-তুমি চেষ্টা করো না কেন?
এবার আমার মজা করার ইচ্ছে হল। আমার এই মজাই হল কাল। আমি বলে ফেললাম, কার জন্য আরও বেশি টাকা কামাব বলল তো? বিবি থাকলে দেখতে, আমিও কত কামাতে পারি।
-শোভানাল্লা। নিকে করতে চাও?
-হ্যাঁ। না করার কি আছে?
এসব হচ্ছে কথার পিঠে কথা। কিন্তু কথাটা বলে কী যে বেওকুফি করে ফেললাম, তাও বুঝতে পারিনি। বিবিজান আমাকে পরের সপ্তাহে মাহিমে যেতে বলল। ইকবালরা মাহিমেই থাকত। মির্জাসাব, নিজেকে ধরার ফাঁদ আমি আমি নিজেই পাতলাম। কিন্তু তখনও বুঝতে পারি নি। বুঝতে পারলাম পরের রবিবার মাহিমে গিয়ে।
ইকবালের বাড়ির সামনের রাস্তায় দাড়িয়েছিলাম। বিবিজান চারতলার জানলা দিয়ে আমাকে দেখতে পেয়ে নেমে এল।
-আসতে বলেছ কেন?
-আমার সঙ্গে চলো বেটা।
-কোথায়?
-আরে সামনেই। চলো না–
-ব্যাপার কী বলো তো?
-তোমার বিবি ঠিক করেছি।
-মানে?
বিবিজান হেসে বলল, শফিয়া, বড়ি আচ্ছি বেটি। তোমাকে ঠিক সামলে রাখতে পারবে।
-আমি নিকে করব, কে বলেছে?
-কেন? সেদিন তুমিই তো বললে,বেটা। শফিয়াকে যেদিন দেখি, আমার খুব মনে ধরেছিল। ফিরে এসেই ওর চাচার সঙ্গে কথা বললাম। আমরা কাশ্মীরি, ওরাও কাশ্মীরি, এককথায় রাজি।
-বিবিজান-
-তকলিফ কেয়া হ্যায়?
-আমার রোজগার তো তুমি জান? এভাবে নিকে করা যায়?
-বিবি এলে সব ঠিক হয়ে যাবে। চলো-চলো-শফিয়াকে দেখলে তোমারও পছন্দ হবে।
বিবিজান আমার হাত ধরে টানতে টানতে এগিয়ে চলল। আমি তখন পালাতে পারলে বাঁচি। কিন্তু বিবিজানের শক্তমুঠোয় আমার হাত।
জলহস্তীর মতো একটা লোকের সামনে বসিয়ে বিবিজান ভেতরে চলে গেল। তাঁর নাম মালিক হাসান, শফিয়ার চাচা, চাকরি করতেন গোয়েন্দা বিভাগে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন। আমিও বলে যেতে লাগলাম এবং সুযোগ বুঝে জানিয়ে দিলাম যে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর আমার পানাভ্যাস আছে। আমি তো ফাঁদ কেটে বের হতে চাইছি। এই নিকে কখনও হয় নাকি? এরা রইস আদমি আর আমি তো বম্বেতে রাস্তার কুকুর।
সব শুনে হাসানসাহেব পায়চারি করতে করতে বলতে লাগলেন, বহৎ খুব, বহৎ খুব। তারপর কাকে যেন ডেকে বললেন, বহিনজিকে বোলাও। একটু পরেই বিবিজান এসে হাজির। হাসানসাব বিবিজানের হাত চেপে ধরলেন, ক্যায়সি বেটা বানায়া বহিনজি।
বিবিজান আমার দিকে তাকায়। আমি তখন মনে মনে ভাবছি, আবার আমাদের দুজনকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হবে। এর চেয়ে খুশি আর কী হতে পারে?
