কলকাতার মত ভাল শরাব আগে কখনও খাইনি। আর আম। কলকাতায় এসেই আমি আমের প্রেমে পড়লুম। আগেও আম খেয়েছি। কিন্তু বাংলার আম যেন দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর আশিকের চুম্বন। দেখলেই আমার জীব লক লক করে উঠত। এক একটা টুকরো মুখে ফেলে চোখ বুজে আসত আমার, জন্নতের সব ফলও যদি আপনার সামনে সাজিয়ে দেওয়া হয়, কলকাতার আমের কথা আপনি কখনও ভুলতে পারবেন না, মান্টোভাই। এমনই পেটুক আমি যে একবার হুগলির ইমামবাড়ার মুতাল্লিকেও আম পাঠানোর জন্য চিঠি লিখে ফেললুম। মুতাল্লিসাব, আমি চাই সেই ফল, দস্তরখানে যাকে সাজালে যেমন সুন্দর লাগে, তেমনই মনপ্রাণ ভরে ওঠে। আপনি তো জানেনই, একমাত্র আমেরই সেই গুণ আছে। আর হুগলির আমের তো তুলনা। নেই, যেন বাগান থেকে সদ্য তুলে আনা ফুল। আমের মরশুম শেষ হওয়ার আগেই দু – তিনবার যদি আমার কথা স্মরণ করেন, তবে কৃতার্থ হব। মুতাল্লিসাব আমার আবেদনে সাড়া দিয়েছিলেন। আমার চাকরেরা রাত থেকে আম জলে ভিজিয়ে রাখত, সকালে একবার খেতুম, তারপর আবার দুপুরের পরে। ঠাণ্ডা আমের স্বাদ কেমন জানেন, মান্টোভাই? যেন আপনি। সবচেয়ে প্রিয় নারীর সারা শরীর লেহন করছেন।
আমের কথা এল বলে দু -একটা কিস্সা বলি আপনাদের। আসলে কিস্সা নয়। কিন্তু আমার জীবন তো এখন একটা কিস্যাই। শাহজাহানাবাদের হাকিম রাজিউদ্দিন খাঁ আমার খুব দোস্ত ছিলেন, তিনি আবার আম খেতেন না। একদিন হাভেলির বারান্দায় আমরা দুজনে বসে আছি। গলি দিয়ে একটা লোক গাধা নিয়ে যাচ্ছিল। গলিতে আমের অনেক খোসা পড়েছিল। গাধাটা খোসার গন্ধ শুকল, কিন্তু খেল না, হাকিমসাব হেসে বললেন, দেখুন, মির্জা, এত যে আম আম করেন, গাধাও তা খায় না।
আমি শুধু বললুম, সহি বাত। গাধার পক্ষে তো আমের স্বাদ বোঝা সম্ভব নয় হাকিমসাব।
হাকিমসাব প্রথমে হাসলেন, তারপর গম্ভীর হয়ে গেলেন। বললেন মতলব?
আমি হাসতে হাসতে বললুম, কোনও গাধা-ই আম খায় না।
বুঝেছি, বলেই তিনি উঠে পড়লেন।
আমের ক্ষেত্রে আমি দুটো জিনিসই বুঝি, মান্টোভাই, খুবমিষ্টি হতে হবে আর যতক্ষণ খেতে চাইব, যেন খেতে পারি। কলকাতায় আমি দুটোই উপভোগ করেছি। শুধু তো খাওয়া নয়, জলে ভেজানো আমে মাঝে মাঝে গিয়ে হাত বোলাতুম, তাতে যে কী সুখ! চোখেরও কত আরাম। জলের ভেতর শুয়ে আছে ওরা। হিমসাগর, সূর্যোদয়ের হাল্কা কমলা রং ছড়িয়ে আছে তার। শরীরে; আবার ল্যাংড়া দেখুন, একেবারে সবুজ, মাঝে মাঝে হাল্কা হলুদের ছটা; গোলাপখাসের শরীরে কোথাও টকটকে লাল, কোথাও সবুজ বা হলুদ। আর কোনও ফলে এত রংয়ের খেলা নেই, মান্টোভাই। আমসুন্দরীদের কথা যেন বলে শেষ করা যায় না। আমার নেশা দেখে দূর দূর থেকে দোস্ত, শাগির্দরা কতরকম যে আম পাঠাত। বেগম একবার বলেছিল, এতই যখন আম ভালবাসেন, শরাব তো ছেড়ে দিতে পারেন।
-আমার বাইরের জীবন তো তুমি জানো, বেগম। তবু তোমাকে কি ছাড়তে পেরেছি? আমার দুই-ই চাই।
-আর আমার চাওয়া?
