-হাতি গর্তে পড়লে পিপড়েও লাথি মারে, জানেন না? তখন ওঠবার জন্য পিঁপড়ের কাছেও মিনতি জানাতে হয়।
-তবু আপনি–
-আমি কেউ নই। বলতে পারেন অনন্তকাল ধরে পড়ে থাকা একটা ঘুম।
-মানে?
মানে কী ছাই, আমিও জানতাম। কথা মুখে আসে, বলে দিই। সবদিক ভেবে যদি কথা বলতে পারতুম, মান্টোভাই, তা হলে জীবনটা মখমল-মোড়া বিছানা হয়ে যেত। আমি তা চাইওনি। কলকাতা থেকে হতাশা নিয়ে দিল্লিতে ফিরলুম, তবু কলকাতার কথা ভুলতে পারলুম কোথায় বলুন? অনেক ছোট ছোট কথা মনে পড়ে জানেন। পেনশনের জন্য কত বড় বড় সায়েসুবোর সঙ্গে দেখা করেছি, তাদের কথা আর মনে নেই। অথচ এক মেছুনির কথা এখনও ভুলতে পারি না। আমি রোজ একজন চাকরকে নিয়ে সিমলাবাজারে যেতুম, ঘুরে ঘুরে মাছ- তরিতরকারি-ফল কিনতুম। তো সেই বাজারে এক মেছুনির সঙ্গে ভাব হয়ে গেছিল আমার। সে আমার জন্য প্রায়ই তোপসে মাছ নিয়ে আসত; সায়েবরা বলত ম্যাঙ্গো ফিস। কমলা রঙের ছোট ছোট মাছ। তোপসে মাছ ভাজা খেতে খুব ভালো লাগত। বিশেষ করে, শরাবের সঙ্গে তো জবাব নেই। সেই মেছুনির দু-এক কথার পর রোজ আমাকে একটা কিস্সা শোনাত। তখন কেউ মাছ কিনতে এলেও সে মুখ ঝামটা দিয়ে বলত, যাও দিকিনি, দেকছো না, মিঞার সঙ্গে মনের কথা বলতিছি।
খদ্দের বলত, মনের কথা? তাহলে মাছ বেচবে না?
-না, বেচব না। আমার মাছ আমি বেচব না, তাতে তোমার কী? তার পর আমার দিকে ফিরে বলত, শোনো মিঞা, ভটচায বামুনের কথা শুনলে তুমি হাসতে হাসতে বাজারে গড়াগড়ি খাবে।
কিস্সার নেশায় আমিও তার পাশে বসে পড়তুম।
-ভটচায বামুনেরা তো শুধু পুঁথি পড়ে আর আকাশপানে তাকিয়ে ভাবে। দুনিয়ার কিছুই। তেনাদের চোখে পড়ে না। এক ভটচাযের গিন্নি ডাল রাঁধছিল। হঠাৎ দেখে ঘরে জল নেই। সোয়ামিকে রান্নাঘরে বসিয়ে জল আনতে গেল। বউ তো গেছে জল আনতে, এদিকে ডাল উথলে উঠেছে। বামুন তো ভেবেই পায় না, উথলানো ডাল সামলাবে কী করে? এ যে বিষম বিপদ। শেষপর্যন্ত করল কী জানো? হাতে পৈতে জড়িয়ে সেই হাত ডালের ওপর মেলে চণ্ডীপাঠ করতে লাগল। মিঞা, এমন মজার কথা কখনও শুনেছো? চণ্ডীপাঠে ডাল উথলানো সামলায়?
-তারপর?
-গিন্নি ফিরে এসে ব্যাপার দেখে বলে, এ কী? ডালে একটু তেল ফেলে দিতে পারনি? তেল ফেলতেই উথলানো থেমে গেল। তারপর ভটচায কী করল জানো মিঞা? -কী?
মেছুনি হাসতে হাসতে আমার গায়ে ঢলে পড়ল। তার কোনও লাজ লজ্জা নেই। আমার দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, বামুন তখন বৌয়ের পা ধরে বলতে লাগল, তুমি কে মা, আমি যেখানে হার মানলাম, একফোঁটা তেল ছিটিয়ে তুমি সব জয় করলে।
-তারপর?
