সব আশা ত্যাগ করে কলকাতা ছেড়েছিলুম। শুধু এইরকম কয়েকটা স্মৃতি নিয়ে। হ্যাঁ, মান্টোভাই, সেখানে আশ্চর্য বসন্তের বাতাস বয় ঠিকই, কিন্তু সেই শহরেই পাথরে মাথা কুটতে – কুটতে রক্তাক্ত হয়ে নিজের ঘরে ফিরে আসতে হয়। দিল্লিতে যখন ফিরলুম, আমার মাথায় তখন হাজার চল্লিশেক টাকার দেনার বোঝা।
২৬. মান্টোর উপন্যাস অনুবাদের কাজ
অনেকদিন মান্টোর উপন্যাস অনুবাদের কাজ বন্ধ ছিল। তার কারণ, তবসুম এক পরিরানির মা হয়েছে। মাস দুয়েক তাই ওকে বিরক্ত করি নি। মেয়ের নাম দিয়েছে ফলক আরা। ইতিমধ্যে আমিও জীবনের এক অজানা পর্ব পেরিয়ে এসেছি। হঠাৎই আমার মদ্যপান এত বেড়ে গিয়েছিল যে চিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতালে আমাকে ভর্তি করা হয়। নেশাগ্রস্থ ও উন্মাদদের মধ্যে দিন পনেরো থাকতে থাকতে আমি বুঝতে পারি, এই মানুষগুলোরও সংলাপ আছে, শুধু আমাদের স্বাভাবিক দৈনন্দিনের মতো নয়। বরং অনেক বেশী স্বপ্ন আর আবোলতাবোল-এ রাঙানো। সেই মানসিক হাসপাতালের জানলায় বসে আকেশের গায়ে টক।-টক গন্ধ আমি টের পেয়েছিলাম। ঠিকানাহীন এক আত্মার নামই উন্মাদনা।
সত্যি বলতে কী, মান্টোর উপন্যাস অনুবাদ করার ব্যাপারে আমি আগ্রহও হারিয়ে ফেলেছিলাম। তার কারণ, ওই মানসিক হাসপাতালের মানুষগুলো আমাকে টানছিল; বার বার মনে হচ্ছিল, ওদের মধ্যে ফিরে যাই। কেন, কখন, কোথায়, কীভাবে-এসব কোন প্রশ্নই ছিল না সেখানে; শুধু একেকজনের অনর্গল সংলাপের প্রবাহ অথবা নীরবতার দূরপ্রসারিত ছায়া।
একদিন তবসুমকে ফোন করলাম ফলক আরার খবর জানার জন্য।
ছানাটা যে কী হাসতে পারে, ভাবতে পারবেন না। একদিন এসে দেখে যান। এ কেমন তরিবৎ আপনার, শুধু ফোন করে খবর নেন?
-যাব একদিন।
-আর কাজটা, সেটার কী হবে?
-ও, মান্টোর উপন্যাস-
-আপনি তো ভুলেই মেরে দিয়েছেন দেখছি।
-ভুলিনি।
-তা হলে আসুন, কাজটা আবার শুরু হোক।
আমি কোনও কথা বলি না।
-কী হল? কথা বলছেন না কেন, জনাব?
-ভাবছি
-কী?
-এই মান্টোর ভূত আমার ঘাড়ে এসেই কেন চাপল!
তবসুমের হাসি শোনা যায়। -সে তো আপনি নিজে যেচেই ঘাড়ে নিয়েছেন। এবার ঘাড় থেকে নামাতে চাইছেন?
-কেমন হয়, তা হলে?
-না, জনাব। এ কাজটি করবেন না। ফলক আরা-কে নিয়ে থাকতে থাকতেই আমি পুরো উপন্যাসটা পড়ে ফেলেছি। পড়তে পড়তে মান্টোসাবকে কী যে ভালবেসে ফেলেছি! একজন লেখক -কোনও ভান নেই, কায়দা নেই-মির্জা গালিবের মধ্যে দিয়ে তিনি নিজেকেই মেলে ধরেছেন। এত সৎ লেখকের প্রতি অবিচার করবেন না। আসুন, আমরা অনুবাদটা শেষ করবই। –
মান্টো সৎ লেখক, বুঝলে কী করে? আমি হেসে বলি।
-বুঝতে পারি। আমি তো লেখক নই, বুঝিয়ে বলতে পারব না আপনাকে। মানুষ যেমন বুঝতে পারে, কোনটা সত্যিকারের প্রেম।
-কীভাবে বোঝ?
-জানি না।
আমি মনে মনে বলি, এই অজ্ঞানতা বাঁচিয়ে রেখো তবসুম। তা হলে তোমার কাছে আরও কিছুদিন গিয়ে বসতে পারব আমি।
-কথা বলছেন না কেন?
কাল যাব?
-আলবৎ। জিজ্ঞেস করতে হয়? একবার ফলক আরা-কে তো দেখবেন।
-হু। যে -উপন্যাসটা লেখা শুরু হয়েছে সবে।
-কোন উপন্যাস?
-ফলক আরা। সে -ও তো একটা উপন্যাস।
-আপনার মাথা ভর্তি শুধু উপন্যাস, তাই না?
