-লেখার জন্য শরাব খেতে হয় বুঝি।
-তা নয়
-তবে ছেড়ে দিন।
-ঠিক হ্যায়। আজকের দিনটা তো খেতে দাও।
-না, আর একদিনও নয়।
-আজ খুব আনন্দের দিন শফিয়া।
-কেন?
-তোমাকে প্রথমবার কাছে পেয়েছি।
-তা হলে শরাব লাগবে কেন?
-লাগবে, লাগবে। আমি তার কোমড় জড়িয়ে ধরলাম। না হলে বিছানায় তুমি আসল মান্টোকে পাবে কী করে? শফিয়া হাসতে হাসতে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল। শফিয়া ছিল এইরকমই সহজ, সোজা, মনের কথা স্পষ্ট বলতে পারত, সোজাভাবে যেমন আপত্তি জানাত, তেমন ভালবাসতেও পারত, কোনও ভণিতা ছিল না। কিন্তু মান্টোর সঙ্গে ওর জীবনটা জড়িয়ে যাওয়া ঠিক হয় নি, ভাইজানেরা। মান্টো নিজের সঙ্গেই লুকোচুরি খেলতে খেলতে বড় হয়েছে। খোলা রাস্তার বদলে গোলকধাঁধায় হারিয়ে যেতেই তার ভাল লাগত। শফিয়া অনেক চেষ্টা করেছিল, তবু শরাব থেকে আমাকে সরিয়ে আনতে পারেনি। নেশার জন্য কত মিথ্যা কথা বলেছি, ওর সঙ্গে জোচ্চুরি করেছি। হ্যাঁ, মির্জাসাব, মাঝে মাঝে বেশ কিছুদিনের জন্য খাওয়া ছেড়ে দিতাম। বেশ ভালো লাগত তখন, মনে হত, নতুন করে জন্ম হয়েছে। কিন্তু তারপর আবার। ওই পথ কেটে আমি আর সারা জীবনে বেরোতেই পারলাম না। অনেক পরে শফিয়া একদিন বলেছিল, মান্টোসাব আপনি কাহানি না লিখলে, আমাদের জীবনটা এভাবে নষ্ট হয়ে যেত না। হয়ত তাই।
২৫. মুর্শিদাবাদ পেরিয়ে কলকাতায়
আপনে খাহিশ-এ মুর্দহ্-কো রোঈয়ে
থী হমকো উসসে স্যাঁকাড়ো উম্মীদবারিয়াঁ।
(নিজের মৃত বাসনার কান্না কাঁদো,
ওর কাছ থেকে কতশত না আশা ছিল আমার মনে।)
মুর্শিদাবাদ পেরিয়ে কলকাতায় গিয়ে যখন পৌঁছলুম, তখন সেখানে বসন্ত। মনপ্রাণ আমার জুড়িয়ে গেল মান্টোভাই, দিল্লিতে তো বাহারকে সেভাবে টের পাওয়া যায় না, কিন্তু কলকাতা বাংলা, শুধু সবুজ আর সবুজ, একই সবুজ রংয়ের কত যে লীলা প্রকৃতিতে, তা বাংলায় না। গেলে জানতেই পারতুম না। বসন্তে এক আশ্চর্য বাতাস বয় সেখানে, আমার দোস্তরা বলত, সেই হাওয়ায় নাকি প্রেমের নেশা মিশে থাকে। আমিও টের পেয়েছি। মসলিনের স্পর্শের মতো সেই হাওয়া আপনাকে ছুঁয়ে গেলেই বেচায়েন হয়ে উঠবেন, মনে হবে, অধরা কেউ আপনার জন্য কোথাও অপেক্ষা করে আছে। আর তখন বসন্তের হাওয়ার মধ্যে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে হবে। মনে হবে হাওয়ার সঙ্গে ভেসে যাই। মীরসাবের সেই শেরটা মনে পড়ত :
জ্যায়সে নসীম হর শহর তৈরী করূহুঁ জুস্তজু,
খান বখানহ্ দর বদর শহর বহ্ শহর কূ বহ্ কূ।
(যেন আমি সমীরণ, প্রতি প্রত্যুষে তোমাকে খুঁজে বেড়াই
ঘরে ঘরে, দুয়ারে দুয়ারে, অলিতে গলিতে, নগর নগরান্তরে।)
