বছরখানেক কেটে গেল। শফিয়া ওর চাচার বাড়িতে, আমি আমার খোলিতে। হাসানসাহেব অনেকদিন ধরেই চাইছিলেন, আমরা যাতে একসঙ্গে থাকি। কিন্তু বিবিকে তো ওই খোলিতে নিয়ে তোলা যায় না। শেষ পর্যন্ত আমিও আর পারলাম না। কে পারে বলুন, ভাইজানেরা? কচি বউ তোমার থাকবে এক জায়গায়, আর তুমি নোংরা বিছানায় রোজ তার কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়বে? মাসে ৩৫ টাকা ভাড়ায় একটা ফ্ল্যাট নিয়েছিলাম। এও মান্টো-ম্যাজিক। মাইনে আমার ৪০ টাকা, আর ফ্ল্যাটের ভাড়াই ৩৫ টাকা। সারা মাসের খরচের জন্য ৫ টাকা।
কিন্তু প্রোডিউসার নানুভাই দেশাইয়ের কাছে তখন আমি আঠেরশো টাকা পেতাম। তাঁর সিনেমার জন্য কয়েকটা গল্প লিখে দিয়েছিলাম। বিবিকে ঘরে নিয়ে আসার দিন তো দাওয়াতেরও বন্দোবস্ত করতে হবে। নানুভাইকে গিয়ে ধরলাম টাকার জন্য। শালা একবার হাসে তো একবার কাঁদে, আর বলে, দেখুন মান্টোসাব, নিজের চোখে দেখুন, আমার পকেট একদম ফুটা। আমি কোথা থেকে টাকা দেব আপনাকে?
শেঠকে সব খুলে বললাম, তবু সে কিছুতেই বোঝে না। শেষে হাতাহাতি হওয়ার মতো অবস্থা। নানুভাই তার লোক ডেকে তার অফিস থেকে বার করে দিল। আমিও ঠিক করলাম টাকা না পেলে অফিসের দরজা থেকে নড়ব না। দরকার হলে অনশন শুরু করব। এরা গল্পলেখককে কী ভাবে? গল্প নিয়ে কৃতার্থ করে দিয়েছি? গল্পলেখক পেটে কিল মেরে বসে থাকবে, তাই না? শালা, সবাইকে সব কিছুর জন্য তোমরা টাকা দিতে পারো, আর গল্প নেবে মুফতে? লেখা কি লাওয়ারিশ নাকি? খবরের কাগজেও আমি এক জিনিস দেখেছি। গল্পলেখকের জন্য সবচেয়ে কমটাকা বরাদ্দ। কেন ভাই? খোয়াবের কোন দাম নেই নাকি? দুনিয়াটাকে তোমরা টাকা দিয়ে বিচার করো, আর খোয়াবটাই ফেলনা?
নানুভাই -এর সঙ্গে আমার লড়াইয়ের খবরটা বাবুরাও প্যাটেলের কানে গিয়ে পৌঁছেছিল। শুনেছি, উটের শরীরের কোন অঙ্গই নাকি সোজা নয়। তা হলে উটের পরেই বাবুরাওয়ের নাম আসবে। কথায় কথায় শালা-বাঞ্চোত বলে গালাগালি দিতেন। চোখ দুটো ছোটো ছোটো, মোটা নাক, ঠোঁট, ক্ষয়ে যাওয়া দাঁত, তবে কপাল বেশ চওড়া ছিল। ফিল্ম ইন্ডিয়া-র সম্পাদক বাবুরাও কারবা নামেও একটা উর্দু পত্রিকা চালাতেন। সেখানে কয়েকমাস আমি চাকরি করেছিলাম। শুনেছি, যৌবনেই বাবার সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। বাবার কথা উঠলেই বলতেন, ও শালা একটা আস্ত হারামি। শুনে হাসি পেত। বুড়ো প্যাটেল যদি সত্যিই হারামি হয়ে থাকেন, তা হলে বাবুরাও হারামিপনায় তার চেয়ে কয়েক পা এগিয়েই ছিলেন। আর মেয়ে দেখলেই হয়, অমনি তার পিছেন পড়ে