কয়েকদিন পরে নবাবকে নতুন আংটি উপহার দেওয়া হল। বেশ কয়েকদিন ধরে নবাবের মনখারাপ ছিল, আংটি পরে হতাশভাবে তার দিকে তাকালেন। আংটির গায়ের লেখাঁটি পড়েই, তাঁর ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল, তারপর হা-হা করে হেসে উঠলেন তিনি। আংটির গায়ে কী লেখা ছিল জানেন মির্জাসাব? এ-ও একদিন চলে যাবে। তারপরেই দেখলুম, কাশীর রাস্তায় আমি একা দাঁড়িয়ে আছি। কবিরসাব কোথাও নেই।
২৪. আপনার উসখুস করছেন
পিহাঁ থা দাম সখ করীব আশিয়াঁ-কে,
উড়নে নহ্ পায়ে হে কেহ্ গিরফতার হুয়ে।
(ফাঁদ পাতা ছিল বাসার খুব কাছে,
উড়তে-না-উড়তেই ধরা পড়ে গেলাম আমি।)
অনেকক্ষণ ধরে আপনার উসখুস করছেন, বুঝতে পারছি, ভাইজানেরা। মির্জাসাব বড় ভারী কিস্সা শোনালেন, কিন্তু আমরা হচ্ছি রাস্তার কুত্তা, পেটে ঘি সইবে কেন? দেখুন, দেখুন মির্জাসাব, আমাদের লোম খসতে শুরু করেছে। চিন্তা নেই ভাইজানেরা, এই মান্টো আছে কী করতে, আপনাদের জন্য এর মধ্যেই ডাস্টবিন থেকে হাড়গোড় কুড়িয়ে এনেছি, বেশ মজা করে চিবোতে পারবেন।
মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যাই মির্জাসাব, আমিও শালা কী করে ফাঁদে পড়ে গেলাম! বম্বেতে এসে মস্তিতেই দিনগুলো কাটছিল; খোলিতে থাকলেও একা একা থাকার মজাই আলাদা, ঝাড়া হাত -পা, কারুর কাছে কৈফিয়েত দেওয়ার নেই, যেমন খুশি বাঁচো, সেই যেমন হাফিজসাব বলেছিলেন,
ইশক্ বাযী ব জবানী
ব শরাবে লালা ফাম
মজলিসে ইন্স ব হরীফে
হমদব ব শুর্বে মুদাম।
মানেটা বুঝলেন তো ভাইজানেরা? যৌবন দাও, প্রেম দাও, লাল সুরা দাও, আসর ভরে উঠুক সাঙ্গোপাঙ্গে, যেন প্রিয় বন্ধু পাই, খাবারদাবারটুকু যেন মিলে যায় খোদা। একা মানুষ আর কী চাইতে পারে? এভাবে বেঁচে থাকার মতো স্বাধীনতা আর আছে? কিন্তু শালা মান্টোও ফাঁদে পড়ে গেল। ভাইজানেরা, সেই কিস্সাটাই এবার আপনাদের বলছি।
বিবিজান তো অমৃতসর থেকে বম্বেতে এসে পৌঁছল। আমার দিদি ইকবাল বেগমের বাড়িতেই থাকার ব্যবস্থা হল। খোলিতে আমিই দুমড়ে-মুচড়ে জীবন কাটাই, সেখানে তো আর আম্মিজানকে নিয়ে আসা যায় না। বিবিজানের সঙ্গে আমি রাস্তায় দেখা করতাম, কোনও চায়ের দোকানে বসে চা খেতে খেতে গল্প করতাম। দিদির বাড়িতে তো আমার মতো কাফেরের ঢোকার অনুমতি নেই। ইকবাল বেগমের বাদশা তো আমাকে সহ্য করতে পারত না। বিবিজান রোজই বলে, বেটা তুমি কোথায় থাকো, আমাকে নিয়ে চলো। আমি তো তোমার। জন্যই এসেছি। কিন্তু ওই খোলিতে তো বিবিজানকে নিয়ে যাওয়া যায় না। সত্যি বলতে কী, মানুষ কত নোংরা ভাবে বেঁচে থাকে, তা আমি বিবিজানকে দেখাতে চাইনি। তার সুন্দর। মনটাকে নষ্ট করে দেওয়াটা কি ঠিক, বলুন? কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি আটকাতে পারিনি। বিবিজান একদিন আমার সঙ্গে সঙ্গে খোলিতে এলোই। অন্ধকার খুপরিটার চারদিকে চোখ চালিয়ে সে আমার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর তার দুই চোখ থেকে জলের ধারা নামল। বিবিজানকে এমনভাবে আমি কখনও কাঁদতে দেখিনি। আমার চোখ তো জ্বালা করছিল। তবু হেসে বললাম, একজন মানুষের এর চেয়ে বড় ঘরের কী দরকার বলো?