-তারপর আবার কী? বৌটা আ মরণ বলে এক ঝামটা দিয়ে চলে গেল। মেছুনি হাসতে হাসতে বলল, মিঞা, মেয়েছেলের সঙ্গে বেটাছেলে কখনও পারে?
পুরুষকারের কথাই যদি বলেন, মান্টোভাই, তবে একজনের কথাই আমার মনে পড়ে, তিনি রামমোহন রায়। তাঁকে আমি দেখিনি। সারা কলকাতায় তাঁর নাম শুনেছি। তার বাড়ির ভোজসভায় নাকি বাইজি নাচত। কত বিখ্যাত সব বাইজি তখন কলকাতায়। বেগমজান, হিঙ্গুল, নান্নিজান, সুপজান, জিন্নাৎ, সৈয়দ বক্স। না, না ভাইজানেরা এঁদের আমি দেখিনি। কলকাতার বড় বড় বাবুদের কাছে বাঁধা ছিল তারা। আমার তো বাবুদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। শুনেছিলাম, বাবু রামমোহন, মিরাত-উল-আস্ফার নামে একটা ফারসি খবরের কাগজ বের করেছিলেন। আমি কলকাতায় যাবার অনেক আগেই তা অবশ্য বন্ধ হয়ে গেছে। তবে ফারসিতে জামিজাহানুমা নামে একটা খবরের কাগজ বেরুত। তা ছাড়া ইংরেজি, বাংলায় কত যে কাগজ। কলকাতা আমার ভেতরে খবরের কাগজ পড়ার নেশা ধরিয়ে দিয়েছিল। তখন তো দিল্লিতে খবরের কাগজ আসে নি। আসবেই বা কী করে? ছাপাখানা তৈরি হলে তো খবরের কাগজের কথা আসে। আর কলকাতায় তখন কত ছাপাখানা। সিরাজউদ্দিনসাব আমাকে একটা বই দেখিয়েছিলেন। কবি ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল; বলেছিলেন, গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য নামে কেউ একজন বইটা ছাপিয়েছিল। পঞ্চানন কর্মকার বলে একজনের নামও শুনেছিলুম। ছাপাখানার জন্য প্রথম বাংলা হরফ তৈরি করেছিল সে।
মান্টোভাই, আমি রামমোহনের কথাই বলছিলুম না? এই মানুষটাকে আমি চোখে দেখিনি, তাঁর সম্পর্কে অনেক আজেবাজে কথা শুনেছি, সতীদাহের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াইয়ের কথা শুনে আমি আর কিছু মনে রাখিনি। নিমতলা ঘাট শ্মশানে সতীদাহ আমি দেখেছি। আর দেখেছি গঙ্গাযাত্রীদের। মৃতপ্রায় লোকদের গঙ্গার ধারে নিয়ে যাওয়া হত, সেখানে একটা ঘরে তাদের রেখে দেওয়া হত, রোজ জোয়ারের সময় আত্মীয়-স্বজনরা ঘর থেকে বার করে তার শরীরের অনেকখানি গঙ্গার জলের ভিতর ডুবিয়ে রেখে দিত। এর নাম অন্তর্জলী যাত্রা, মান্টোভাই। দিনের পর দিন রোদে পুড়ে, বৃস্টিতে ভিজে, শীতে কষ্ট পেয়ে তারা মারা যেত। তখন একটু মুখাগ্নি করে তাকে জলে ভাসিয়ে দেওয়া হত। আর সতীদাহের সময় চন্দন কাঠ, ঘি দিয়ে জ্বালানো হত চিতা; স্বামীর সঙ্গে পুড়িয়ে মারা হত স্ত্রীকে। চলত মন্ত্রোচ্চারণ, বাজত কাঁসর ঘন্টা-ঢোল, যেন এক উৎসব। জীবন্ত নারী পুড়ে যাওয়ার যন্ত্রণা কেউ শুনতেও পেত না। এই দৃশ্য যেদিন দেখি, আমার বুক জুড়ে নিধুবাবুর সেই শব্দটাই ঘুরে ফিরে এসেছিল, প্রাণ..ওগো…প্রাণ। পরে শুনেছিলুম রামমোহনের চেষ্টায় সতীদাহ প্রথা বন্ধ হয়েছিল।
