সে ঘরে বসার আর কোনও ব্যবস্থা ছিল না; আমরা নিধুবাবুর বিছানাতেই গিয়ে বসলুম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কলকাতায় কোন কাজে এসেছেন?
আমি তাঁকে সব বললুম। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, এই হারামজাদারা এখানে এসেছে দেশটাকে শুষে খাবার জন্য। আপনার-আমার জন্য ওরা কিছু করবে না। আপনি সাধক রামপ্রসাদের গান তো শোনেন নি। নবাবসাব, আপনার মনে আছে?
আমার আশা আশা কেবল আসা মাত্র হল।
চিত্রের কমলে যেমন ভৃঙ্গ ভুলে গেল।
খেলব বলে ফাঁকি দিয়ে নাবালে ভূতল।
এবার যে খেলা খেলালে মা গো আশা না পুরিল।
মির্জাসাব, ওই সায়েবদের মতো এই শহরেরও হৃদয় নেই। আপনি এখানে কিছু পাবেন না। দিল্লিতেই ফিরে যান। এ শহরে এখন নতুন বাবুদের উদয় হয়েছে, তারা বলে, নিধুবাবুর সব গান অশ্লীল। আরে গুখেগোর ব্যাটারা, তোর ইংরেজ ঠিক করে দেবে কোনটা শ্লীল আর অশ্লীল? তা হলে কবি ভরতচন্দ্রকে কোথায় জায়গা দিবি তোরা? বিদ্যাসুন্দরকে ধুয়েমুছে ফেলবি? ওই এক সায়েব শালা ডিরোজিও -মদ, মাংস খাইয়ে সবাইকে শেখাচ্ছে, ইংরেজের বিদ্যাই শ্রেষ্ঠ বিদ্যা। আরে মদ -মাংস কি আমরা কম খেয়েছি? রাঁঢ়ও রেখেছি। তা বলে কি আমরা উচ্ছন্নে গেছি? একটা গান শুনুন তবে :
প্রাণ তুমি বুঝিলে না, আমার বাসনা।
ঐ খেদে মরি আমি, তুমি তা বুঝ না।
হৃদয় সরোজে থাক, মোর দুঃখ নাই দেখ,
প্রাণ গেলে সদায়তে, কি গুণ বল না।
বলুন নিধুবাবুর এই গান অশ্লীল?
পর পর টপ্পা গেয়ে চললেন তিনি। আর প্রতিটি গানেই ওই একটা শব্দ, প্রাণ। শব্দটি যখন তিনি উচ্চারণ করছিলেন, মনে হচ্ছিল, ফুটে-ওঠা পদ্ম যেন তুলে দিচ্ছেন আমাদের হাতে। গাইতে গাইতে ক্লান্ত হয়ে অনেকক্ষণ তিনি চুপচাপ বসে রইলেন।
সিরাজউদ্দিনসাব বলে উঠলেন, কি নসিব আমার। কতদিন পর আপনার গলায় গান শুনতে পেলাম।
নিধুবাবু আমার দিকে ফিরে বললেন, ফিরে যান মিঞা, দিল্লিতে ফিরে যান। কলকাতা আপনাকে কিছু দেবে না। শুধু অপমান পাবেন। যারা অন্ধ, তারা সবচেয়ে বেশী দেখে আজ। এখানকার মানুষ কেচ্ছা ছাড়া আর কিছু জানে না। মুর্শিদাবাদের মহারাজ মহানন্দ রায় বাহাদুর এখানে এসে মাঝে মাঝে থাকতেন। শ্রীমতী নামে তাঁর এক বাঁধা রাঁঢ় ছিল। আমি রোজ সন্ধেবেলা গিয়ে গান গেয়ে মহারাজকে আনন্দ দান করতাম। কেন কে জানে, শ্রীমতীও। আমাকে ভালবাসতেন, আমি যতক্ষণ থাকতাম, যাতে অযত্ন না হয়, লক্ষ রাখতেন। সবাই রটিয়ে দিল, শ্রীমতী আমার রাঁঢ়। আমি তাঁকে মনে রেখে অনেক গান বেঁধেছিলাম, তাই বলে তিনি আমার রাঁঢ়? কলকাতা এ ভাবেই সবকিছু বোঝে। আরও কিছুদিন থাকুন, বুঝতে পারবেন। এখানে গুণের কদর নেই, শুধু ফটফটিয়ে কথা বলতে জানতে হবে। সব ইংরেজী শিক্ষার ফল মির্জা, ওরা নিজেদের বাইরে কাউকে মানুষ বলেই জ্ঞান করে না।