-মান্টো
বিবিজান আমার হাত চেপে ধরে নোংরা বিছানার ওপর বসে পড়ল। আমি তার পাশে বসে মাথায়, পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে শান্ত করার চেষ্টা করছিলাম। তবু বিবিজানের কান্না থামে না আর মাঝে মাঝেই বলে ওঠে, খোদা, ইয়ে মুঝে কেয়া দিখায়া! অনেক পরে কান্না থামল, কোনও কথা না-বলে বিবিজান আমার নোংরা জামাকাপড়গুলো এখানে-ওখানে জড়ো করতে লাগল।
-আরে, এসব কী করছ তুমি বিবিজান?
-এখনই আমার সঙ্গে যাবে।
-কোথায় যাব?
-ইকবালের বাড়িতে।
-বিবিজান, তুমি তো জানো, ও-বাড়িতে আমার জন্য নত ছাড়া আর কিছুই নেই।
-তাই বলে এই জাহান্নমে-
-আমি ভাল আছি, বিবিজান। খোদা কসম, খুব ভাল আছি। ঘৃণার দাওয়াত খাওয়ার চেয়ে। একা একা এভাবে থাকা অনেক আনন্দের।
বিবিজান চুপ করে বসে রইল। আমি তার কাধে হাত রেখে বললাম, চলো তোমাকে পৌঁছে। দিয়ে আসি। এজন্যই তোমাকে এখানে আনতে চাইনি। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি, বিবিজান। অনেকক্ষণ নিজেকে সামলে রাখার পর আমি আর পারিনি, মির্জাসাব, কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম। আমি খোলিতে থাকি বলে নয়, বিবিজানকে এই নরক- জীবন দেখতে হল বলে।
দীর্ঘ বছর পর, যেন আমি ছোট্টটি, বিবিজান আমাকে জড়িয়ে ধরে কত যে চুমু খেল আর কোরানের একটাই রুকু বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছিল। কী যে বলছিল, আমি বুঝতেও পারছিলাম না। কোরান তো কখনও পড়িনি। মরে যাওয়ার আগের যে রাতে আমি রক্তবমি করছিলাম, তখনও মাঝে মাঝে যেন বিবিজানের ওই বিড়বিড়ানি শুনতে পাচ্ছিলাম, সেই প্রথম আমার মনে হয়েছিল, কথাগুলো যদি বুঝতে পারতাম। বুঝতে পারলেই বা কী হত? তখন তো শুধু অন্তিমের অপেক্ষা।
রাস্তায় যেতে যেতে বিবিজান বলল, তুমি আর একটু বেশি রোজগার করতে পারো না?
-কেন?
-তাহলে এই কিচরের মধ্যে—
-আমি ভালই আছি বিবিজান। বেশিটাকা দিয়ে কী করব বল তো? যা রোজগার করি, তাতে আমার বেশ চলে যায়।
-না চলে না, আমি জানি। লেখাপড়া বেশি দূর করলে না, বেশি রোজগারই বা করবে কী করে? বিবিজানের ওপর আমি কখনও রাগ করিনি। কিন্তু তার এই কথাটা শুনে আমার মেজাজ গরম হয়ে গেল। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, আমি তো বললাম, যা রোজগার করি, তাতে আমার চলে যায়। লেখাপড়া না শিখেও অনেক টাকা রোজগার করা যায়।