যাবেন। রিটা নামে ওঁর এক সেক্রেটারি ছিল জানেন, মির্জাসাব। সবার সামনেই রিটার পেছনে চাপড় মেরে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতেন। তো বাবুরাওজি নানুভাইকে ফোন করে একচোট ঝাড়লেন, শেষে নিজেই নানুভাইয়ের অফিসে এলেন। অনেক দর কষাকষি করে আটশো টাকায় রফা হল। আমাকে আর দেখে কে? কড়কড়ে টাকা হাতে পেয়ে আমি তো একেবারে বাদশা।
শফিয়ার জন্য শারী-গয়নাগাটি আর নিজের জন্য এক বোতল জনি ওয়াকার কেনার পর দেখি, পকেটের অবস্থা আগের মতোই ফাঁকা। নতুন ভাড়া নেওয়া ঘরে ঢুকে হঠাৎ মনে হল, আরে ঘর তো আমার পকেটের চেয়েও ফাঁকা। আসবাবপত্র বলে তো কিছু ছিল না। তবে, আমি দেখেছি, ভাইজানেরা, মানুষ সবসময়ই মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায়। আমার পাশেই থাকত একটা পরিবার। তো সেই পরিবারের বাবুটি কিস্তিতে কিছু আসবাব কেনার ব্যবস্থা করে দিল। তাতেও দুটো ঘর মরুভূমির মতোই মনে হচ্ছিল।
বাড়িতে বিবি আসবে, একটা তো দাওয়াতের ব্যবস্থা করতে হয়। নাজির লুধিয়ানভিসাব কার্ড ছেপে দিলেন। বেশ জোড়দার পার্টি হল। ফিলিমের সব লোকজনরাই এসেছিল।-কারদার সাব, গুঞ্জলি, বিলিমোরিয়া সাব, বাবুরাওজি, নূর মহম্মদ, পদ্মা দেবী, আরও কত যে। পদ্মা দেবীকে কেউই তেমন চিনত না। কিন্তু বাবুরাওজি-র হাতে পড়ে তার ভোল পাল্টে গেছিল। বাউরাওজি তাকে একেবারে কালার কুইন বানিয়ে দিলেন। ফিল্ম ইন্ডিয়ার প্রত্যেক সংখ্যায়। তাঁর ছবি, নিজে হাতে ক্যাপশন লিখে দিতেন বাবুরাওজি। খেলাটা বুঝতে পারছেন তো ভাইজানেরা? ফিলিমের দুনিয়াটাই এমন। ঠিক লোকের বিছানায় যেতে পারলে, তাকে আর পায় কে!
জমজমাট দাওয়াত হয়েছিল। খাওদাওয়ার ব্যাপারে, মির্জাসাব, আমি একেবারে আপনারই মতো। এ-ব্যাপারে কোন ভেজাল বা কঞ্জুষি চলবে না। সব রান্না হয়েছিল একেবারে কাশ্মীরি স্টাইলে। বাবুরাওজি নাচ জুড়ে দিলেন, ওদিকে রফিক গজনবি, নন্দা আর আগা কাশ্মীরি সমানে এ-ওকে খিস্তি করে যাচ্ছে। যাকে বলে নরক গুলজার। সব শেষ হওয়ার পর বিলিমোরিয়া সাবের গাড়িতে চড়ে বিবিজান, আমি,শফিয়া নতুন ঘরে এসে উঠলাম। কী বলব, ভাইজানেরা, পরদিন দেখি, আমার অর্ধেকটা শফিয়ার শওহর হয়ে গেছে। তবে ভালও লেগেছিল খুব। এই অনুভূতির স্বাদই আলাদা। পরদিন সন্ধ্যেবেলা ঘরে ফিরে বোতল খুলে বসেছি, শফিয়া এসে আমার হাত চেপে ধরল। সে যে নতুন বিবি, তার কোনও লক্ষণই নেই। সোজা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, এসব খাবেন না মান্টোসাব।
-কেন?
-আপনার শরীরের ক্ষতি হবে।
-না খেলে আমি লিখতেই পারব না।