-বাত খতম্।
-মতলব? বিবিজানের ফ্যাসফেসে গলা শুনতে পাই।
-নিকাহ পাক্কা। প্রথম কথা কাশ্মীরি পরিবার ছাড়া আমি শফিয়ার বিয়ে দেব না। আর আপনার বেটা। একদম সাফ দি। হর রোজ পিতে হ্যায়, এ ভি কবুল কিয়া। হামকো সাচ্চা আদমি চাহিয়ে।
মির্জাসাব, এ কেমন বদনসিব আমার বলুন, মালিক হাসানের মত গোয়েন্দা অফিসার আমাকে সাচ্চা আদমি মনে করলেন? হিরামান্ডির রাতগুলোর কথা না বলে কী যে ভুল করেছিলাম! এরপর যে কাণ্ডটা ঘটল, তাতে আমিই নিজেকে ফাঁসিয়ে দিলাম। হাসানসাব বললেন, বহিনজি, বিটিয়া কো লে আইয়ে।
শফিয়া এল। ওড়নায় মুখ ঢাকা। অস্পষ্ট, ছায়া- ছায়া, দেখলাম তাকে। তাকে ছুঁতে ইচ্ছে। করল, সেই প্রথম বুঝতে পারলাম, আমি একা থাকবার মতো মানুষ নই, আমার একাকিত্বের জন্যও পাশে কাউকে দরকার। সারা জীবন ধরে আমার ওই খামখেয়ালির মূল্য দিতে হয়েছে শফিয়া বেগমকেই। যখন আমরা দুয়েকদিন ভাল থাকতাম, আমি নিজেকে বলতাম, কী হবে মান্টো এইসব লেখা লিখে? তুমি অন্তত একজন মানুষকে সুখী করো। কাগজ কলম জ্বালিয়ে দাও। তুমি তার বুকে মাথা রেখে চোখ বুজে থাকো, সে তোমার চুলে অদৃশ্য সব তসবির এঁকে দিক, তুমি ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ো।
আমার নিকাহ-র দিন ঠিক হয়ে গেল। বিশ্বাসই হতে চায় না আমার। এসব তো স্বপ্নেও কখনও ভাবিনি। মাথায় বাজ ভেঙে পড়ল। পকেটে ফুটো পয়সা নেই, আমি যাব নিকে করতে? বিবিজানকে কত বোঝালাম, সে কিছুতেই আমার কথা শুনবে না, সে শুধু বলে, বেটা সব ঠিক হয়ে যাবে। বিবি তোমার নসিব বদলে দেবে। খোদার ইচ্ছে না থাকলে তো হাসানভাই রাজি হতেন না।
আমি আর কী করি, নসিবের হাতেই নিজেকে ছেড়ে দিলাম। নৌকো ভাসালাম, দরিয়া, এবার তুমি যেখানে পারো নিয়ে চলো। তখন কিছুদিন ইম্পিরিয়াল ফিল্ম কোম্পানিতে গল্পলেখক হিসেবে পার্ট-টাইম কাজ করছিলাম। তা সে কোম্পানিরও তখন লাটে ওঠার দশা। নইলে কিছু টাকা আগাম পাওয়া যেত। হঠাৎ মনে পড়ল, কোম্পানির কাছে আমিই তো শালা দেড় হাজার টাকা পাই, শেঠ আরদেশারকে গিয়ে ধরলাম টাকার জন্য। শেঠের তখন অবস্থা খুবই খারাপ। টাকা দিতে পারলেন না, তবে আমার হবু বিবির জন্য কিছু গয়নাগাঁটি, শাড়ির ব্যবস্থা করেছিলেন। ভাবুন ভাইজানরা, আমার পকেটে একটাও পয়সা নেই, অথ বিবির শাড়ি-গয়না জোগাড় হয়ে গেল। এরই নাম মান্টো ম্যাজিক। এ তো আমি একা একাই নিকাহ্-র সব জোগাড়যন্তর করে ফেললাম। এভাবেই একটু একটু করে শফিয়াকে ভালবেসে ফেলেছিলাম।
শেষ পর্যন্ত শালা মান্টোর নিকে হয়ে গেল। শফিয়া ওর চাচার কাছেই রয়ে গেল, আমি ফিরে এলাম খোলিতে। হ্যাঁ ভাইজানেরা, ওই নিকাহ্ দিনেই। ছারপোকা ভরা বিছানায় শুয়ে ভাবছিলাম, শালা সত্যিই আমার নিকে হয়েছে তো আমার? নাকি খোয়াব দেখছিলাম? আমার পকেটে তখনও শুকনো খেজুর, এলাচ। তার মানে আজই তোমার নিকে হয়েছে মান্টো। তবু বিশ্বাস হচ্ছিল না। পগল না হলে কেউ তার মেয়ের সঙ্গে মান্টোর বিয়ে দেয়?