-আমার মাথায় শুধু গু-গোবর-জঞ্জাল।
পরদিন তবসুমের বাড়িতে যাই। তার মেয়ে ফলক আরা সত্যিই এক নক্ষত্রের হার; যেন শিল্পী বিজ্জাদের কলম তাকে এঁকে দিয়ে গেছে। মেয়েটির মুখ থেকে আমি চোখ ফেরাতে পারি না।
-কী দেখছেন এত? তবসুম হেসে বলে।
-মীরসাব একটা শের লিখেছিলেন।
-কী?
-আলম-এ হুস্ন হয় আজব আলম।
চাহিয়ে ইশ ইসভী আলম সে।
-আপনি পারেনও বটে। এইটুকু বাচ্চার জন্য মীরসাবের শের?
-রূপ কখন, কোথা থেকে তার ছুরি মারবে, তুমি বুঝতেও পারবে না তবসুম।
-তেমন ছোরার ঘা খেয়েছেন নাকি। এর মধ্যে?
-সব মরচে ধরা ছোরা তবসুম। গলগল করে রক্ত বেরোয় না। ভেতরটা পচিয়ে দেয়।
-আপনি তো দরবারি ডায়লগ বেশ রপ্ত করেছেন দেখছি।
আমি হেসে ফেলি।-এই জন্য তোমাকে ভাল লাগে তবসুম।
-কেন?
-এই জন্য।
-মানে?
-জানি না।
-দাঁড়ান এ বেটিকে কারুর কাছে রেখে আসি।
তবসুম ঘর থেকে চলে যেতেই দেওয়ালে ঝোলানো রাক্ষুসে আয়নাটা আমাকে গিলে ফেলে। আয়নার ভেতরে বহুদূরে আগ্রার চহরবাগ ফুটে ওঠে। ওই তো -ওই তো বেগম ফলক আরার সামনে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে আসাদুল্লা। আর এই মধ্য কলকাতার গলিতে তবসুমের বাড়িতে জন্ম নিয়েছে আর এক ফলক আরা। মানুষ ফেরে না, তবু নাম কেমন ফিরে ফিরে আসে। আয়নার ভেতরেই একসময় তবসুমকে দেখতে পেলাম।
-এই আয়নাটায় আপনি কী এত দেখেন, বলুন তো?
-তোমাদের আয়নাটায় কত পথ যে লুকিয়ে আছে।
-পথ?
-বাদ দাও। এবার মান্টোসাবের কথা বলো।
-হু। আবার কাজটা শুরু করুন তো-। বলতে বলতে সে আলমারি খুলে মান্টোর পাণ্ডুলিপি বার করে। তারপর বিছানায় এসে বসে পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বলে, আজ লিখবেন কি?
-খাতা তো আনিনি।
-ফাঁকি দেবার কত যে ফিকির আপনার।
-পরদিন লিখব। আজ নয় তোমার মুখেই শুনি। এখন লিখতে বড় ক্লান্ত লাগে তবসুম।
-কিন্তু এই অনুবাদটা আপনাকে শেষ করতেই হবে।
-করব, নিশ্চয়ই করব। তুমি পড়ো।
তবসুম পড়তে থাকে, এমন একটা সময়ে মির্জা গালিবকে নিয়ে কিস্সাটা লিখতে শুরু করলাম, যখন আমার দিনগুলো হাতে গোনা যায়। পাকিস্থানে আসার পর একেবারে খতম হয়ে গেছি। মনটাকে পোডড়া জমি ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। শুধু কয়েকটা ক্ষতবিক্ষত কাঁটাঝোপ জেগে আছে। কী যে করব, বুঝতেই পারি না। মাঝে মাঝে মনে হয়, লেখা বন্ধ করে দেব; আবার মনে হয়, কে কী বলল, না ভেবেই লিখে যেতে হবে। এমন একটা অবস্থায় পৌঁছেছি, শুধু মনে হয়, কালি-কলম ছেড়ে একটা নির্জন কোনে যদি পড়ে থাকতে পারতাম, মাথায় ভাবনা এলে তাদের ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে দিতাম; এটুকু শান্তিও যদি না পাই, তবে কালোবাজারে গিয়ে না হয় টাকা কামাব, বিশ মেশানো মদ তৈরী করে রোজগার করব। টাকার দরকার, খুব দরকার। সারা দিন রাত গল্প আর খবরের কাগজের লেখা লিখেও সংসার চালানোর টাকা হাতে আসে না। শধু ভয় হয়, হঠাৎ যদি মরে যাই, আমার বিবি আর তিন মেয়ের কী হবে? আমাকে আপনার যা খুশি তাই বলুন অশ্লীল গল্পের লেখক, প্রতিক্রিয়াশীল কিন্তু একই সঙ্গে আমি তো একজনের স্বামী, তিনজনের বাবা। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে আমাকে দোরে দোরে গিয়ে ভিক্ষা করতে হবে। সংসার খরচ ছাড়াও আমার রোজকার অ্যালকোহলের জন্য টাকা দরকার। চার্জড না হলে একটা বাক্যও তো এখন লিখতে পারি না। আঙ্কল স্যাম আপনিই বলুন, এই কি একজন লেখকের ভবিতব্য?