আমার দোস্ত রাজা শোহনলাল সিমলা বাজেরে মির্জা আলি সওদাগরের হাভেলিতে ঘর ভাড়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। ভাড়া মাসে দশ টাকা। সঙ্গের ঘোড়াটাকে বেচে দিয়ে যাতায়াতের জন্য একটা পালকি ভাড়া নিলুম। ঠিক করলুম, পঞ্চাশ টাকার বেশি কিছুতেই মাসে খরচ করব না। কী মান্টোভাই, আপনার এই মির্জাকে চিনতে পারছেন? শাহজাহানাবাদ থেকে বেরিয়ে কলকাতায় আসতে আসতেই আমি বুঝতে পারছিলুম, একের পর এক সমঝোতা না করে গেলে, জীবনটাকে টেনে নিয়ে যাওয়াই অসম্ভব। আর আমাকে তো সমঝোতা করতেই হবে। মাথায় দেনার বোঝা নিয়ে আমি কলকাতায় এসেছি পেনশনের ব্যাপারটা ফয়সালা করতে। কিছু হল না। ভাইজানেরা আমি যে ফকির, সেই ফকির হয়েই ফিরে গেলাম দিল্লিতে। ইংরেজের কাছে বিচার পাব বলে কলকাতায় গিয়েছিলুম, পাথরে মাথা কুটে আমাকে ফিরে যেতে হল। সে সব কথা বলে আপনাদের মন ভার করতে চাই না। মোট কথা বছরে পাঁচ হাজার টাকা পেনশনই মেনে নিতে হল।
কিন্তু কলকাতা আমাকে যা দিল, তা কী করে ভুলব বলুন, ভাইজানেরা। দুনিয়াতে এমন তরতাজা এক শহর, এ-তো আল্লারই দান। সম্রাটের সিংহাসনে বসার চেয়েও ময়দানের সবুজ ঘাসে বসে থাকা যে কী আনন্দের, আহা গঙ্গা থেকে ভেসে আসা ওই হাওয়া আর কোথায় পাব বলুন! সকালে বিকেলে গোরা মেয়েরা ঘোড়ায় চেপে ময়দানে ঘুরছে, যেমন তাগড়াই আরবি ঘোরা, তেমনই গোরাসুন্দরীরা, মনে হত, সবুজ মাঠে যেন এক -একটা ছবি আঁকা হচ্ছে। ঘোড়ার গতির সঙ্গে বদলে যায় তাদের শরীরের ভঙ্গিমা, যেন একেকটা তীর বুকে এসে বেঁধে। তেমন জবরদস্ত লাটসাহেবের বাড়ি, আর চৌরঙ্গি অঞ্চলের বাগানঘেরা বাড়িগুলো দেখে কী যে লোভ হত। সে সব সাহেবদের বাড়ি। বিশ্বাস করুন মান্টোভাই, পরিবারের দায় না থাকলে। আমি ওই শহরেই থেকে যেতুম। গোরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত। এমন নির্মল হাওয়া আর জল তো শাহজাহানাবাদে নেই। জন্নত, একেবারে জন্নত।
কলকত্তে কো যে জিকর কিয়া তুনে হমনশীঁ
এক তীর মেরে সিনে মে মারা কে হায় হায়।
উয়ো সবজ জার হায় মর্তরা কে হ্যায় গজব।
উয়ো নাজনিন্ বতান-এ খুদ আরা, কে হায় হায়।
সবর আজমাঁ উয়ো উন্ কী নিগাহ হ্যাঁয় কে হ নজর
তাকতরুবা উয়ো উন্ কা ইশারা কে হায় হায়।
উয়ো মেওয়ে হায় তাজহ্ শিরিন্ কে ওয়াহ্ ওয়াহ্
উয়ো বা হায় না-এ-নওয়ারা কে হায় হায়।
(কলকাতার কথা যেই তুমি বললে হে বন্ধু,
আমার হৃদয় যেন তিরের আঘাতে রক্তাক্ত হল।
সেই নিবিড়, সবুজ শ্যামলিকা,
সেই নারীদের রূপ,
সে কটাক্ষ, সে ইশারা
সবলতম বক্ষকেও বিদ্ধ করল।
ধন্য তার তাজা মধুর ফল,
অবিস্মরণীয় তার মদিরা রসাল।)