ফিরে আসার সময় কাঁধে হাত রেখে নিধুবাবু বললেন, হতাশ হবেন না মিঞাসাব, আপনার সামনে অনেক পথ। আমি তো শেষ হয়ে গেছি। তাই কিছু আজেবাজে কথা বললাম। নিধুবাবুর কথা যখন বললুম, তখন আরেক কবির গানের কথাও বলতে হবে। নিধুবাবুর অনেক আগেই এন্তেকাল হয়েছিল কবি রামপ্রসাদ সেনের। তিনি সাধক কবি, মান্টোভাই। শুনেছিলুম, মা কালি নাকি তাঁর মেয়ের রূপ ধরে এসে বাড়ির বেড়া বাঁধার কাজে হাত। লাগিয়েছিলেন। আরও কত যে কিস্সা তাঁকে নিয়ে। কাশীর দেবী অন্নপূর্ণা এসেছিলেন তাঁর গান শুনবেন বলে। যে বাবুর সেরেস্তায় তিনি চাকরি করতেন, সেখানকার হিসেবের খাতাতেই গান লিখতেন। তাঁর একটা গানের পিলু-বাহারের সুর অনেকদিন ভ্রমরের মতো মনের ভেতরে ঘুরে বেড়িয়েছিল, তা-ও একদিন হারিয়ে গেছে; ধীরে ধীরে সব রং, সব সুরই তো আমাকে। আলবিদা জানিয়েছে।
নিধুবাবাবুর কথা শুনে, তাঁর চোখ দিয়ে আমি আরেক কলকাতা দেখতে পেলুম মান্টোভাই। আর সেই কলকাতা-বুজুর্গের সম্মান দিতে যে জানে না -কিছুদিনের মধ্যে আমাকেও পাঁকের মধ্যে এনে ফেলল। মাসের প্রথম রবিবার বড় একটা মুশায়েরা হত। একবার সেই মুশায়েরা-য় ফারসি গজল পড়তে আমাকে নেমন্তন্ন করা হল। অতবড় মুশায়েরা দিল্লিতেও হত না। প্রায় হাজার পাঁচেক লোকের জমায়েত। আমার গজল শুনে একদল লোক কতিলের নাম করে আমার গজলের ভাষা ও শৈলী নিয়ে প্রশ্ন তুলল। যে যাই বলুক, কতিলকে আমি কোনওদিনই বড় ফারসি কবি হিসেবে মানিনি। মনাব কী করে বলুন? সে তো আসলে ফরিদাবাদের ক্ষত্রী দিলওয়ালি সিং। পরে মুসলমান হয়েছিল। হ্যাঁ, আমির খসরু-র কথা বলুন, মানতে পারি। মুশায়েরা-য় এসব বলতেই তো চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেল। আমার মনে পড়ে গেল। নিধুবাবুর কথা। তর্ক না বাড়িয়ে মুশায়েরা থেকে চলে এলুম। কিন্তু আমি চুপ করে থাকলে কী হবে? কতিলসাবের ভক্তরা কেন ছেড়ে দেবে আমায়? তারা পেছনে লেগে পড়ল। ভেবে। দেখলুম, আমি তো পেনশনের সুরাহা করতে এখানে এসেছি, লোকজনকে খেপিয়ে লাভ কী, কে কোন কাজে লাগবে, বলা তো যায় না। বাদ-এ-মুখালিফ নামে একটা কবিতা লিখে ক্ষমাপ্রার্থনা করলুম। কিন্তু নিজের জায়গা থেকে সরে আসিনি, মান্টোভাই। সবাই খুব অবাক হয়ে গেল। রাজা শাহনলাল জিজ্ঞেস করলেন, এ কী করলেন মির্জাসাব?
-কেন?
-আপনি নিজেকে এতখানি ছোট করলেন কেন?
