেতে হয় আমাকে। শফিয়া একেক সময় জিজ্ঞেস করে, এতবার বাথরুমে যাই কেন? মিথ্যে বলি। পেচ্ছাপ পায়। মুখচোখে জল দিতে ইচ্ছে করে। কোনও মিথ্যেই আর আমার মুখে আটকায় না। অথচ শফিয়াকে আগে কখনও মিথ্যে বলিনি। নেশা আমাকে দিনে দিনে নৈতিক অধঃপতনের দিকে নিয়ে চলেছে।
কিন্তু কী করব? না-খেলে কলম চলতে চায় না। আর না লিখলে রোজগারও বন্ধ। বুঝতে পারি, নিজের তৈরী একটা গোলকধাঁধায় আমি ঘুরপাক খাচ্ছি। আমি জানি, একমাত্র মৃত্যু ছাড়া এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ নেই আমার। কিন্তু মির্জাকে নিয়ে এই লেখাটা আমাকে শেষ করে যেতেই হবে। সকালের দিকে কাগজ কলম নিয়ে বসেছিলাম। হাসপাতাল থেকে আসার পর কয়েকদিন মদ ছুঁতে ইচ্ছে করে না। মনে হয়, সারা শরীর জুড়ে নতুন ঘাস গজিয়েছে, গন্ধ পাই সেই ঘাসের, কী যে ফ্রেশ লাগে। প্রতিবার প্রতিজ্ঞা করি, নাঃ! আর নয়, এ-জীবনে আর মদ ছোঁব না, শফিয়ার সঙ্গে, মেয়েদের সঙ্গে গল্প করতে ভাল লাগে। কয়েকদিন পরেই আবার মদের দোকানের লাইনে গিয়ে দাঁড়াই।
সকালের দিকে কাগজ কলম নিয়ে বসেছিলাম। অনেকক্ষণ ধরে কাগজের ওপর আঁকিবুকি কাটতে কাটতে একটা শব্দও লিখতে পারিনি। মাথাটা একেবারে ফাঁকা কীভাবে শুরু করব, বুঝতেই পারছিলাম না। আমি জানি, একটু পেটে পড়লেই কলম তরতর করে এগোবে। হঠাৎ বাইরের গলিতে কে যেন চিৎকার করে ডাকল, খালেদ মিঞা -খালেদ মিঞা -।
আমার হাত থেকে কলম খসে পড়ল। মনে হল এক্ষুনি ভয়ঙ্কর কিছু ঘটবে; হয়তো এই বাড়িটা ভেঙে পড়বে। আমি চিৎকার করে ডাকলাম, জুজিয়া জি-জুজিয়া জি-।
ছোটমেয়ে নসরতকে আমি আদর করে এই নামেই ডাকি। মেয়েটা কোথা থেকে দৌড়ে আমার কাছে চলে আসে। আমি ওকে কোলে তুলে নিয়ে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে থাকি। তখনই শফিয়া এসে ঘরে ঢোকে। হাসতে হাসতে বলে, বাপ বেটির আজ যে খুব মহব্বত দেখছি।
-বোসো শফিয়া।
নসরতকে কোল থেকে নামিয়ে বলি, খেলছিলি বুঝি?
-জি আব্বা।
-যা তবে।
ফড়িং-এর মতো রোগা মেয়েটা হাসতে হাসতে দৌড় লাগায়।
আমি শফিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকি। মান্টোর জীবনে এসে কত তাড়াতাড়ি এই মেয়েটা বুড়ো হয়ে যাচ্ছে। শফিয়া আমার পাশে এসে দাঁড়ায়; কাঁধে হাত রাখে। বলে চোখে জল কেন মান্টোসাব?
-খালেদ মিঞার কথা মনে পড়ে তোমার?
শফিয়ার হাত আমার কাঁধে খামচে ধরে। মুহূর্তেই সে যেন এক মর্মরমূর্তি।
-অনেকদিন পর আমার মনে পড়ল।
ঝড়ে ভাঙা গাছের মতো শফিয়া মেঝেতে বসে পড়ল। আমি তার মুখোমুখি গিয়ে বসলাম। শফিয়া অনেকক্ষণ মাথা নীচু করে বসেছিল, তারপর মুখ তুলল; সেই মুখ, আমার মনে হল, কেউ যেন এখনই পাথর খোদাই করে তৈরি করেছে।
-খালেদ মিঞাকে নিয়ে আমি একটা গল্প লিখেছিলাম শফিয়া। তোমাকে কখনও পড়াইনি।
-কেন?
-তুমি কষ্ট পেতে।
-আমার হাতের ওপর খালেদ মরেছিল, আমি সহ্য করিনি মান্টোসাব?
মৃত্যুকে সহ্য করা যায় শফিয়া। স্মৃতিকে নয়। জীবনের অনেক বড় আঘাত আমরা সহ্য করতে পারি, তারপর হয়ত মনেও থাকে না। কিন্তু এক-একটা লেখা এসে বারবার আমাদের কাঁদায়। লেখার ভেতরে তো স্মৃতি ছাড়া আর কিছু থাকে না।
-গল্পটা আজ শোনাবেন?
-তোমার শুনতে ইচ্ছে করছে?
-খালেদের জন্য।
-সে গল্পে আমার নাম ছিল মমতাজ। রোজ ভোর-ভোর ঘুম থেকে উঠে মমতাজ তাদের তিনটে ঘর ঝাঁট দিতে শুরু করত। এতটুকু নোংরা যাতে না থাকে। তখন তার ছেলে খালেদ সবে টলোমলো পায়ে হাঁটতে শুরু করেছে। এইরকম বাচ্চারা তো মেঝেতে ছড়ানো যা পায়, তাই। তুলে মুখে দেয়। মমতাজ অবাক হয়ে দেখত, যতই সে ঘর পরিস্কার করুক, ছেলেটা কিছু না কিছু খুঁজে বার করে মুখে পুরবেই। হয়তো দেওয়াল থেকে খসে পড়া প্লাস্টার, ঘরের কোণায় লুকিয়ে থাকা পোড়া দেশলাই কাঠি। আর মমতাজ মনে মনে নিজেকে গালাগাল দিত। খালেদের প্রথম জন্মদিন যতই এগিয়ে আসছিল, মমতাজের মনে এক অদ্ভুত ভয় ছড়িয়ে যাচ্ছিল। তার সবসময় মনে হত, এক বছর হওয়ার আগেই খালেদ মারা যাবে। একদিন বিবিকে সে ভয়ের কথাটা বলেও ফেলেছিল। বিবি তো সে কথা শুনে অবাক। মমতাজ তো এইরকম কুসংস্কারে বিশ্বাস করে না। বিবি বলল, তাজ্জব কি বাত! আপনার মুখে এমন ভয়ের কথা? শুনে রাখুন মমতাজ সাব, আমাদের ছেলে একশো বছর বাঁচবে। ওর জন্মদিনের যা ব্যবস্থা করেছি, দেখে আপনার তাক লেগে যাবে। তবু ভয়টা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে থাকে।