-তুমি তো চাও, ঠিক ঠিক শওহর হয়ে উঠব। এ জীবনে আর হবে না বেগম। কিন্তু তোমাকেও আমি ছাড়তে পারব না। নইলে কবেই তো তালাক দিতুম।
-কেন পারবেন না, মির্জাসাব?
-আমার বদখেয়ালির জীবনের আশ্রয় তো তুমি।
-তাই?
– না হলে সবকিছুর পরে এই হাভেলিতে কেন ফিরে আসি আমি? তোমার সঙ্গে সারাদিন একটা কথা না হলেও কেন মনে হয়, এখনও আমার ঘর আছে?
মান্টোভাই, বেগমকে আমি এসব কিছুই বলিনি। সব আমার খোয়াব-খোয়াবে বলা কথা। উমরাও বেগমের সঙ্গে স্বপ্নেই কথা বলতুম আমি। বেগমও নিশ্চয় একই ভাবে আমার সঙ্গে কথা বলত। নইলে আর এতগুলো বছর কী করে একসঙ্গে থেকে গেলুম আমরা! কোথাও তো প্রাণ ছিল, আমরা দুজনেই চিনতে পারিনি।
প্রাণ! কী অলীক এক শব্দ। কলকাতায় গিয়েই শব্দটি শিখেছিলুম আমি। নবাব সিরাজুদ্দিন আহমদ, আমার কলকাতার দোস্ত, একদিন এসে বললেন, চলুন মির্জা, আপনাকে আজ এমন একজনের কাছে নিয়ে যাব, আপনার মন খুশ হয়ে যাবে।
-কে?
-নিধুবাবু।
ইনি কোথাকার বাবু?
-না, না, বাবু নন। তবে সবাই নিধুবাবুই বলে। আসল নাম রামনিধি গুপ্ত। তিনি গান লেখেন, গান করেন। তবে এখন আর গাইতে পারেন না।
-তবে গিয়ে কী হবে?
-কথা বলে আনন্দ পাবেন, মির্জা।
দিনের বেলাতেও অন্ধকার গলির ভেতরে দোতলা বাড়ির ছোট একটা ঘর। আমরা দুপুরের একটু পরে গিয়ে পৌঁছলুম। তখনও তিনি ঘুমিয়ে আছেন। চাকর গিয়ে তাঁকে ডাকতে তিনি আড়মোড়া ভেঙে ধীরে ধীরে উঠে বসলেন। সিরাজুদ্দিনসাবের দিকে তাকিয়ে বললেন, হঠাৎ অবেলায় কেন নবাবসাব?
-আমার এক দোস্তকে নিয়ে এসেছি।
-গানবাজনা করেন?
-শায়র। দিল্লিতে থাকেন।
তিনি দুহাত তুলে নমস্কার করলেন, নবাবসাব আপনাকে নিয়ে এসেছেন। আমার বয়স আজ নব্বইয়ের কাছাকাছি। আপনাকে খুশ করার মতো আর কিছু নেই এই বান্দার জীবনে। গান তো এখন গাইতে পারি না।
-যদি ইচ্ছে হয়, দুটো-একটা শোনাবেন। সিরাজুদ্দিনসাব বললেন।
-ইচ্ছে হয়। কিন্তু গলা তো খোলে না নবাবসাব; যে গায়নে প্রাণ আসে না, তা কি গাওয়া যায়? আপনি তো জানেন।
-আপনি গাইলেই জন্নত নেমে আসবে।
-তা হয় না, নবাবসাব। আপনিও জানেন, আমিও জানি। কেন মিথ্যে বলছেন? নাভি থেকে স্বর আসে-স্বর থেকে সুর হয়-নাভি শুকিয়ে গেলে সুর কী করে জন্মাবে? আপনি তো জানেন, কাকের গলায় গান গেয়ে লোকভোলানো আমার পেশা নয়। আপনারা বসুন, বসুন-এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবেন না।
